ক্রিশ্চান আইডেন্টিটির কর্মকাণ্ড ও আদর্শ চিত্রায়িত করা কঠিন। এটা কোনও একরৈখিক আন্দোলন নয়, বরং বিভিন্ন সম্পর্কিত সংগঠনের একটা মৈত্রী। এদের সদস্য সংখ্যা কম, মাত্র হাজার পঞ্চাশেক হতে পারে।১৩৩ কিন্তু প্রবণতা হিসাবে ক্রিশ্চান আইডেন্টিটি উদ্বেগজনক। মৌলবাদীদের মতো তারা ভীতি ও অসন্তোষের কারণে জগৎ থেকে পিছু হটেছে এবং আবার দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অধিকাংশ চরম ধরনের মৌলবাদীর মতো এর সদস্যরা সর্বত্র ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায় এবং ক্রোধ ও অসন্তোষের ধর্মতত্ত্ব গড়ে তোলে। কিন্তু অতি ফ্যাসিবাদী আদর্শ, মার্কিন যুক্তিরাষ্ট্রের সরকারের প্রতি খাঁটি ঘৃণা ও আধুনিক বিশ্ব থেকে প্রত্যাহারের চরম রূপের কারণে মৌলবাদীদের ছাড়িয়ে গেছে তারা। এখন আর বাইবেলিয় ভ্রান্তিহীনতা ও মতবাদ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে ক্রিশ্চান আইডেন্টিটি আমেরিকায় নিজেদের জন্যে একটি আলাদা আর্য রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে চায়। ক্রিশ্চান আইডেন্টিটি আমেরিকার ইতিহাসে নজীরবিহীন বিচ্ছিন্নতা ও ত্রাসের আদর্শ গড়ে তুলেছে। পুনর্গঠনবাদের মতো আইডেন্টিটি সম্প্রদায়ের শিথিল কনফেডারেশনটি ছোট, কিন্তু তারপরও ভবিষ্যতে অসহায়ত্ব, হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করার জন্যে ধর্মকে ব্যবহার করার অস্বস্তিকর ইঙ্গিত। সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠান ও মূলধারার গোষ্ঠীগুলো মনে করতে পারে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৌলবাদী হুমকি মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছু সংখ্যক ক্রিশ্চানের ধারণা মতো যুদ্ধ এখনও চলছে, ফেডারেল সরকারকে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে, এবং সংঘাত নিশ্চিতভাবেই একবিংশ শতাব্দীতে অব্যাহত থাকবে।
ধর্ম শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যায়নি। কোনও কোনও মহলে অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে তা উগ্র হয়ে উঠেছে। তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের সবকটাতেই মৌলবাদীরা ধর্মকে ব্যক্তি পর্যায়ে অবনত করার বা একে দমনের বিরুদ্ধে সক্রোধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং তাদের বিশ্বাস মতো একে ধ্বংস থেকে উদ্ধার করে এনেছে। কঠিন সংগ্রাম ছিল এটা এবং এই প্রক্রিয়ায় ধর্মবিশ্বাস প্রায়শঃই বিকৃত হয়েছে; এটা ধর্মের পরাজয় তুলে ধরে। কিন্তু মৌলবাদ এখন আধুনিক বিশ্বের অংশে পরিণত হয়েছে। এটা ব্যাপক হতাশা, বিচ্ছিন্নতা, উদ্বেগ ও ক্রোধ তুলে ধরে যা কোনও সরকারই নিরাপদে উপেক্ষা করতে পারে না। এই পর্যন্ত মৌলবাদের সাথে সামলে ওঠার প্রয়াস খুব একটা সফল হয়নি; অতীত থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি যা আমাদের ভবিষ্যতে আরও সৃজনশীলভাবে মৌলবাদের ধারণ করা ভীতিকে সামাল দিতে সাহায্য করবে?
