১৯৬৭ সালের পর বিশ্বব্যাপী মুসলিম ধর্মীয় পুনর্জাগরণে প্যালেস্তাইনিরা জড়িত হয়নি। আরবদের পরাজয়ে তাদের সাড়া রাজনৈতিক, সেক্যুলারিস্ট, ও জাতীয়তাবাদী ছিল। ইয়াসির আরাফাত প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে পুনর্গঠিত করেন এবং প্যালেস্তাইনি সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে গেরিলা অপারেশন, সন্ত্রাস ও কূটনীতির সূচনা করেন। এটা চরমভাবে সেক্যুলার আন্দোলন ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে পিএলও জাতীয়তাবাদীরা গাযা স্ট্রিপে আরিয়াল শ্যারন কর্তৃক দমনের শিকার হলে শেখ আহমাদ ইয়াসিন মুজামাহ (‘কংগ্রেস’) নামে একটি মুসলিম সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন; এই প্রতিষ্ঠানটি মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্কিত ধরনের কল্যাণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। ১৯৮৭ সাল নাগাদ মুজামাহ স্ট্রিপে যাকাত (ইসলামি কর), তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো ও মুজামাহকে সমর্থন করেন পিএলওকে খাট করার আশায় ইসরায়েলের সমর্থনে তারা একটি দাতব্য সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, যার ভেতর ক্লিনিক, মাদকাসক্তি নিরাময় কার্যক্রম, তরুণ সংঘ, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ও কোরান ক্লাস অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পর্যায়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে আগ্রহী ছিলেন না ইয়াসিন। তিনি সংস্কারক ছিলেন, ইসলামি প্রেক্ষাপটে গাযায় আধুনিকতার ফল বয়ে আনতে চেয়েছিলেন। জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে প্যালেস্তাইনের আত্মার পক্ষেও লড়াই করছিলেন তিনি: তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্যালেস্তাইনি জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয় সেক্যুলার না হয়ে মুসলিম হওয়া উচিত। মুজামাহর জনপ্রিয়তা দেখায় যে, বহু প্যালেস্তাইনি একমত হয়েছিল। আরাফাতকে নিয়ে তারা গর্ব করলেও তাঁর সেক্যুলারিস্ট রীতি কেবল পাশ্চাত্য আধুনিক শিক্ষার সুফল লাভ করা এক অভিজাত গোষ্ঠীর কাছেই অর্থপূর্ণ ছিল।১০০
মিশরের জিহাদ সংগঠনের অনুরূপ আন্ডারগ্রাউন্ড সেলের নেটওয়ার্ক ইসলামিক জিহাদের আদর্শ ছিল আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামিক জিহাদ প্যালেস্তাইনি ট্র্যাজিডিকে ধর্মীয় পরিভাষায় ব্যাখ্যা করে সায়ীদ কুতবের আদর্শ প্রয়োগ করেছে। তাদের বিশ্বাস ছিল, বর্তমানে প্যালেস্তাইনের সেক্যুলার সমাজ জাহিলি। ইসলামিক জিহাদের সদস্যরা নিজেদের ভ্যানগার্ড মনে করেছে, ‘ঔদ্ধত্যের শক্তির বিরুদ্ধে-সারা বিশ্বের সমস্ত উপনিবেশবাদী শক্তির বিরুদ্ধে’ যুদ্ধ করছে, ব্যাখ্যা করেছেন তাদের আদর্শিক নেতা শেখ আউদা। উম্মাহর ভবিষ্যতের স্বার্থে লড়াই করছে তারা। মুজামাহর বিপরীতে ইসলামিক জিহাদ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে আগ্রহী ছিল। এর লক্ষ্য ছিল ধর্মীয়। উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে পশ্চিম প্রাচীরে আইডিএফ-এর এক পরিচিতি অনুষ্ঠানে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের সমাবেশে হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে এর কর্মীরা এক নবনিযুক্তের পিতাকে হত্যা: করে। এই সময় পর্যন্ত সংগঠনটি গাযা থেকে পশ্চিম তীর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল।১০১
