বেকারদ্বয় প্রধানত তাদের ক্রিশ্চান থিম পার্ক হেরিটেজ ইউএসএ-র জন্যে পরিচিত, ডিজনি কায়দায় আমেরিকায় ইভাঞ্জেলিকাল অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে, বিপুল সংখ্যক দর্শককে তা আকৃষ্ট করেছে। এক কৌতূহলোদ্দীপক নিবন্ধে আমেরিকান নৃতত্ত্ববিদ সুসান হার্ডিং বলেছেন, বেকারদ্বয় খুবই সচেতনভাবে ফলওয়েলের সাধারণ জ্ঞানের ধার্মিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মৌলবাদকে এক নতুন উত্তর আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন।১১৩ উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকেই আমেরিকান মৌলবাদীরা আধুনিকতার চ্যলেঞ্জের প্রতি তাদের বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক করে তোলার মাধ্যমে সাড়া দিয়ে এসেছে। তারা যুক্তির গুণ ও কাণ্ডজ্ঞানের উপর জোর দিয়েছে; কল্পনা ও ফ্যান্টাসিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া এক ধরনের শোভন অক্ষরবাদকে আলিঙ্গন করেছে; বিশ্বকে একটি আবদ্ধ কক্ষে পরিণত করেছে তারা যেখানে সত্যি ভ্রান্তি থেকে একেবারেই ভিন্ন ও স্পষ্ট, সত্যিকারের বিশ্বাসীরা সেক্যুলারিস্ট ও উদার ক্রিশ্চানদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। বিচ্ছিন্নতার নীতি ছিল তাদের; মৌলবাদীরা এমন এক প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল যার ঈশ্বরহীন মূলধারা যা নয় তার সবই হওয়ার কথা ছিল: এটা এমন এক বিশ্বাস যা সন্দেহ, উন্মুক্ত প্রশ্ন ও আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তনশীল ভূমিকা চ্যালেঞ্জ করতে ইস্পাত কঠিন নিশ্চয়তা ও ক্ষমতাক্রমের যোগান দেয়। হেরিটেজ ইউএসএ অবশ্য অন্যান্য প্রাক আধুনিক সংস্কৃতির মতো বিভিন্ন ঘরানা, নাটক, আমোদ ও জাঁকাল দৃশ্য দিয়ে বৈশিষ্ট্যায়িত ছিল।
ধর্মবিশ্বাসকে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক করে তুলে মৌলবাদীরা ধর্মকে অস্বাভাবিক চেহারা দিয়েছিল। প্রকল্প ও স্বাধীন অনুসন্ধান ভিত্তিক ডারউইনের বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সময় মৌলবাদীরা যেমন বেকনিয় আদর্শ আঁকড়ে ছিল ঠিক তেমনি এখন বেকারদ্বয় ফলওয়েলদের মতো প্রাচীনপন্থী মৌলবাদীদের যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছিলেন। হার্ডিং যেমন দেখিয়েছেন, আমেরিকান ইতিহাসের বর্ণনায় হেরিটেজ ইউএসএ বিচিত্র মিশ্রণে বিভিন্ন ধরনের একটা মিশেল। সত্য বাস্তবভিত্তিক বলে জোর দেওয়ার বদলে হেরিটেজ ইউএসএ-র প্রদর্শন সামগ্রীগুলো পার্কে তাদের কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক সংযোজন তুলে ধরে। শপিং মল ছিল ভিক্টোরিয়ান ও উপনিবেশিক স্থাপত্যের জগাখিঁচুরি, স্টাইল ও কালের সারগ্রাহী মিশ্রণ যা সত্য প্রতিপাদনের কোনও প্রয়াস পায়নি। প্রবেশ পথে বিলি গ্রাহামের ‘আসল’ আবাস প্রদর্শিত হয়েছে, কিন্তু আদি স্থান থেকে স্থানান্তরের অংশ হিসাবে তার দেয়ালে থিম পার্কে এর ভাঙা ও পুনর্নির্মাণের ছবি ছিল। জেরুজালেমের উপরের কামরার একটা ‘হুবহু’ প্রতিলিপি রয়েছে (যেখানে জেসাস লাস্ট সাপারে অংশ গ্রহণ ও ইউক্যারিস্ট