১১. পরিশিষ্ট
প্রাক আধুনিক রক্ষণশীল আমলে আমাদের পূর্বপুরুষের মতো আমরা ধার্মিক হতে পারব না, তখন ধর্মবিশ্বাসের মিথ ও আচার মানুষকে কৃষি ভিত্তিক সভ্যতার সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে সাহায্য করেছে। এখন আমরা ভবিষ্যৎমুখী, এবং আমাদের ভেতর যারা আধুনিক বিশ্বের যুক্তিবাদে গড়ে উঠেছি তাদের পক্ষে আর প্রাচীন ধরনের আধ্যাত্মিকতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আমরা নিউটনের চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন নই, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণই বৈজ্ঞানিক চেতনায় পরিপূর্ণ পাশ্চাত্য বিশ্বের অন্যতম পথিকৃত। মিথলজি উপলব্ধি তাঁর কাছে অসম্ভব মনে হয়েছে। আমরা প্রচলিত ধর্মকে আপন করে নেওয়ার যত চেষ্টাই করি না কেন, সত্যকে বাস্তব, ঐতিহাসিক এবং প্রয়োগযোগ্য হিসাবে দেখার স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে আমাদের। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, ধর্মবিশ্বাসকে গুরুত্বের সাথে নিতে হলে এর মিথসমূহকে অবশ্যই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণযোগ্য হতে হবে ও আধুনিকতার প্রত্যাশা অনুযায়ী তাকে বাস্তবক্ষেত্রে দক্ষতার সাথে কাজ করতে সক্ষম হতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপে বিংশ শতাব্দীতে এমন ট্র্যাজিডি মোকাবিলাকারী বর্ধিত সংখ্যক মানুষ ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তিকে যারা সত্য প্রকাশ করার একমাত্র পথ হিসাবে দেখে, তাদের পক্ষে এটা নৈতিক ও সৎ অবস্থান। বিজ্ঞানীরা যেমন প্রথম জোরের সাথে বলবেন, যৌক্তিক লোগোস প্রায়োগিক অনুসন্ধানের অতীতে অবস্থানরত চরম অর্থ সংক্রান্ত কোনও জবাব দিতে পারে না। আমাদের শতকের গণহত্যামূলক আতঙ্কের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুক্তির কিছুই বলার থাকে না।
সুতরাং আধুনিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে এক শূন্যতা বিরাজ করছে, পশ্চিমা মানুষ তাদের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের গোড়ার দিকে যাকে অনুভব করেছিল। মহাবিশ্বের শূন্যতা বুঝতে পেরে ভীতিতে কুকড়ে গেছেন পাসকাল; মানুষকে এই জড় মহাবিশ্বের একমাত্র অধিবাসী হিসাবে দেখেছেন দেকার্তে; হবস কল্পনা করেছেন ঈশ্বর মহাবিশ্ব থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন; নিৎশে ঈশ্বরের প্রয়াণ ঘোষণা করেছেন: মানবজাতি দিশা হারিয়েছে ও এক অসীম শূন্যতায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কিন্তু অন্যরা ধর্মের বিদায়ে নিজেদের মুক্ত ভেবেছেন; ধর্মের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছেন। আধুনিক চেতনায় ঈশ্বর আকৃতির গহ্বরের অস্তিত্বের কথা স্বীকারকারী সার্ত্র যুক্তি দেখিয়েছেন যে, আমাদের মুক্তিকে নাকচকারী উপাস্যকে অস্বীকার করা এখনও আমাদের দায়িত্ব রয়ে গেছে। আলবার্তো কামু (১৯১৩-৬০) বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর প্রত্যাখ্যান নারী-পুরুষকে মানবজাতির প্রতি তাদের সকল মনোযোগ ও ভালোবাসা নিবদ্ধ করতে সক্ষম করে তুলবে। অন্যরা তাদের বিশ্বাসকে আলোকনের প্রতি নিবদ্ধ করেছেন, এমন ভবিষ্যতের কথা ভেবেছেন যেখানে মানবজাতি আরও যৌক্তিক ও সহিষ্ণু হয়ে উঠবে; এক দূরবর্তী কাল্পনিক ঈশ্বরের বদলে ব্যক্তির পবিত্র স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করবে। তাদের জন্যে অন্তর্দৃষ্টি, দুর্ভেয়তা আর পরমানন্দ নিয়ে আসা আধ্যাত্মিকতার সেক্যুলার ধরন গড়ে তুলেছেন তাঁরা, যা তাঁদের আত্মা ও মনের নিজস্ব শৃঙ্খলা গড়ে তুলেছে।