১৯৮৭ সালের ৯ই ডিসেম্বর ইন্তিফাদা নামে পরিচিত জনপ্রিয় প্যালেস্তাইনি গণজাগরণ গাযায় শুরু হয়ে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৭ সাল থেকে প্যালেস্তাইনিদের একটা গোটা প্রজন্ম ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে এইসব অঞ্চলে বেড়ে উঠেছে; প্যালেস্তাইনি স্বাধীনতা আনতে ব্যর্থ পিএলও নেতৃত্বের উপর অধৈর্য এবং তাদের চোখে এক নিপীড়ক বিদেশী শক্তির অধীনে বাস করে প্রতিদিন অপমান ও ভোগান্তির শিকার হয়ে হতাশার শিকার হয়ে পড়েছিল তারা। ইসরায়েলিদের আশা ছিল তাদের শাসনাধীনে অধিকৃত এলাকার আরবরা এক সময় হাল ছেড়ে দেবে। কিন্তু ১৯৮৭ সাল নাগাদ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় পৌছে গিয়েছিল। একটি প্যালেস্তাইনি রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। এই নতুন বিদ্রোহের তরুণ নেতৃত্ব দখলদারিকে খাট করার দিকে প্রযুক্ত হয়; প্রতিটি প্যালেস্তাইনিকে অংশ গ্রহণে উৎসাহিত করে তারা, তো নারী ও শিশু বন্দুক ও শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া না করে ইসরায়েলি সৈন্যদের লক্ষ্য করে ইটপাথর ছুঁড়েছে। ইন্তিফাদা আরব বিশ্ব ও অভ্যন্তরীণ সম্প্রদায়কে মুগ্ধ করেছিল; ইসরায়েলি শান্তি আন্দোলনেরও গতি বাড়িয়েছিল তা, কারণ এটা জোরালভাবে প্যালেস্তাইনিদের যেকোনও মূল্যে ইসরায়েলি আধিপত্য থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তি লাভের ইচ্ছা তুলে ধরেছিল। ইন্তিফাদা ইত্যহাক রাবিনের মতো অপেক্ষাকৃত কট্টরপন্থীদের উপরও প্রভাব রেখেছিল, সৈনিক হিসাবে আইডিএফ ব্যবহার করে নারী ও শিশুদের নতি স্বীকার করানোর অসম্ভাব্যতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি। ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী হলে রাবিন পিএলও-র সাথে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নেন, এবং পরের বছর ইসরায়েল ও পিএলও অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
কিন্তু ইন্তিফাদার গোড়ার দিকের দিনগুলোতে প্যালেস্তাইনি সংগ্রামকে নিশ্চিতভাবে নিহিলিস্টিক ইসলামি মাত্রা দিয়ে একটি নতুন সংগঠন গড়ে উঠেছিল। ইন্তিফাদার নেতৃত্ব সেক্যুলারিস্ট ছিল, কিন্তু মুজামাহর কিছু সদস্য হামাস (হাকামাত আল-মুকাওয়ামাহ আল-ইসলামিয়াহ: ইসলামি রেনেসাঁ মুভমেন্ট) প্রতিষ্ঠা করেন, এই সংগঠন ইসরায়েলি দখলদারি ও প্যালেস্তাইনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে একই সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। প্যালেস্তাইনের মুসলিম পরিচয়ের স্বার্থে সেক্যুলারিস্টদের বিরুদ্ধে লড়ছিল তারা, তরুণরা দল বেঁধে হামাসে যোগ দিয়েছে। অনেকেই শরণার্থী শিবির থেকে আগত, বাকিরা ছিল মধ্যবিত্ত ও উচু পদের কর্মী। আবারও, নির্যাতনের মুখে জন্ম নেওয়া সহিংস আন্দোলন ছিল এটা। ১৯৯০ সালের ৮ই অক্টোবর হারাম আল-শরীফে সতের জন প্যালেস্তাইনি উপাসককে হত্যার পর হামাস সন্ত্রাস বেড়ে ওঠে। নিশ্চিহ্নতার ভীতিতে তাড়িত হামাস ইসরায়েলের দালাল ধরে নিয়ে প্যালেস্তাইনিদের উপরও হামলা করে। ‘আমাদের শত্ররা সকল শক্তি দিয়ে আমাদের জাতির অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করছে,’ ১৯৯৩ সালে ব্যাখ্যা করেছিলেন একজন মুখপাত্র। সুতরাং ইসরায়েলের সাথে যেকোনও রকমের সহযোগিতাই ‘মারাত্মক অপরাধ।’১০২ ইসলামিক জিহাদের মতো হামাস আরব- ইসরায়েল বিরোধকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখেছে। এর সদস্যদের বিশ্বাস ছিল, জনগণের ধর্মীয় দায়িত্ব অবহেলাই প্যালেস্তাইনি ট্র্যাজিডি সৃষ্টির কারণ; কেবল ইসলাম ফিরে গেলেই প্যালেস্তাইনিরা ইসরায়েলি শাসন ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হবে।১০৩ হামাস বিশ্বাস করেছে যে, ইহুদি ধর্মের কারণেই ইসরায়েলের সাফল্য এসেছে, ইসরায়েল ইসলামের ধ্বংস নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।১০৪ সুতরাং, আত্মরক্ষার স্বার্থে যুদ্ধ করার দাবি তুলেছে তারা। বারুচ গোল্ডস্তেইন হেব্রনে প্যালেস্তাইনি উপসকদের হত্যা করার পর হামাস জীবনের বিনিময়ে জীবন নেওয়ার শপথ করেছিল। অ্যাক্টিভিস্টরা শোকের চল্লিশ দিন পেরুনোর অপেক্ষা করার পর একজন আত্মঘাতী বোমাবর্ষণকারী অধিকৃত এলাকায় নয়, মূল ইসরায়েলের আফুলায় সাতজন ইসরায়েলি নাগরিককে হত্যা করে। এক সপ্তাহ পরে, ১৯৯৪ সালের ১৩ই এপ্রিল, আরেকজন আত্মঘাতী বোমাবর্ষণকারী হাদেরায় এক জনাকীর্ণ বাসে পাঁচজন ইসরায়েলিকে হত্যা করে। সহিংসতা নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়।
