নর্থ ও রাশদুনির কল্পিত ডোমিনিয়ন ছিল সমগ্রবাদী। অন্য কোনও দর্শন বা নীতির কোনও স্থান নেই, প্রতিদ্বন্দ্বী দলসমূহের জন্যে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার লেশমাত্র নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই আদর্শের জনপ্রিয়তা লাভের সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবেই ক্ষীণ; তবে বলা হয়েছে পরিবেশগত বা বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রীয় চার্চ আলোকনের উদার রাজনীতিকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে। ক্রিশ্চানিটি হাজার হোক পুঁজিবাদের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল, জেসাসের বহু শিক্ষার ক্ষেত্রেই তা আগন্তুক ছিল। ব্যাপকভাবে পরিবির্তিত পরিস্থিতিতে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ফ্যাসিস্ট আদর্শকে সমর্থনের কাজেও একে ব্যবহার করা যেতে পারে।১২৭
রাশদুনি পেন্টাকোস্টালিজমকে বিতৃষ্ণার সাথে দেখলেও অধিকতর রক্ষণশীল কিছু পেন্টাকোস্টালিস্ট রিকন্সট্রাকশন ধর্মতত্ত্বে আগ্রহ দেখিয়েছিল। প্যাট রবার্টসনকে একজন ক্রান্তিকালীন ব্যক্তিত্ব মনে হয়েছে। পেন্টাকোস্টালিজম ও পুনর্জাগরণবাদের ঝোঁক বিশিষ্ট ব্যাপ্টিস্ট ছিলেন তিনি। নর্থের মতো তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, দ্বিতীয় আগমন দূরবর্তী হতে পারে—এই বিশ্বাস তাঁকে প্রচলিত প্রিমিলেনিয়াল মৌলবাদ থেকে আলাদা করেছিল।১২৮ রবার্টসন বিশ্বাস করতেন যে, ইতিমধ্যে ক্রিশ্চানদের বাইবেলিয় নিয়মের ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তুলতে ক্ষমতায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করা উচিত। ১২৯ ভার্জিনিয়া বিচের তাঁর ইউনিভার্সিটির নাম পাল্টে রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি রেখেছিলেন তিনি; রিজেন্ট হচ্ছেন, ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “যিনি সার্বভৌমের অনুপস্থিতিতে শাসন করেন।’ কলেজটির উদ্দেশ্য রাজ্যের আগমন ঘটলে এর সাত শো ছাত্রকে দায়িত্ব নেওয়ার জন্যে তৈরি করা।১৩০ আমেরিকায় দ্য ফান্ডামেন্টালস (১৯১০-১৫) প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই মৌলবাদ পাল্টে গেছে। একদিকে উত্তর আধুনিক, উন্মুলতার প্রবণতা দেখানোর পাশাপাশি অন্যের সমগ্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছে।
মৌলবাদ অদৃশ্য হয়ে যাবে না। আমেরিকায় ধর্ম দীর্ঘ দিন ধরে সরকারের বিরোধী পক্ষকে আকার দিয়ে এসেছে। এর উত্থান-পতন সব সময়ই আবর্তনমূলক ছিল, এবং গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ দেখায় যে, এখনও রক্ষণশীল ও উদারপন্থীদের ভেতর মধ্যবর্তী যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, যা অনেক সময় প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ১৯৯২ সালে এখনও প্রাচীনপন্থী মৌলবাদ আঁকড়ে থাকা জেরি ফলওয়েল ঘোষণা করেছিলেন, বিল ক্লিন্টনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ভেতর দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শয়তানের মুক্তি ঘটেছে। ক্লিন্টন, বজ্রকণ্ঠে বলেছেন ফলওয়েল, ‘সমকামীদের’ ক্ষমতা দখল করার সুযোগ করে দিয়ে সামরিক বাহিনী ও জনগণকে ধ্বংস করে দেবেন। ফেডারেল আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত ক্লিনিকে অ্যাবরশনের অনুমতি দান, ভ্রূণ টিস্যু নিয়ে গবেষণা, সমকামীদের অধিকারের সরকারী অনুমোদন “ঈশ্বরের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ ঘোষণার’১৩১ আলামত।
