অবশ্য, মৌলবাদের মৃত্যু ঘটেনি। সত্যি বলতে অমেরিকায় তা এক নতুন ও চরম পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ২৮শে নভেম্বর, ১৯৮৭, আপস্টেট নিউ ইয়র্কের এক নবজন্ম লাভকারী ক্রিশ্চান র্যান্ডাল টেরি তিন শো ‘উদ্ধারকারীকে’ নেতৃত্ব দিয়ে নিউ জার্সির চেরি হিলের এক অ্যাবর্শন ক্লিনিকে নিয়ে আসে। এখানে প্রায় এগার ঘণ্টা ধরে প্রার্থনা, শ্লোক গাওয়া এবং মহিলাদের ক্লিনিকে প্রবেশে বাধা দিয়ে তাদের বর্ণনা মতে ‘নরকের দ্বারপ্রান্তে’ ধর্মসভার আয়োজন করে। দিন শেষে ‘উদ্ধারকারীদের’ ২১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে বিজয়ীর সুরে উল্লেখ করে টেরি, ‘কোনও শিশু প্রাণ হারায়নি। ১২১ এটা ছিল মূলধারার সংস্কৃতিকে সহজাতভাবে খুনে বর্ণনা করে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী অপারেশন রেসকিউর প্রথম অ্যাকশন। ইমেজারি ছিল জঙ্গী। ১৯৮৮ সালে আটলান্টায় ডেমোক্রেটিক কনভেনশনের সময় এই আন্দোলনটি টেরির ভাষায় ‘আটলান্টা অবরোধ’ শুরু করেছিল, তখন শহরের অ্যাবরশন ক্লিনিকে প্রবেশে বাধা দানের অপরাধে তের শোরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন থেকেই কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে উদ্ধার দিবস পালন করে আসছে তারা এবং সম্ভাব্য উদ্ধারকারীদের জন্যে নারীবাদ ও উদার সরকারের অশুভের উপর ও তাদের লবিং কৌশল শেখাতে প্রশিক্ষণ লেকচারের ব্যবস্থা করেছে। নিজেদের ‘অপারেশনকে তারা ‘বাইবেলিয় ঔদ্ধত্য’ বলে বর্ণনা করেছে। ফলওয়েল ও রবার্টসনের বিপরীতে আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত ছিলেন টেরি। তাঁর লক্ষ্য ছিল মৌলবাদী: এমন এক ‘রাষ্ট্র গড়ে তোলা যেখানে আবারও জুডো-ক্রিশ্চান নীতি আমাদের রাজনীতি, আমাদের বিচার ব্যবস্থা ও আমাদের সরকারী নৈতিকতার ভিত্তি হবে; মানবতাবাদের অনিশ্চিত সাগরে ভাসমান কোনও জাতি নয়, বরং এমন এক দেশ ‘হাইয়ার ল’ যার অটল তলদেশ।’
কেবল অ্যাবরশন নিয়েই অভিযান ছিল না, ঠিক যেমন স্কোপস ট্রায়াল স্রেফ বিবর্তন সংক্রান্ত ছিল না। ১৯২০-র দশকের উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ানের মতো টেরি ও তাঁর উদ্ধারকারীদের বিশ্বাস ছিল যে, তাঁরা সেক্যুলার আধুনিকতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রকাশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। টেরি বিশ্বাস করেছেন যে, অপারেশন রেসকিউ সফল না হলে, ‘আমেরিকা টিকে থাকবে না।’ কিন্তু আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি: ‘আমাদের রয়েছে জনগণের সেনাদল,’ জোর দিয়েছেন তিনি, এবং এই অপারেশনের ফলে “শিশু হত্যা হ্রাস পাবে, শিশু নীল ছবি ও নীল ছবি, ইচ্ছা মৃত্যু, শিশু হত্যাকে অনুসরণ করবে…আমরা সংস্কৃতিকে আবার ফিরিয়ে নেব। ১২২ এটা ছিল আসন্ন বিপর্যয়কে প্রতিহত করে আমেরিকার সভ্যতাকে উদ্ধার করার লড়াই।
