তাসত্ত্বেও এক বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনও ধার্মিক হতে চায় ও বিশ্বাসের নতুন ধরন গড়ে তুলতে চেয়েছে তারা। মৌলবাদ ঠিক তেমনি আধুনিক ধর্মীয় পরীক্ষার অন্যতম নজীর। আমরা যেমন দেখেছি, এটা ধর্মকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডার একেবারে কেন্দ্রে স্থাপন করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাত্রার সাফল্য ভোগ করেছে। কিন্তু প্রায়শঃই তা কনফেশনাল ধর্মবিশ্বাসের বিশেষ কিছু পবিত্ৰ মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছে। মৌলবাদীরা ডগমাসমূহকে বৈজ্ঞানিকভাবে সত্যি দাবি করে অথবা তাদের জটিল মিথলজিকে কঠোর আদর্শে পরিণত করে ধর্মের মিথোসকে লোগোসে পরিণত করেছে। এভাবে তারা জ্ঞানের দুটি পারস্পরিক সম্পূরক উৎস ও ধরনকে গুলিয়ে ফেলেছে, প্রাক আধুনিক মানুষ যাকে সাধারণত বিচ্ছিন্ন রাখাই শ্রেয়তর বলে স্থির করত। মৌলবাদী অভিজ্ঞতা এই রক্ষণশীল দর্শনের সত্যি তুলে ধরেছে। ক্রিশ্চানিটির সত্যিগুলো বাস্তব ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণযোগ্য বলে জোর দিয়ে আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা ধর্ম ও বিজ্ঞানের এক ক্যারিকেচার সৃষ্টি করেছে। যেসব ইহুদি ও মুসলিম অন্য সেক্যুলার আদর্শের সাথে পাল্লা দিতে তাদের ধর্মকে যুক্তিভিত্তিক, পদ্ধতিগতভাবে উপস্থাপন করেছে তারাও তাদের ঐতিহ্যকে বিকৃত করেছে, নিষ্ঠুর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে একক বিন্দুতে এনে ঠেকিয়েছে। ফলে সবাই আরও সহিষ্ণু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহানুভূতিশীল শিক্ষাকে অবহেলা করেছে এবং ক্রোধ, অসন্তোষ ও প্রতিশোধের ধর্মতত্ত্বের বিকাশ ঘটিয়েছে। ক্ষেত্র ভেদে এটা এমনকি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু হত্যাকে অনুমোদন দানের কাজে ধর্মকে ব্যবহার করে বিকৃতও করেছে। এমনকি এই ধরনের সন্ত্রাসের বিরোধিতাকারী মৌলবাদীদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকেও তাদের মতের সাথে যারা একমত পোষণ করে না তাদের বেলায় বর্জনবাদী ও নিন্দুক প্রবণ হতে দেখা যায়।
কিন্তু মৌলবাদী হিংস্রতা আমাদের আধুনিক সংস্কৃতির মানুষের উপর চরম কঠিন চাহিদা আরোপ করার কথা মনে করিয়ে দেয়। নিঃসন্দেহে এটা আমাদের ক্ষমতাবান করেছে, আমাদের দিগন্ত প্রসারিত করেছে এবং আমাদের অনেককেই আরও সুখী ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনে সক্ষম করে তুলেছে। কিন্তু তারপরেও এটা প্রায়শঃই আমাদের আত্মঅহমকে ভোঁতা করে দিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমাদের যৌক্তিক বিশ্বদৃষ্টি মানুষই সকল বস্তুর মানদণ্ড ঘোষণা করে একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উপর অশোভন নির্ভরতা থেকে মুক্তি দিলেও পাশাপাশি আমাদের নাজুকতা, আক্রম্যতা আর মর্যাদার ঘাটতিও তুলে ধরেছে। কোপার্নিকাস আমাদের মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত করে প্রান্তিক ভুমিকায় অবনত করেছিলেন। কান্ট ঘোষণা করেছিলেন যে, আমাদের ধারণা আমাদের মাথার বাইরের বাস্তবতার সাথে মেলে কিনা সে ব্যাপারে আমরা কখনওই নিশ্চিত হতে পারব না। ডারউইন বোঝাতে চেয়েছেন, আমরা পশুমাত্র; এবং ফ্রয়েড দেখিয়েছেন যে, সম্পূর্ণ যৌক্তিক প্রাণী হওয়া দূরে থাক, মানুষ আসলে অবেচতনের শক্তিশালী, অযৌক্তিক শক্তির করুণাধীনমাত্র, কেবল অনেক প্রয়াসের মাধ্যমেই যার নাগাল পাওয়া সম্ভব। প্রকৃতপক্ষেই এটা আধুনিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তির কাল্ট সত্ত্বেও আধুনিক ইতিহাস ডাইনী শিকার ও বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, এসব ছিল যুক্তিহীনতার বিস্ফোরণ। একসময় সেরা রক্ষণশীল ধর্মের প্রাচীন মিথ, লিটার্জি ও অতীন্দ্রিয় অনুশীলনের যোগানো মননের গভীর কন্দরে পৌঁছানোর ক্ষমতা বাদে যুক্তি অনেক সময় আমাদের সাহসী নতুন বিশ্বে দিশা হারিয়ে ফেলে বলে মনে হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষে মানবজাতির দিকে আগের চেয়ে বেশি আলোকিত ও সহিষ্ণু পর্যায়ে অগ্রসর হওয়ার উদার মিথ এই গ্রন্থে বিবেচিত অন্য যেকোনও মিলেনিয়াল মিথের চেয়ে ফ্যান্টাস্টিক মনে হচ্ছে। ‘উচ্চতর’ মিথিকাল সত্যির বন্ধন ছাড়া যুক্তি অনেক সময় দানবীয় হয়ে উঠতে পারে ও এমন সব অপরাধ সংগঠিত করতে পারে যেগুলো মৌলবাদীদের হাতে সংগঠিত যেকোনও নিষ্ঠুরতার চেয়ে বড় না হলেও কাছাকাছি।
আধুনিকতা সুবিধাজনক, উদার ও মানবিক ছিল, কিন্তু প্রায়শঃই এটা বিশেষ করে গোড়ার দিকে নিষ্ঠুর হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেছে। বিশেষ করে আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে আগ্রাসী, সাম্রাজ্যবাদী ও অচেনা মনে করা উন্নতশীল দেশে এটা বেশি সত্যি ছিল। আমাদের বিবেচিত মুসলিম দেশগুলোতে আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া খুবই কষ্টকর ও ভিন্ন ছিল। পশ্চিমে এটা স্বাধীনতা ও উদ্ভাবনে বৈশিষ্ট্যায়িত হয়েছে; মিশর ও ইরানে এর সাথে পরনির্ভরতা ও অনুকরণ জড়িত ছিল, মুসলিম সংস্কারক ও আদর্শবাদীগণ সূক্ষ্মভাবে এ সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। এইসব দেশে তা আধুনিকতার সুর পল্টে দেবে। আপনি ভুল উপাদানে (টাটকা ডিমের বদলে শুকনো ডিম, ময়দার বদলে চাল) আর ভুল সরঞ্জাম দিয়ে কেক বানাতে গেলে পরিণতি রান্নার বইয়ের ফলের সাথে মিলবে না; সেটা মজাদার হতে পারে, কিন্তু আবার দারুণ নোংরাও হতে পারে। স্থানীয় জ্ঞান ও রান্নার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে হাতের কাছে প্রাপ্য উপাদান ও কৌশল ব্যবহার করে রীতির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করাই অনেক ভালো। আফগানি, আব্দুহ, শরিয়তি এবং খোমেনির মতো ইসলামিস্টগণ তাদের নিজস্ব ও ভিন্ন কেক বানাতে মুসলিম উপাদান ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।
