এরেত্য ইসরায়েলে আরবদের ব্যাপারে কী করা যেতে পারে সে সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব ছিল গাশ সদস্যদের। সকলেই একমত ছিল যে, প্যালেস্তাইনিদের এই দেশের উপর কোনও অধিকার নেই, এখানে ওদের জন্যে শান্তিও নিই। ঘৃণা ও বর্জনের এই ধর্মতত্ত্ব অবশ্যই ইহুদি ধর্মবিশ্বাসের বিকৃতি। ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ, তোরাহ ও তালমুদের রাব্বিনিক সাধুগণ সকলেই এমনকি যে তাদের জাতির অংশ নয়, কিন্তু তাদের দেশে বাসকারী ‘আগন্তুকের’ প্রতিও ন্যায় বিচার ও প্রেমময় দয়ার উপর জোর দিয়েছেন।৮১ জেসাসের প্রবীন সমসাময়িক র্যাবাই হিল্লেল স্বর্ণবিধিতে ইহুদিবাদের শিক্ষার সারমর্ম টেনেছেন: ‘তোমার নিজের প্রতি যে আচরণ আশা করো না, অন্যের সাথেও সেই আচরণ করো না।৮২ তবে মৌলবাদী নৈর্বাচনিকতা নিয়ে কুকবাদীরা কেবল আরও আক্রমণাত্মক বাইবেলিয় অনুচ্ছেদের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছে, যেখানে ঈশ্বর ইসরায়েলিদের প্রতি প্রতিশ্রুত ভূমি থেকে স্থানীয় অধিবাসীদের বিতাড়িত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদের সাথে কোনও চুক্তি না করতে বলেছেন ও এমনকি তাদের নিশ্চিহ্ন করতে বলেছেন।৩ ইহুদিরা ঈশ্বরের মনোনীত জাতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বোঝাতে চেয়েছে অন্য জাতির পক্ষে অবশ্য পালনীয় আইন কানুনের অধীন নয় তারা, বরং তারা অনন্য, পবিত্র, এবং ভিন্ন। ভূমি দখলের ঈশ্বরের নির্দেশনা, যুক্তি দেখিয়েছেন শ্লোমো আভিনার, আমাদের দেশের জেন্টাইলদের মানবিক ও জাতীয় অধিকার বিবেচনার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ।১৮৪
অধিকাংশ কুকবাদী বিশ্বাস করত যে, আরবদের এরেত্য ইসরায়েলে থাকবার অনুমতি দেওয়া উচিত, তবে কেবল গেরিন তোশাভিম (‘অধিবাসী বিদেশী’) হিসাবে। যতক্ষণ ইসরায়েল রাষ্ট্রকে মানছে, তাদের সাথে অবশ্যই শোভন আচরণ করতে হবে, কিন্তু কোনওদিনই নাগরিকত্ব বা রাজনৈতিক অধিকার পাবে না তারা। অন্যরা প্যালেস্তাইনিদের এই অধিকারটুকুও দিতে রাজি ছিল না, তাদের অভিবাসী হতে চাপ দিয়েছে। একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠী আমেলাকাইটদের নজীর টেনে নিশ্চিহ্নকরণের প্রস্তাব দিয়েছিল-এমনই নিষ্ঠুর জাতি যে ইসরায়লিদের তাদের করুণাহীনভাবে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ঈশ্বর।৮৫ ১৯৮০ সালে র্যাবাই ইসরায়েল হেস বার-ইলান ইউনির্ভার্সিটির সরকারী ম্যাগাজিনে ‘জেনোসাইড: আ কামান্ডমেন্ট অভ দ্য তোরাহ’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। এখানে তিনি যুক্তি দেখান, আলোর কাছে যেমন অন্ধকার প্যালেস্তাইনিরা ইসরায়েলিদের কাছে তাই, তারা আমেলাকাইটদের মতো একই নিয়তি ভোগ করার যোগ্য।৮৬ একই বছর, গাশ বসতি স্থাপনকারী হাইম তযুরিয়া লেখেন যে, ঘৃণা ‘স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর’:
