ইসরায়েলি জনগণকে বিস্মিত করে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ধর্মীয় দলগুলো রেকর্ড সংখ্যক আঠারটি আসনে বিজয়ী হয়। ফলাফলে দেখা যায় শ্রমিক ও লিকুদ পার্টির ভেতর ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের হাতে রয়েছে। এর আগ পর্যন্ত যারা অর্থডক্সদের ঘৃণা ও তাদের অর্থহীন পশ্চাদপদতা হিসাবে বিবেচনা করে এসেছিল তারাই এবার সরকার গঠনে সাহায্য করার জন্যে তাদের সাথে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানাতে উপঢৌকনসহ হাজির হয়েছিল। হাসিদিম এত গভীরভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরোধী ছিল যে তারা তখনও সেক্যুলার ইহুদিরা ধর্মকে ধ্বংস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে বিশ্বাস করছিল। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তারা প্রয়োজনীয় অশুভ, আত্মরক্ষার প্রয়াস হিসাবে বিবেচনা করেছে। একে ‘শত্রু-শিবিরে অনুপ্রবেশ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে,’ ১৯৯১ সালে লিথুয়ানিয় পত্রিকা ইয়েতেদ নিমানে লিখেছেন র্যাবাই নাথান গ্রসমান। কিন্তু, প্রায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে ভেবেছিল তারই সরকারে ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে হেরেদিম। হলোকাস্টের পর থেকে হেরেদিম হারানো ইউরোপিয় ইহুদি সম্প্রদায়কে ফের গড়ে তোলার সংগ্রাম করে আসছিল। পূর্ব ইউরোপের পুরোনো জীবনকে স্বর্ণযুগ মনে করত তারা, অতীতের মহান র্যাবাইদের মাঝে অনুপ্রেরণার সন্ধান করেছে। কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শেষ নাগাদ নিজেদের অতিক্রম করে গিয়েছিল তারা। ৭০সিই-তে মন্দির ধ্বংসের পর র্যাবাই শ্যাচের মতো আর কোনও ধার্মিক ইহুদিই এতখানি ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেননি। ১৯৮৮ সাল নাগাদ দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি ও তাঁর সিদ্ধান্তমূলক ভোটের জন্যে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্রয় লাভ করেছেন।৭৫
২৬শে মার্চ, ১৯৯০ নাটকীয়ভাবে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তেল আভিভের ইয়াদ এলিয়াহু বাস্কেটবল স্টেডিয়াম ইসরায়েলের সেক্যুলার সংস্কৃতির প্রতীকী মন্দির। ইসরায়েলে বাস্কেট বল বলতে গেলে জাতীয় ধর্মের মতোই। এই খেলাটি যায়নবাদীদের নব্য ইহুদি স্বপ্ন তুলে ধরে, এখন আর ঘোলাটে ইয়েশিভা তোরাহর স্তূপের উপর বিষণ্ণ চেহারায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে না সে, অর্থডক্সির কালো জোব্বায় আবৃত নয়, বরং কাজের জন্যে উন্মুক্ত, তামাটে, উপযুক্ত, স্বাস্থ্যবান এবং গোয়িমদের সাথে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় সক্ষম এবং তাদেরই খেলায় তাদের পরাস্ত করার ক্ষমতা রাখে। ১৯৯০ সালের মার্চের সেই সন্ধ্যায় স্টেডিয়াম ম্যাকাবীদের (জাতীয় বাস্কেটবল দল) সমর্থকে নয়, বরং দশ হাজার দাড়িঅলা কাফতান পরা হেরেদিম সমর্থকে পরিপূর্ণ ছিল। আল্ট্রা-অর্থডক্সরা সেক্যুলার ইসরায়েলের আঁতে ঘা দিয়েছে, অন্তত ওই সন্ধ্যায় এর একটি প্রধান দুর্গ অধিকার করে