কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিতে ভাবতে পারছিল না এমন কোনও কোনও পশ্চিমার পক্ষে বিশেষ করে সহিংস ও নিষ্ঠুরভাবে প্রকাশকারী ধর্মের এই পুনর্জাগরণ উপলব্ধি কঠিন ছিল। আধুনিক সমাজ ঘনঘন ‘দুটি জাতিতে’ বিভক্ত হয়েছে: সেক্যুলারিস্ট ও ধার্মিক একই দেশে বাস করেও পরস্পরের ভাষায় কথা বলতে পারেনি বা একই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিস্থিতি দেখতে পারেনি। এক পক্ষের কাছে যাকে পবিত্র ও ইতিবাচক মনে হয়েছে অন্য পক্ষ তাকে দানবীয় ও পরিহাসের সাথে দেখেছে। সেক্যুলারিস্ট ও ধার্মিক, দুই পক্ষই পরস্পরের কারণে নিজেদের গভীরভাবে হুমকির মুখে মনে করেছে, এবং দুটি সম্পূর্ণ সমন্বয়ের অতীত বিশ্বদৃষ্টির সংঘাত লাগলে, সালমান রূশদির ক্ষেত্রে যেমন, বিচ্ছিন্নতা ও দূরত্ব কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছে। এটা অস্বাস্থ্যকর ও সহজাতভাবে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। মৌলবাদ বিদায় নিচ্ছে না। কোনও কোনও স্থানে তা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে বা আরও চরম রূপ ধারণ করছে। উদার সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান সেতু তৈরি করার লক্ষ্যে ও ভবিষ্যৎ যুদ্ধের সম্ভাবনা এড়াতে কী করতে পারে?’
দমন ও নির্যাতন স্পষ্টতই জবাব নয়। তা অনিবার্যভাবে পাল্টা আক্রমণ ডেকে আনে। মৌলবাদী ও সম্ভাব্য মৌলবাদীদের আরও চরম করে তুলতে পারে। স্কোপস ট্রায়ালে অপদস্থ হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা আরও প্রতিক্রিয়াশীল, আপোসহীন ও আক্ষরবাদী হয়ে উঠেছিল। নাসেরের নির্যাতন শিবিরে সুন্নি মৌলবাদের চরমপন্থী ধরন আবির্ভূত হয়েছে এবং শাহর ক্র্যাকডাউন ইসলামি বিপ্লবকে অনুপ্রাণিত করতে সাহায্য করেছে। মৌলবাদ এক যুদ্ধংদেহী ধর্মবিশ্বাস; অত্যাসন্ন বিনাশ আশঙ্কা করে থাকে। এটা বিস্ময়কর নয় যে, ইহুদি মৌলবাদীরা, তা সে যায়নবাদী বা আল্ট্রা-অর্থডক্স, যাই হোক, এখনও হলোকাস্টের ভীতি ও অ্যান্টি-সেমিটিক বিপর্যয়ের ভীতিতে তাড়িত হয়। সেক্যুলারাইজেশনকে যারা আগ্রাসী হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছে নির্যাতন তাদের আত্মায় গভীর দাগ ফেলেছে ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিকৃত করেছে, একে এভাবে সহিংস ও অসহিষ্ণু করে তুলেছে। মৌলবাদীরা সর্বত্র ষড়যন্ত্র দেখে ও অনেক সময় এমন ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যাকে দানবীয় মনে হয়।
এবং এখনও সেক্যুলার, বাস্তব উদ্দেশ্যে মৌলবাদকে ব্যবহার করার প্রয়াসও উল্টো ফলদায়ী। সাদাত তাঁর শাসনকে বৈধতা দিতে মিশরের মুসলিমদের তোয়াজ — করেছেন, নিজের শাসনের ভিত্তি গড়ে তুলতে জামাত আল-ইসলামিয়াহর সমর্থন আদায়ের প্রয়াস পেয়েছেন। পিএলও-কে খাট করার প্রয়াসে ইসরায়েল প্রাথমিকভাবে হামাসকে সমর্থন দিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস করুণ ও মারাত্মকভাবে সেক্যুলারিস্ট রাষ্ট্রের উপর পাল্টা আঘাত হেনেছে। এই ধর্মীয় আন্দোলনসমূহের আরও ন্যায্য ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন অবশ্যই করতে হবে।
