অবশ্য শত শত বছর ধরে জেরুজালেমে মুসলিম ও ইহুদিদের ভেতর টানাপোড়েন ছিল না; ইহুদিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, ৭০ সিই-তে রোমানদের হাতে বিধ্বস্ত তাদের মন্দিরটি কেবল মেসায়াহর হাতেই আবার পুনর্নির্মিত হতে পারে, সুতরাং মুসলিমদের হারাম আল-শরীফ (সবচেয়ে মহান অভয়স্থান) আখ্যায়িত এই এলাকা নিয়ে তাদের কোনও পরিকল্পনা ছিল না। ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ইহুদি বিশ্বের পবিত্রতম স্থান ছিল ডোম অভ দ্য রকের ঠিক নিচে প্রথম শতাব্দী সিই-তে সম্রাট হেরোদ নির্মিত মন্দিরের শেষ চিহ্ন পশ্চিম প্রাচীর। অটোমান সুলতান সুলেইমান দ্য ম্যাগনিফিশেন্ট (১৪৯৪-১৫৬৬) ইহুদিদের এটাকে আনুষ্ঠানিক স্যাংকচুয়ারি বানানোর অনুমতি দেন এবং বলা হয়ে থাকে, তাঁর দরবারের স্থপতি সিনান সেখানে সাধারণ উপাসনালয়ের নকশা করেছিলেন।
আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ পবিত্র নগরে মুসলিম ও ইহুদিদের এই সম্প্রীতির কালের অবসান ঘটায়, এবং ১৯২০-র দশকে থেকে পবিত্র এলাকাটি বহু সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পূর্ব জেরুজালেম ও পুরোনো শহর জর্দানের অধিকারে থাকার সময় ইহুদিদের পশ্চিম প্রাচীর সফরের অনুমতি ছিল না, পুরোনো শহরের ইহুদি এলাকার প্রাচীন সিনাগগগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে ইহুদিদের পশ্চিম প্রাচীরে প্রত্যাবর্তন ছিল ছয় দিনের যুদ্ধের অন্যতম আবেগঘন দৃশ্য, এমনকি সেক্যুলার ইহুদিদের কাছেও গভীরভাবে আধ্যাত্মিক ঘটনা হিসাবে তা অনুভূত হয়েছে।
যুদ্ধের পর ইসরায়েল জেরুজালেম অধিগ্রহণ করার সময় কথা দিয়েছিল যে, ক্রিশ্চান ও মুসলিমরা তাদের পবিত্র স্থানে অনিরুদ্ধ প্রবেশাধিকার পাবে। মুসলিমরা হারাম আল-শরীফের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, যদিও সরকারী এই নীতি অতিজাতীয়তাবাদী ইসরায়েলি ও অতি চরমপন্থী ধার্মিক যায়নবাদীদের কারওই পছন্দ ছিল না, তাদের কথা ছিল একে ইহুদিদের ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। অবশ্য আনুষ্ঠানিক ইহুদি অবস্থান অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছিল। মেসায়াহ নিষ্কৃতি না আনা পর্যন্ত মন্দির নির্মাণ করা যাবে না; এটা ছিল শত বছরের পরিক্রমায় টাবুর শক্তি অর্জনকারী নিষেধাজ্ঞা।
অবশ্য ১৯৮০-র দশকের গোড়ার দিকে এর পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। লিভনি ও এতযিয়ন নিষ্কৃতির ভূমিকা হিসাবে মন্দির পুনর্নির্মাণে উৎসাহী একমাত্র ইহুদি চরমপন্থী ছিল না। পবিত্র স্থান ডোম অভ দ্য রক ‘দূষিত’ অবস্থায় কেমন করে সেখানে মেসায়াহ ফিরতে পারেন? অন্য মৌলবাদীদের মতো তাদের বিশ্বাস ছিল, সকল সতর্কতা উড়িয়ে তাদেরই পদক্ষেপ নিতে হবে ও মেসায়াহর জন্যে পথ তৈরি করার লক্ষ্যে টেম্পল মাউন্ট থেকে এই মুসলিম উপসনালয়টিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। তারা প্রথম পদক্ষেপ নিলে, ঈশ্বর নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাসের এই