নিয়েছিল। তাছাড়া, ঘটনাটি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়, সারা দেশে রুদ্ধশ্বাসে ধার্মিক ও সেক্যুলার ইসরায়েলিরা দেখেছে। উপলক্ষ্য? র্যাবাই শ্যাচ তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন ও আগামী নির্বাচনে কীভাবে ভোট দিতে হবে সে সংক্রান্ত নির্দেশনা দেবেন। ক্ষমতার ভারসাম্য সেক্যুলার শ্রোতাদের পক্ষে প্রায় দুর্বোধ্য এক অদ্ভুত হিব্রু, আরামাইক ও ইদ্দিশ মেশানো ভাষায় কথা বলা টপহ্যাট আর বাবড়ি চুলধারী র্যাবাইয়ের হাতে থাকার ব্যাপারে জাতি সজাগ হয়ে উঠেছিল। সেদিন সন্ধ্যায় র্যাবাই শ্যাচের শ্রমিক ও লিকুদ পার্টির ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।
ইসরায়েল ও প্যালেস্তাইনের ভেতর শান্তি প্রক্রিয়া কষ্টকর গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল, কিন্তু জাতীয় কোয়ালিশন সরকারে তা ভাঙন ধরিয়েছিল। শ্রমিক ও লিকুদ পার্টি ছোট ছোট দলগুলোর সাথে মৈত্রী স্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছিল, ধর্মীয় দলগুলোই এককভাবে বৃহত্তর গোষ্ঠী ছিল। শ্রমিক দল আগুদাত ও শাসের সাথে অনানুষ্ঠানিক চুক্তি করে, কিন্তু শাসের অন্যতম নেতা র্যাবাই ইয়োসেফ শ্রমিক মৈত্রী দলের ভাঙন ধরাবে ভেবে ভয় পাচ্ছিলেন। সেফারদিকরা অতিজাতীয়তাবাদ প্রবণ, আরবদের ঘৃণা করে, শ্রমিক দলের পরিকল্পিত আঞ্চলিক ছাড়ের প্রবল বিরোধী ছিল তারা। শাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা র্যাবাই শ্যাচ উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি শাস ও দেগেল হা-তোরাহয় তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন ও আসন্ন কোয়ালিশন আলোচনার কথা জানাবেন তাদের।
র্যাবাইর দশ মিনিটের ভাষণ বিস্ময়কর ছিল না, তবে টেলিভিশন সেটের সামনে বসে শোনা ইসরায়েলিদের কাছে অস্পষ্টভাবে অস্বস্তিকর ছিল। সরাসরি কোয়ালিশন আলোচনার কথা উল্লেখ করেননি তিনি, বাকি জাতিকে আচ্ছন্ন করে রাখা কোনও ইস্যু ওঠাননি। স্পষ্টতই প্যালেস্তইনিদের অধিকার, জাতীয় প্রতিরক্ষা বা শান্তির লক্ষ্যে ভূমি বিনিময়ের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ছিলেন তিনি। ইসরায়েল রাষ্ট্র সম্পর্কে একটাও ভালো কথা বলেননি। ইহুদি রাষ্ট্রকে ত্রাতা হিসাবে দেখার বদলে হেরেদিম এখন কি ‘ভয়ঙ্কর ও ভয়াবহ’ সময় কাটাচ্ছে বিষণ্ণভাবে তার উল্লেখ করেছেন। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ নয়, র্যাবাইয়ের উদ্বেগের বিষয় ছিল ধর্মের বিরুদ্ধে যায়নবাদীদের সূচিত যুদ্ধ। ‘আমরা আজ যে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছি [ঐতিহ্যের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে], সেটা আজ শুরু হয়নি, সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই এর সূচনা, কেবল মহাবিশ্বের প্রভু জানেন কী আশা করা যেতে পারে,’ প্রবল আবেগের সাথে বলেছেন র্যাবাই। কিন্তু পরিণতি নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ ছিল না: ‘ইহুদিকে ধ্বংস করা যাবে না। তাকে হত্যা করা যেতে পারে, কিন্তু তার সন্তান তোরাহর প্রতি অনুগত থেকে যাবে।’
