এরপর নতুন আতঙ্ক আলোর মুখ দেখে। জিম বেকার পিটিএল থেকে ইস্তফা দেন এবং জেরি ফলওয়েলকে সাময়িক কেয়ার টেকারের ভূমিকা পালন করে নেটওয়ার্কটিকে বাঁচাতে বলেন। জিম এরপর কেলেঙ্কারী ফাঁসকারী জিমি সোয়াগার্টের উপর চড়াও হয়ে বলেন যে, সোয়াগার্ট পিটিএল দখল করে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছিলেন। সোয়াগার্ট তাঁর দিক থেকে বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের কাজ করে যাচ্ছিলেন। এই সময় সোয়াগার্ট সম্ভবত সবচেয়ে সফল টেলিভেঞ্জালিস্ট ছিলেন। ১৪৫টি দেশে তাঁর শো প্রদর্শিত হওয়ার দাবি ছিল তাঁর, পৃথিবীর অর্ধেক বাড়িতেই দেখা যায়। কিন্তু লুইসিয়ানার বাটন রঁশে এক পতিতার বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছিলেন তিনি। পরে গল্প বিক্রি করে দেওয়া এই মহিলা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সোয়াগার্ট আচরিক অসম্মান ও অমর্যাদা করার চেয়ে যৌনতায় কম আগ্রহী ছিলেন। তিনি আত্মবিনাশকেও আলিঙ্গন করছিলেন বলে মনে হয়েছে, কারণ তিনি জানতেন মোটেলে লোকে তাঁকে দেখেছে ও চিনতে পেরেছে, কিন্তু তারপরেও সবকিছু ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত সেখানে যাওয়া অব্যাহত রেখেছেন। আরেক যাজক মারভিন গোরমান মারফত তাঁর অসঙ্গত আচরণ ফাঁস হয়েছিল, নিজের শোতে তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন সোয়াগার্ট ১১৬
সোয়াগার্ট পেন্টাকোস্টালিস্ট ছিলেন। আগের দিনে পেন্টাকোস্টালিজম ছিল মৌলবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর, যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে স্বর্গীয় সত্যকে অনির্বচনীয়তা দেওয়ার প্রয়াস। সুতরাং, যুক্তি বিসর্জন দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত অবচেতনে প্রবেশের শৃঙ্খলাহীন বিপদকে আলিঙ্গন করার ঝুঁকি সব সময়ই ছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ অবস্থায় আদি পেন্টাকোস্টালিজম অন্তর্ভুক্তি ও জাতিগত ও শ্রেণী বিভেদের সহানুভূতিপূর্ণ ভাঙন দিয়ে বৈশিষ্ট্যায়িত হয়েছিল। তবে সোয়াগার্ট ঘৃণার আদর্শ প্রচার করেছেন। সমকামীদের বিরুদ্ধে জঘন্য ভাষায় মুখখিস্তি করে বিখ্যাত হয়েছিলেন তিনি, প্রায় নিশ্চিতভাবেই নিজস্ব যৌন প্রবণতা সম্পর্কিত অবদমিত উদ্বেগই তুলে ধরেছে। তিনি অন্যান্য যাজক ও প্রতিদ্বন্দ্বী ইভাজেঞ্জালিস্টদের উপরও ভীষণভাবে চড়াও হয়েছিলেন, মরাল মেজরিটির জাজমেন্টাল ক্রুসেডেও যোগ দিয়েছিলেন। দয়া ও যুক্তির শৃঙ্খলার কারণে আরোপিত সংযম ঝেড়ে ফেলে সোয়াগার্ট এমন এক ধার্মিকতা বেছে নিয়েছিলেন যা আমাদের বিবেচিত অন্যান্য কিছু আন্দোলনের মতো নিজস্ব দিক থেকে আত্মবিনাশী ও নিহিলিস্টিক।
