ইসরায়েল রাষ্ট্রের উপর ইহুদিবাদের কৃৎসিত ও বিকৃত ভাষ্য চাপিয়ে দেওয়া। এই কাল্টের আসল মতলব হচ্ছে আরবদের বহিষ্কার করা যাতে পরে ইহুদিদের উপর নির্যাতন চালানো যায়, তাদের মিথ্যা পয়গম্বরদের নিষ্ঠুরতার অধীনে আমাদের সবাইকে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়।১০৮
ধার্মিক ও সেকুলারিস্টদের প্রত্যেকেই পরস্পরের দিকে ভীতির সাথে তাকায়। কেউ অপরকে স্পষ্ট দেখতে পায় না। উভয় পক্ষই অপর পক্ষের বাড়াবাড়ি, নিষ্ঠুরতা ও অহিষ্ণুতার কথা বলে এবং অন্তস্তলে আঘাত করে, শান্তি স্থাপন করতে পারে না।
*
আমেরিকাতেও মেরুকরণ ও বৈরিতা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় মৌলবাদীদের অনেক বেশি সংযত ও আইননিষ্ঠ মনে হয়েছে। মৌলবাদীরা তাদের প্রেসিডেন্টকে হত্যা করেনি, বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়নি বা জিম্মি আটক করেনি। কিন্তু তাসত্ত্বেও আমেরিকান ধর্মের ক্ষেত্রে এক গভীর খাদ অস্তিত্ববান ছিল। জরিপে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধার্মিক জনগণ পরিষ্কার প্রায় সমান পরস্পর বৈরী শিবিরে বিভক্ত। ১৯৮৪ সালে পরিচালিত এক গ্যালপ পোলে দেখা গেছে ৪৩ শতাংশ আমেরিকান নিজেদের ‘উদারপন্থী’ আখ্যায়িত করেছে এবং ৪১ শতাংশ ‘রক্ষণশীল’; এবং প্রধান গোষ্ঠীগুলো ঠিক মাঝখানে বিভক্ত ছিল। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীই বিভাজন ‘মারাত্মক’ বলে দাবি করেছে; ‘অপর পক্ষ’ সম্পর্কে তারা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে, যা অন্যান্য কুসংস্কারের মতোই বৃহত্তর যোগাযোগ স্থাপিত হলেও হ্রাস পায়নি।১০৯ অন্যান্য জরিপে দেখা গেছে মাত্র ৯ শতাংশ আমেরিকান নিজেদের ‘মৌলবাদী’ বলে স্বীকার করলেও প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদের মৌল বিধিগুলো আরও ব্যাপকভাবে পালন করা হয়েছে।
৪৪ শতাংশ বিশ্বাস করে জেসাস ক্রাইস্টের মাধ্যমেই নিষ্কৃতি এসেছে।
৩০ শতাংশ নিজেদের ‘পুনর্জন্মলাভকারী’ হিসাবে বর্ণনা করেছে।
২৮ শতাংশ বিশ্বাস করে বাইবেলের প্রতিটি শব্দ আক্ষরিকভাবেই পড়তে হবে।
২৭ শতাংশ বাইবেলে বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ভ্রান্তি থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।১১০
আমেরিকান মৌলবাদের সাফল্য সম্পূর্ণ জেরি ফলওয়েল ও অন্য টেলিভেঞ্জালিস্টদের দক্ষ বিপনন কার্যক্রমের ফলে হয়নি। আমেরিকান সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনে ধর্মবিশ্বাসের এই অক্ষরবাদী ধরনের উপাদানের অস্তিত্ব ছিল, যা এক উর্বর ভূমির যোগান দিয়েছে।১১১
১৯৮০-র দশকে অবশ্য মৌলবাদ এক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। কোনও প্রেসিডেন্টের হত্যাকাণ্ড ঘটেনি, বা সন্ত্রাসী কোনও অভিযানের ব্যাপার ছিল না। তার বদলে মৌলবাদী আদর্শ চরিত্রগতভাবে বিধ্বংসী ও নিহিলিস্টিক এক কেলেঙ্কারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, টেলিভেঞ্জালিস্টদের তা তুচ্ছতা, অর্থ-লুণ্ঠন ও যৌন ষড়যন্ত্রের এক অথৈ সাগরে নিক্ষেপ করেছিল। ১৯৮৭ সালের টেলিভিশন কেলেঙ্কারীর পেছনে আমেরিকান মৌলবাদের প্রকৃতির কোনও অবদান সংক্রান্ত কিছু কি ছিল?