কর্মকে পুরস্কৃত করে ইতিহাসে হস্তক্ষেপ করবেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মেসায়াহকে প্রেরণ করে উদ্ধার করবেন ইসরায়েল জাতিকে। লিভনি ও এতযিয়ন ও তাদের সতীর্থ ষড়যন্ত্রকারীরা বিশ্বাস করত, ইসরায়েলি সরকার আরবদের হারাম আল-শরীফ, টেম্পল মাউন্টের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দিয়ে মহাপাপ করেছে। তাদের চোখে ডোম অভ দ্য রক ছিল এক ধরনের ‘অশ্লীলতা’ ও ‘আমাদের প্রজন্মের সকল আধ্যাত্মিক ভ্রান্তির মূল কারণ।৮৯
ইহুদি আন্ডারগ্রাউন্ডের অন্যতম প্রধান আদর্শিক নেতা ভদ্র, মৃদুভাষী কাব্বালিস্ট ইয়েগুয়া বেন শোশান বিশ্বাস করতেন ডোম অভ দ্য রক নিষ্কৃতিকে ব্যহতকারী তাঁর চোখে শয়তানি প্রভাবে অনুপ্রাণিত ‘অপরপক্ষের’ অশুভ শক্তির আবাস। তিনিই ক্যাম্প ডেভিড আলোচনার সময় লিভনি ও এতযিয়নের কাছে ‘অশ্লীলতা’ দূর করার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। ডোমের ধ্বংসের ভেতর দিয়ে তাদের শক্তি নষ্ট হবে, নিমেষে বন্ধ হয়ে যাবে অভিশপ্ত শান্তি প্রক্রিয়া। আর কিছু না হোক, এই নাটকীয় কাজটি বিশ্বব্যাপী ইহুদি জনগণকে ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিকভাবে সচেতন করে তুলবে ও শত্রুর সাথে এই সমন্বয়ের আলোচনা পরিত্যাগে বাধ্য করবে।
এক সংকট মুহূর্ত ছিল এটা। ডোম অভ দ্য রকের বোমা বর্ষণে শান্তি কেবল প্রক্রিয়ারই অবসান ঘটাত না, নিশ্চিতভাবেই প্রথম বারের মতো গোটা মুসলিম বিশ্বের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে মিলিত হওয়ার যুদ্ধের সূচনা ঘটাত। ওয়াশিংটনের কৌশলবিদগণ একমত প্রকাশ করেছেন যে, ঠাণ্ডাযুদ্ধের পটভূমিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরব ও ইসরায়েলের সমর্থক থাকায় ডোম অভ দ্য রকের ধ্বংস তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও সূচনা ঘটাতে পারত। পারমাণবিক বিপর্যয়ের অপচ্ছায়া অবশ্য এই কুকবাদীদের বিচলিত করেনি। তারা নিশ্চিত ছিল, এই পৃথিবীর বুকে প্রলয়ের সূচনা ঘটিয়ে ঐশী জগতে শক্তিকে সক্রিয় করে তুলে ঈশ্বরকে তাদের পক্ষে হস্তক্ষেপে ও ইসরারেয়লকে বাঁচাতে মেসায়াহকে পাঠাতে ‘বাধ্য’ করবে।৯১
কাব্বালিস্টিক ভাবনার উন্মত্ত রূপ এটা। কর্মতৎপরতার নীল নকশা হিসাবে মৌলবাদীদের মিথলজিকে ব্যবহারের ভীতিকর নজীর। বাস্তব ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনায় অযৌক্তিক কিছুই ছিল না। লিভনি আইডিএফ-এর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসাবে প্রশিক্ষণ লাভ করেছিল। দুবছর ধরে হারাম আল- শরীফকে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়াশোনা এবং গোলান মালভূমির সামরিক শিবির থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক সংগ্রহ করেছিল। আটাশটি নিখুঁত বোমা বানিয়েছিল সে যেগুলো দিয়ে ডোম ধ্বংস হলেও আশপাশের এলাকার কোনও ক্ষতি হত না। আক্রমণের জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল ওরা। কেবল কাজের অনুমোদন দেওয়ার মতো একজন র্যাবাই না পাওয়ায় আটকে ছিল।