আমেরিকান সাংবাদিক লরেন্স রাইট সোয়াগার্টের আবেগময় প্রচারণার কায়দায় আকৃষ্ট বোধ করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছে সোয়াগার্ট যৌক্তিক আধুনিকতার কঠোরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন। এটা ‘উদ্ধতভাবে আবেগময়’ ছিল, রাইটের ছেলেবেলার ধর্মের ‘উষর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশোধন’ থেকে আলোক বর্ষ দূরে। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁর একটা অংশ সোয়াগার্টের ‘আমার নিজস্ব ব্যস্ত, বিচারিক, পরিহাসময় মানসিকতার পরমানন্দময় পরিত্যাগের’১১’র প্রতি আকর্ষণ বোধ করেছে। এবং সোয়াগার্টের দর্শকরাও তাই, যারা তাঁর অর্গাজিমিক প্রাচরণায় তুরীয় আনন্দে সাড়া দিয়েছিল:
নিজের অবচেতনের গভীর থেকে গভীরে ডুবে যান তিনি, যুক্তি ও সচেতন অর্থকে পাশ কাটিয়ে গভীরে বুদ্বুদ তুলতে থাকা ছিন্নভিন্ন আবেগ, অবদমিত ভীতি ও নামহীন আকাঙ্ক্ষায় অবতরণ করেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ওঠানামা করতে থাকে, কাঁপে, তাঁর ব্যাকরণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়, কিন্তু তারপরেও আকাঙ্ক্ষার ভীতু কাঁচা স্নায়ু বেয়ে উঠে যান। তিনি জানেন সেটা কোথায় থাকে। লোকে তাঁকে টানা ভীতি ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেখে, কারণ এই স্নায়ুই বিশ্বাসের সাথে বাঁধা। ভালোবাসা ও উদ্ধার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা-তিনি শেষে যখনই স্নায়ু স্পর্শ করেন, তখনই অশ্রু বইতে শুরু করে, দর্শক হাত তুলে উঠে দাঁড়ায়, কাঁদে, প্রভুর তারিফ করে, অজানা ভাষায় কথা বলতে থাকে, আর এই রোমাঞ্চকর পাবলিক এক্সপোজারের আনন্দ ও বেদনায় কাঁপতে থাকে। ১১৮
জন অভ দ্য ক্রস, ইসাক লুরিয়া বা মোল্লাহ সদরার মতো সেরা প্রাক আধুনিক আধ্যাত্মিকতা এর সাথে ধর্মের কোনওই সম্পর্ক নেই দাবি করে এই ধরনের আবেগীয় বাড়াবাড়ি এড়িয়ে গেছেন; তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন, অন্তস্থঃ যাত্রা ছিল শান্ত, শৃঙ্খলিত এবং যুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ। অন্তত চল্লিশ বছর বয়স এবং বিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই কাব্বালায় যোগ দানের অনুমতি দেওয়া হত না, তাকে যৌন ভারসাম্য অর্জন করতে হত। জ্ঞানের অধিকতর স্বজ্ঞাপ্রসূত পথ অবহেলাকারী আধুনিক বিশ্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অতীন্দ্রিয় লোককথা হারিয়ে ফেলেছে। সোয়াগার্টের সাফল্য এক অতি যৌক্তিক বিশ্বে লোকের পরমানন্দের জন্যে আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে, তবে আবার এই ধরনের অনুসন্ধানের ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে। সোয়াগার্টের উন্মাদনার সাথে আধ্যাত্মিকতার চেয়ে তাঁর যৌন চাহিদারই বেশি সম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়, যা তাঁকে বাটন রুশ মোটেলে (ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাইটের ভাষা ব্যবহার করে বলা যায়) ‘রোমাঞ্চকর পাবলিক এক্সপোজারে’র দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