মতবাদের ক্রিশ্চান উদ্বেগের কারণে প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদ আমাদের বিবেচিত অন্যান্য আন্দোলন থেকে এক ভিন্ন দিক গ্রহণ করেছিল। অনুশীলনের উপর ইহুদি ও মুসলমিদের গুরুত্ব আরোপের মানে ছিল এই দুটি ধর্মের মৌলবাদীরা তাদের ঐতিহ্যের মিথকে আদর্শে পরিণত করেছে। এইসব মিথলজিকে বাস্তব জাগতিক কর্মকাণ্ডে প্রয়োগের প্রয়াস পেয়েছিল বলেই তাদের কোনও কোনও বাড়াবাড়ির ঘটনা ঘটেছিল। তারা দক্ষতার আধুনিক মানদণ্ডকে অর্জন করতে চেয়েছে, যেখানে কোনও ‘সত্য’কে গুরুত্বের সাথে নিতে হলে তাকে কার্যকর হতে হয়। ইহুদি ও মুসলিম মৌলবাদীরা বাস্তব ফল অর্জনের জন্যে তাদের মিথোইকে বাস্তব লোগোইতে পরিণত করেছিল। প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা মিথকে ভিন্নভাবে বিকৃত করেছে। তারা ক্রিশ্চান মিথকে বৈজ্ঞানিক সত্যে পরিণত করে এমন এক সংকরের সৃষ্টি করেছিল যা ভালো বিজ্ঞান বা ভালো ধর্মের কোনওটাই নয়। এটা গোটা আধ্যাত্মিকতার ট্র্যাডিশনকে পাল্টে দিয়েছে; ফলে বিরাট চাপের সৃষ্টি হয়েছে, কারণ ধর্মীয় সত্য প্রকৃতিগতভাবে যৌক্তিক নয় এবং তাকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করাও সম্ভব নয়। প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা স্বজ্ঞামূলক ও অতীন্দ্রিয়কে উপেক্ষা করতে চায় বলে তারা অবচেতন, ব্যক্তিত্বের গভীরতর প্রবণতার সাথে সম্পর্কও হারিয়ে ফেলেছিল। এর ফলে আমেরিকান পুনর্জাগরণ অনেক সময় অরাজক ও উন্মাদসুলভ ছিল। ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে কোনও কোনও মৌলবাদী এই যৌক্তিক ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্যে তৈরি হয়েছিল। আমরা যেমন দেখেছি, যৌনতা মৌলবদীদের পক্ষে সমস্যা-সঙ্কুল ছিল, তাদের অনেককেই সক্ষমতা ও লিঙ্গ সীমা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন মনে হয়েছে। সম্ভবত বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর সেটার যৌন রূপ পরিগ্রহ করার ব্যাপারটি বিস্ময়কর ছিল না।
টেলিভিশন ও এর সাথে অনেক সময় দেখা দেওয়া গণতোষামোদ আধ্যাত্মিকভাবে অসতর্কদের পক্ষে ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিত্বের কাল্টে সংশ্লিষ্ট নার্সিসিজম আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকে বৈশিষ্ট্যায়িত করা অহমকে অতিক্রম করার সাথে কেবল বেমানানই নয়, বরং টেলিভেঞ্জালিস্টরা বাস্তবের সাথেও সম্পর্ক খোয়াতে পারেন। সফল নেটওয়ার্কগুলো যে বিপুল অংকের টাকাকড়ির মালিক হতে পেরেছিল তার সাথে পার্থিব সম্পদ পুঞ্জীভূত করার প্রয়াস ত্যাগের গস্পেল দাবি খাপ খায় না। উত্তর ক্যারোলিনার পিটিএল (প্রেইজ দ্য লর্ড অ্যন্ড পিপল দ্যাট লাভ)-এর জিমি ও টামি ফেই বেকার তাদের অতি বিলাসী জীবনযাত্রার কারণে বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। শার্লোট অবজার্ভার বেশ কয়েক বছর ধরে বলে আসছিল যে, দর্শকদের উৎসর্গ করা ও টাকাপয়সা দরিদ্রদের বিলিয়ে দেওয়ার তাগিদ দিলেও বেকারদ্বয এক ওশান ফ্রন্ট কন্ডোমিনিয়ামের পেছনে ৩৭৫,০০০ ডলার ও মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু আয়নার পেছনে ২২,০০০ ডলার খরচ করেছেন।১১২ এসবই লিঞ্চবার্গের জেরি ফলওয়েলের গোষ্ঠীর চেয়ে দুরস্ত, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণই যার বৈশিষ্ট্য।