টেক্সাসের অর্থনীতিবিদ গ্যারি নর্থ ও তাঁর শ্বশুর রোউসাস জন রাশদুনি প্রতিষ্ঠিত রিকনস্ট্রাকশন আন্দোলনও সেক্যুলার মানবতাবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তবে মরাল মেজরিটির চেয়ে ঢের বেশি চরম রূপে। পুনর্গঠনবাদীরা আরও অধিকতর উদ্দীপ্তকারী আদর্শের খাতিরে প্রাচীন প্রিমিলেনিয়াল নৈরাশ্যবাদ বিসর্জন দিয়েছিল। মুসলিম মৌলবাদীদের মতো নর্থ ও রাশদুনি মূলত ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব নিয়েই উদ্বিগ্ন ছিলেন। এমন একটি ক্রিশ্চান সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা অবশ্যই শয়তানকে পরাস্ত করে মিলেনিয়াল রাজ্যের উদ্বোধন ঘটাবে। পুনর্গঠনবাদের মূল ধারণা ছিল আধিপত্য। ঈশ্বর অ্যাডাম ও পরে নোয়াহকে বিশ্বকে পরাস্ত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ক্রিশ্চানরা উত্তরাধিকারসূত্রে এই নির্দেশ লাভ করেছে, ক্রাইস্টের দ্বিতীয় আগমনের আগেই পৃথিবীর বুকে জেসাসের শাসন কায়েমের দায়িত্ব রয়েছে তাদের উপর। তবে ঈশ্বর যেহেতু আধুনিক রাষ্ট্রকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেবেন তাই এটা অর্জনের জন্যে ক্রিশ্চানের কোনও তৎপরতা চালাতে হবে না। ক্রিশ্চানরা স্রেফ ঈশ্বরের দেওয়া বিজয় লুফে নেবে।
ইতিমধ্যে পুনর্গঠনবাদীরা সেক্যুলার রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাবার পর অধিকার করে নেওয়ার জন্যে নিজেদের প্রশিক্ষিত করে তুলছে।১২৩ সহানুভূতির রীতি বিসর্জনের ভেতর দিয়ে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ক্রিশ্চান ধর্মের সম্পূর্ণ বিকৃতিতে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের আগমন ঘটার পর চার্চ ও রাষ্ট্রের আর কোনও বিভাজন থাকবে না। গণতন্ত্রের আধুনিক ধর্মদ্রোহীতার বিনাশ ঘটবে এবং কঠোর বাইবেলিয় ধারায় সমাজ নতুন করে সংগঠিত হবে। এর মানে বাইবেলের প্রতিটি আইনকে আক্ষরিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দাস প্রথা সূচিত হবে; জন্মনিয়ন্ত্রণ থাকবে না (কারণ বিশ্বাসীদের অবশ্যই ‘বৃদ্ধি ও বহুগুন’ হতে হবে); ব্যাভিচারী, সমকামী, ব্লাসফেমাস, জ্যোতির্বিদ ও ডাইনীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বাইবেল যেমন নির্দেশ দিয়েছে, অবিরাম অবাধ্য শিশুদের পাথর ছুঁড়ে হত্যা করতে হবে। কঠোর পুঁজিবাদী অর্থনীতি আরোপ করতেই হবে; সমাজবাদী ও বামপন্থার দিকে যারা ঝুঁকে আছে তারা পাপী। ঈশ্বর দরিদ্রদের পক্ষে নন। প্রকৃতপক্ষে, নর্থ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, দুষ্কৃতি ও দারিদ্র্যের ভেতর নিবিড় সম্পর্ক’১২৪ রয়েছে। করের অর্থ কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা যাবে না, কারণ, ‘অলসদের ভর্তুকী দান অশুভকে ভর্তুকী দানেরই শামিল।১২৫ তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে, নৈতিক বিকৃতি, পৌত্তলিকতা ও ডাকিনীবিদ্যার প্রতি আসক্তির কারণেই নিজেদের উপর অর্থনৈতিক সমস্যা ডেকে এনেছে তারা। বাইবেলে বিদেশী সাহায্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।১২৬ বিজয়ের অপেক্ষা করার মুহূর্তে-হয়তো এখনও বেশ সময় লাগবে বলে স্বীকার করেছেন নর্থ-ক্রিশ্চানদের অবশ্যই ঈশ্বরের নীল নকশা অনুযায়ী পৃথিবীকে গড়ে তোলার জন্যে প্রস্তুত হতে হবে এবং এইসব বাইবেলিয় রীতির সাথে খাপ খাওয়া সরকারী নীতিমালার সমর্থন করতে হবে।