১৯৯৩ সালে যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। ১৯৯৩ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ব্যুরো অভ অ্যালকোহল, টোব্যাকো অ্যান্ড ফায়ার আর্মস টেক্সাসের ওয়াকোয় ডেভিড কোরেশের ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানের সীমানায় হানা দেয়, কারণ তিনি অস্ত্র মওজুত করছেন বলে জানা গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, বহু টেক্সান ও ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানের মতো (সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট-এর একটি দলছুট অংশ) দর্শনীয় অস্ত্রভাণ্ডার থাকলেও সরকারের বিরুদ্ধে তাদের কোনও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ছিল না বলেই মনে হয়। আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ক্ষমতা ও বৈধতা প্রদর্শন। কিন্তু তা উল্টো ফল দেয়। পরিণামে এফবিআই কর্তৃক চৌহদ্দী ঘেরাও হয়ে যায়, ডেভিডিয় দালানকোঠা পোড়ানো হয় ও আশিজন নারী, পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু ঘটে। আসলে প্রদর্শিত হয়েছিল গোষ্ঠীটি সম্পর্কে সরকারের অজ্ঞতা, অবরুদ্ধ ডেভিডিয়দের সামনে নিজেদের অসহায়ত্ব এবং ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের করুণ অপারগতা।
অন্যদিকে অধিকতর চরমপন্থী ক্রিশ্চানরা নিশ্চিতভাবেই সেক্যুলার সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একটি ফ্যাসিস্ট গ্রুপ ক্রিশ্চান আইডেন্টিটি-র কথা এই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়নি, তার কারণ তা মৌলবাদকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে তারা এবং প্রকৃতপক্ষে মৌলবাদকে নাকচ করে দেয়। আইডেন্টিটির সদস্যরা তুরীয় আনন্দের ধারণাকে ঘৃণা করে, তাদের বিশ্বাস এর ফলে আমেরিকান ধর্ম নপুংসক হয়ে গেছে: উত্তাল সময়ে তারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অকুস্থলে উপস্থিত থাকতে চায়। ভীষণভাবে অ্যান্টি-সেমিটিক এই গোষ্ঠীটি যায়নবাদের পক্ষে মৌলবাদীদের সমর্থন ঘৃণা করে, একে তারা মহাপাপ মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে ইহুদিরা আর্য জাতির কাছ থেকে মনোনীত জাতির উপাধী কেড়ে নিয়েছিল এবং এখন পবিত্র ভূমিও চুরি করেছে, ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনেই থাকা উচিত ছিল এর। অন্তিম কালের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ঘটবে, এটা তারা বিশ্বাস করে না, বরং সেটা ঘটবে আমেরিকায়। এক নতুন হলোকাস্টের ভবিষ্যদ্বাণী করে তারা, এতে শ্বেতাঙ্গ জাতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সুতরাং, তারা নিজেদের সেই বিপর্যয়ের জন্যে প্রস্তুত করছে। ফেডারেল সরকারের অত্যাসন্ন ধ্বংস দেখতে পাচ্ছে তারা, যাকে তারা শয়তান ও ইহুদিদের আধিপত্যে থাকা এবং আর্য জাতির ধ্বংসের লক্ষ্যে নিবেদিত যগ (যায়নিস্ট অকুপেশন গভর্নমেন্ট) আখ্যায়িত করে। কেউ কেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর পশ্চিম দূরবর্তী কোণে উগপন্থী গ্রুপে নিজেদের সংগঠিত করেছে। এখানে তারা আত্মরক্ষার কৌশল শেখে, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে ও শেষ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। কেউ কেউ ‘যগে’র উপর প্যারামিলিটারি হামলা চালায়, সরকারী কর্মচারীদের হত্যা করে। অন্যরা অ্যাবরশন ক্লিনিকে বোমাবর্ষণ করে, অগ্নিসংযোগ করে।১৩২ এই ধরনের আদর্শই ১৯৯৫ সালের ১৯শে এপ্রিল টিমোথি ম্যাকভেইকে ওকলাহোমা সিটিতে ফেডারেল বিল্ডিংয়ের উপর বোমা হামলায় প্ররোচিত করেছিল।