প্রথমত, এটা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ যে এই ধর্মতত্ত্ব ও আদর্শগুলো ভীতিতে প্রোথিত। মতবাদ সংজ্ঞায়িত করার আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবন্ধক সৃষ্টি, সীমানা স্থাপন, আইন কোঠরভাবে পালন করা যাবে এমন এক পবিত্র ছিটমহলে বিশ্বাসীদের বিচ্ছিন্ন করার বিষয়গুলো নিশ্চিহ্নতার ভীতি থেকে উদ্ভুত হয়, যা সকল মৌলবাদীকে এক সময় না এক সময় বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে সেক্যুলারিস্টরা তাদের নিশ্চিহ্ন করতে ক্ষেপে উঠেছে। আধুনিক বিশ্ব, যাকে উদারপন্থীদের কাছে দারুণ উত্তেজনাকর ঠেকে, মৌলবাদীদের কাছে তাকেই ঈশ্বরবিহীন, সকল অর্থ হতে বঞ্চিত এবং এমনকি শয়তানিসুলভ মনে হয়। কোনও রোগী এই ধরনের প্যারানয়েড, ষড়যন্ত্রে ভরা ও প্রতিশোধ প্রবণ ফ্যান্টাসিসহ কোনও থেরাপিস্টের কাছে এলে নিঃসন্দেহে তিনি তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে শনাক্ত করবেন। আধুনিকতার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের চোখে দানবীয় প্রিমিলেনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি গণহত্যামূলক স্বপ্ন লালন করে ও মানবজাতি এক ভয়ানক সমাপ্তির দিকে ধেয়ে যাচ্ছে বলে কল্পনা করে, এটা বহু প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীর মনে আধুনিকতার সৃষ্ট ভীতি ও হতাশারই পরিষ্কার ইঙ্গিত বহন করে। আমরা মৌলবাদীদের কর্মসূচিকে প্রভাবিতকারী নিহিলিজম দেখেছি। এই ধরনের ভীতিকে যুক্তি দিয়ে বোঝা বা নির্যাতনমূলক পদ্ধতিতে দূর করা সম্ভব নয়। এমনকি একজন উদারপন্থী বা সেক্যুলারিস্ট এই ভীতি পরিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত না হলেও আরও কল্পনা নির্ভর সাড়া হবে এই বৈকল্যের গভীরতা উপলব্ধির করার প্রয়াস।
দ্বিতীয়ত, এইসব আন্দোলন যে কোনওভাবেই অতীতে প্রাচীনপন্থী পশ্চাদপসরণ নয় সেটা উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ; এগুলো আধুনিক, উদ্ভাবনী এবং আধুনিকায়নসুলভ। প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা বাইবেলকে প্ৰাক আধুনিক আধ্যাত্মিকতার অধিকতর অতীন্দ্রিয়, উপমাগত পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আক্ষরিক, যৌক্তিক উপায়ের পাঠ করে। খোমেনির বেলায়েত-ই ফাকিহ ছিল শত শত বছরের শিয়া ঐতিহ্যের খোলনালচে পাল্টানো। মুসলিম চিন্তাবিদগণ একটি স্বাধীনতার ধর্মতত্ত্ব প্রচার করেছেন ও একটি সাম্যাজ্যবাদ বিরোধী আদর্শ সৃষ্টি করেছেন যা কিনা তাদের কালের অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের আন্দোলনের অনুরূপ। এমনকি আল্ট্রা-অর্থডক্স ইহুদিরা পর্যন্ত, যাদের আধুনিক সমাজ থেকে দৃঢ়ভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে মনে হয়েছিল, তারাও তাদের ইয়েশিভোতকে আবিশ্যিকভাবেই আধুনিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বলে আবিষ্কার করেছে। তোরাহ পরিপালনের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ধরনের কঠোরতা গ্রহণ করেছিল তারা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে যাতে বিগত দুই সহস্ৰ বছরে ধার্মিক ইহুদিরা ভোগ করেনি এমন ক্ষমতা এনে দিয়েছিল।