প্রতি প্রজন্মে আমরা আমাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্যে রুখে দাঁড়ানোদের পেয়েছি। সুতরাং, প্রত্যেক প্রজন্মেরই আমালেক রয়েছে। আমাদের প্রজন্মের আমেলাকিজম নিজেকে আমাদের পূর্ব পুরুষের ভূমিতে আমাদের জাতীয় রেনেসাঁর প্রতি আরবদের ঘৃণায় গভীরভাবে প্রকাশিত।৮৭
১৯৮০ সালের ৩রা মে হেব্রনে ছয়জন ইয়েশিভা ছাত্র খুন হয়। এতে চরমপন্থী কিছু কুকবাদী প্রতিশোধ নিতে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে। কিরিয়াত আরবার এক বসতিকারী মেনাচেম লিভনি ও প্রবীন গাশ বসতিস্থাপনকারী ইয়েহুদা এতযিয়ন পাঁচজন আরব মেয়রের গাড়িতে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাদের পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে বোমা পুঁতে রাখে, যাতে তারা ইহুদি বিরোধী সন্ত্রাসের পরিণতির স্মারক হয়ে থাকেন। এই খবর শোনার পর আনন্দে ফেটে পড়েছিলেন র্যাবাই হাইম দ্রুকমান: ‘এভাবেই যেন ইসরায়েলের শত্রুরা ধ্বংস হয়!৮৮ অবশ্য বেশির ভাগ ইসরায়েলি এই আক্রমণের ফলে ভীতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল, শেষ পর্যন্ত এই ঘটনায় লক্ষ্যবস্তুর মাত্র দুজন মেয়র আহত হন। লিভনি ও এতযিয়নের পক্ষে এই সন্ত্রাসী তৎপরতা সাইডলাইন মাত্র শুনে আরও বেশি বিতৃষ্ণা বোধ করেছে তারা। ১৯৮৪ সালের এপ্রিল মাসে সরকার ইসরায়েলে ইসলামি বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান ডোম অভ দ্য রক উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকারী ইহুদি আন্ডারগ্রাউন্ড দলের অস্তিত্বের খবর প্রকাশ করে।
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় আইডিএফ জর্দান থেকে পূর্ব জেরুজালেম ও পুরোনো শহর জয় ও অধিকার করে নেয়। যুদ্ধের অল্পদিন পরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আপত্তি উপেক্ষা করে ইসরায়েল এই এলাকাগুলো অধিগ্রহণ ও জেরুজালেমকে ইহুদি রাষ্ট্রের চিরন্তন রাজধানী ঘোষণা করে। বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল এটা, কেননা ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ জেরুজালেম আন্তর্জাতিক এলাকা হবে বলে ঘোষণা করেছিল; ছয় দিনের যুদ্ধের পর বৈরিতার সময় দখল করা জেরুজালেমসহ বিভিন্ন অঞ্চল ইসলায়েলকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি করেছিল। ৬৩৮ সাল থেকে সংক্ষিপ্ত ক্রুসেডার শাসনের সময়টুকু ছাড়া (১০৯৯-১১৮৭) জেরুজালেম ছিল মুসলিম শহর; জেরুজালেম, মুসলিমরা যাকে আল-কুদস (‘পবিত্র’) বলে, মক্কা-মদিনার পর ইসলামি বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। ৬৯১ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া ডোম অভ দ্য রক ছিল প্রধান মুসলিম নির্মিত সৌধ, একে আব্রাহামের ছেলেকে উৎসর্গ করার স্থান হিসাবে বিশ্বাস করা হয়; পরবর্তীকালের ট্র্যাডিশন উল্লেখ করেছে যে পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) এই রক থেকেই স্বর্গে অতীন্দ্রিয় যাত্রা শুরু করেছিলেন। এই স্থানটি ইহুদি বিশ্বের কাছেও গভীরভাবে পবিত্র, কারণ টেম্পেল মাউন্টের উপর এই ডোম নির্মিত হয়েছে, রাজা সলোমন নির্মিত মন্দিরের স্থান হিসাবে বিশ্বাস করা হয় একে।