সূচনা করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়), কিন্তু ইচ্ছা করেই একে রিপ্রোডাকশনের মতো তৈরি করা হয়েছে। এক টেলিভিশন স্টুডিওতে চার্চ সার্ভিস অনুষ্ঠিত হত, আর ফলওয়েলের বিপরীতে বেকরদ্বয় কখনওই নিয়মিত কমিউনিয়ন সার্ভিস বা সারমন সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেননি। সবসময়ই আক্ষরিক মৌলবাদী বিশ্বের চেয়ে পারফরম্যান্স, দর্শন ও ফ্যান্টাসির উপর জোর দেয়া হয়েছে।
হার্ডিং মত প্রকাশ করেছেন যে, বেকারদ্বয় ঈশ্বরের অন্তহীন ভালোবাসার উপর জোর দিলেও এক অন্তহীন ক্ষমার লোকজ ধর্মতত্ত্বও গড়ে তুলছিলেন, যা আগেই স্বর্গীয় ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে প্রায় পাপকে নাকচ করার মতোই ছিল। ১১৪ আমরা দেখেছি, অতীতে নৈতিকতা বিরোধী বিদ্রোহ অনেক সময় ক্রান্তিকালেই সূচিত হয়েছে। কোনও কোনও বিশ্বাসীর কাছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রাচীন নিয়ম ও জীবনধারা মানানসই বোধ হয় না, নিজেদের রুদ্ধ ভেবে নতুন কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে তারা। প্রাচীন টাবু লঙ্ঘন করে স্বস্তি পায়। অনেকে এমনকি ‘পবিত্র পাপে’র মতো ধর্মতত্ত্বও গড়ে তুলেছে। ১৯৮১ সালের মার্চে জাতিকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা কেলেঙ্কারীর সংবাদ প্রকাশ পাওয়ার পর মনে হয়েছিল এই ধরনের কিছু একটা পিটিএল বলয়েও ঘটে থাকতে পারে। শার্লট অবজার্ভার অভিযোগ তোলে যে ১৯৮০ সালে জিম বেকার লং আইল্যান্ডের এক চার্চ সেক্রেটারি জেসিকা হানকে মাদক সেবণ করিয়ে বলাৎকার করার পর তার মুখ বন্ধ রাখতে ২৫০,০০০ ডলার দিয়েছেন।১১৫ এই পর্যবেক্ষণের পথ বেয়েই জানা যায় যে ট্যামি ফেই কান্ট্রি ও ওয়েস্টার্ন সিঙ্গার গ্যারি প্যাক্সটনের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে উঠেছিলেন যে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘাটিয়েছিলেন তিনি। এমনি নোংরা সত্য প্রকাশ পেলেও বেকারদ্বয় অবশ্য গ্লানিতে কুকড়ে যাননি, বরং তাদের বিশাল টেলিভিশনে ঈশ্বরের ভালোবাসা ও ক্ষমার কথা বলে জনগণের সামনে অনুশোচনা করেছেন।
লিঞ্চবার্গে ফলওয়েলের গোষ্ঠীর রক্ষণশীল প্রাক আধুনিক ধর্মের বিধিনিষেধ আঁকড়ে থাকার প্রয়াস ছিল; মানুষকে প্রয়োজনীয় সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে সাহায্য করেছে। এইসব বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ নাকচ করে দেওয়া হলে কী ঘটে বেকারদের কাহিনী সেটাই তুলে ধরে। অন্য মৌলবাদী আন্দোলন যেখানে দমনের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভুত হয়েছে, বেকারদের উত্তর আধুনিক ক্রিশ্চানিটি বিংশ শতাব্দীর শেষপাদের ‘সবকিছুই চলা’র বিশ্বাস তুলে ধরেছে। হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকায় বেকাররা মনে করেছিলেন তাঁরা যা ইচ্ছে করতে পারেন। কোনও সীমা নেই, হেরিটেজ ইউএসএ সত্য ও কল্পনার মতোই ভালো-খারাপের প্রাচীন শ্রেণী বিভাগ অনায়াসে মুছে ফেলা সম্ভব। খৃস্টধর্মের বিকৃতি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