কিন্তু তারপরেও মৌলবাদী বিশ্বাসের ব্যর্থতা কেলেঙ্কারীর সময় টেলিভেঞ্জালিস্টদের পরস্পরের প্রতি প্রদর্শিত ক্রোধ ও ঘৃণার চেয়ে অন্য কোনও কিছুতেই এত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি। জেসিকা হানের সাথে বেকারের যৌন সম্পর্কের খবর পাওয়ার পর সোয়াগার্ট ‘ফ্রেঞ্চ পুডলের উপর পিট বুলডগের মতো জিমি বেকারের উপর হামলে পড়েছিলেন,’ স্মৃতিচারণ করেছেন সোয়াগার্টের এক সাবেক সহকারী। ‘স্রেফ তাঁকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলেছেন। ১১৯ এরপর পিটিএলকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসা জেরি ফলওয়েলের উপ চড়াও হন বেকার, তাঁর বিরুদ্ধে নেট ওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ পেতে পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর অভিযোগ আনেন। সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে এর প্রতিশোধ নেন ফলওয়েল, এখানে জি বেকারের সাথে সমকামী সম্পর্ক ছিল এমন দাবিদারদের শপথ গ্রহণের পর দেওয়া এফিডেফিট উপস্থাপন করেন তিনি, তার সাথে ট্যামি ফেইর একটা চিরকুট, চুপ থাকার জন্যে পিটিএল-এর কাছে থেকে তিনি কী পেয়েছেন তার একটা তালিকা: জিমের জন্যে বছরে ৩০০,০০০ ডলার, ও নিজের জন্যে ১০০,০০০ ডলার; পিটিএল-এর সব রেকর্ড ও বইয়ের রয়্যালটি; ওদের ৪০০,০০০ ডলারের ম্যানশন, দুটি গাড়ি, নিরাপত্তা প্রহরী, আইনি ফি, এবং সেই সাথে বেকারদের দারুণভাবে অনিয়মিত আর্থিক অবস্থাকে সামাল দেওয়ার প্রয়াসরত অ্যাকাউন্ট্যান্টদের পারিশ্রমিক। মহা মৌলবাদী প্রতিষ্ঠানটি যেন এক বন্ধ্যা, রুচিহীন কুল-দে-স্যাকে পরিণত হয়েছিল। কেলেঙ্কারীর আগের বছর আস্থায় পরিপূর্ণ ছিলেন ফলওয়েল। মরাল মেজরিটির নতুন রাম রেখেছিলেন, ‘দ্য লিবার্টি ফেডারেশন’ এবং এর বহু সদস্য ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে স্থানীয়, রাজ্য ও ফেডারেল পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু পিটিএল বিপর্যয়ের পর ১৯৮৭ সালের ৪ঠা নভেম্বর মরাল মেজরিটি ও লিবার্টি ফেডারেশন-এর প্রেসিডেন্সি থেকে ইস্তফা দেন ফলওয়েল; তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবার ঘোষণা দেন। রোনাল্ড রেগানের বেলায় যেমন করেছিলেন সেভাবে আর কখনওই কোনও প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন না ও কোনও আইনের পক্ষে লবি করবেন না। কেলেঙ্কারীর পথ ধরেই তাঁর নিজস্ব ওল্ড টাইম গস্পেল আওয়ারের আয় কমে যায়, তাঁর নিজস্ব গস্পেল মিনিস্ট্রিতে ফিরে যেতে বাধ্য হন ফলওয়েল।১২০ আজও মাঝে মাঝে জাতির অসুস্থতা নিয়ে বিলাপ করার জন্যে আবির্ভূত হন বটে, কিন্তু ঝড়ের বেগে আমেরিকাকে দখল করে নেওয়ার মতো ধর্মীয় রক্ষণশীলদের একটা আসন্ন কোয়ালিশন গড়ে তোলার মতো আশা করতে পারেন না। প্যাট রবার্টসনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রয়াস ব্যর্থ হলে ১৯৭৯ সালে সূচিত মৌলবাদী আক্রমণও ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হয়। অপদস্থ নিউ ক্রিশ্চান রাইট অমর্যাদাকরভাবে উবে গেছে বলে মনে হয়েছে। ক্রিশ্চানরা ব্যক্তিগতভাবে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার চেষ্টা ও লবি করে গেলেও সাধারণভাবে মৌলবাদী হুমকির অবসান ঘটেছে বলেই ধরে নেওয়া হয়।
