১৯৭০-র দশকের ধর্মীয় পুনর্জাগরণ পরিপক্কতা লাভ করেছে। মূলধারার অনেকেই, সব বয়স ও সব শ্রেণীর মিশরিয়রা এর অন্তর্ভুক্ত, এখন মৌলবাদের এক ধরনের মডারেট রূপ গ্রহণ করেছে। বেশির ভাগই রাজনীতিতে আগ্রহী নয়, তবে ধর্মের প্রতি আগ্রহের কারণে সামাজিক বা অর্থনৈতিক সংকটের কালে ইসলামি নেতাদের পক্ষে তাদের সংগঠিত করা অনেক সহজ। তরুণদের অনেকেই অবশ্য এখনও মনে করে যে, আধুনিক মিশরিয় সমাজ তাদের স্বার্থের কথা অন্তর দিয়ে ভাবে না। বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও গণিতের ছাত্ররা এখন অধিকতর চরমপন্থী গ্রুপের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তারা দেখছে কঠোর ইসলামি জীবন ধারা সেক্যুলারিস্ট পছন্দের চেয়ে একটা গ্রহণযোগ্য বিকল্পের যোগান দিচ্ছে, গ্রাম্য সংস্কৃতি থেকে আধুনিক শহুরে সংস্কৃতিতে কষ্টকর অভিযাত্রায় সাহায্য করছে এবং এক ধরনের খাঁটিত্ব ও অংশগ্রহণের বোধ দিচ্ছে।৬৪ এটা তাদের আধুনিক সমাজে অর্জন করা খুবই কঠিন অথচ মানবীয় চাহিদার পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা গোষ্ঠীরও যোগান দিচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা পেছনে ঘোরানোর কোনও চেষ্টা করছে না তারা, বরং বর্তমান অবস্থায় শত শত বছর ধরে মুসলিমদের কাজে আসা ইসলামি প্যারাডাইম প্রয়োগের নতুন পথের সন্ধান করছে।
সাদাতের হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে ভীতিকরভাবে বিস্ফোরিত গভীর অসন্তোষ আজও হুসনি মুবারকের দুই দশকের সীমিত উদারীকরণ ও গণতন্ত্রের আংশিক বাস্তবায়নের পরও তলে তলে ধিকিধিকি জ্বলছে। পার্থক্য হচ্ছে, ইসলামিস্টরা এখন অনেক বেশি সংগঠিত। আমেরিকান আরব বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক গাফনি ১৯৯১ সালে আবার মিনিয়া সফর করেছিলেন। তিনি লক্ষ করেছেন, মূল সড়কের পাশের ক্ষুদে মৌলবাদী মসজিদে শুক্রবারে নামাজের উদ্দেশ্যে সমবেত জনতা ১৯৭০-র দশকের তুলনায় এখন ঢের বেশি শৃঙ্খলাপরায়ণ। সেই পুরোনো জরাজীর্ণ ভাব ও উচ্ছৃঙ্খল ঔদ্ধত্য বিদায় নিয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেরই বয়স ছিল তিরিশ থেকে চল্লিশের কোঠায়; তারা সর্বজনীন জালাবিয়াহ পোশাক পরেছে, সঠিক ইসলামি টুপি মাথায় দিয়েছে। দেখে মনে হয়েছে নিজস্ব দিক ও পরিচয়সহ একটি ভিন্ন ও সুনির্দিষ্ট উপসংস্কৃতি গড়ে তুলতে যাচ্ছে তারা। গাফনি আরও লক্ষ করেছেন যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যালয়ের অবস্থান বিশাল নতুন সরকারী ভবন রাষ্ট্রের প্রবল প্রতাপ ফুটিয়ে তোলার কথা বুঝিয়েছে। সাবেক ঝামেলার জায়গায় নিয়ন্ত্রণের প্রতীক, এর সাথে কায়রোর চেয়ে বরং মক্কামুখী নিবেদিত প্রাণ ইসলামপন্থীদের কোনও সম্পর্ক নেই বলে মনে হয়েছে।৬৫ মিশরে উপশমের কোনও লক্ষণ ছাড়াই এক সিযোফ্রেনিক দূরত্বে পাশাপাশি দুটি বলয় অবস্থান করেছে।
এটা বিস্ময়কর নয় যে, ‘দুই জাতির’ ভেতর যুদ্ধ চলছে। সাময়িক ভিত্তিতে পুলিস ও অতি চরমপন্থী মুসলিম গ্রুপগুলোর ভেতর গুলি বিনিময়ের খবর পাওয়া যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলামপন্থীরা যেখানে সেক্যুলার সমাজ থেকে মৌলবাদী বিচ্ছিন্নতায় সন্তুষ্ট, একটি সংখ্যালঘু অংশ সেখানে ত্রাসের আশ্রয় নিচ্ছে। ১৯৮৬ সাল থেকে আমেরিকান, ইসরায়েলি ও বিশিষ্ট মিশরিয়দের উপর রাজনৈতিক উদ্দশ্যে প্রণোদিত আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। ১৯৮৭ সালে ইসলামপন্থীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক মন্ত্রী হাসান আবু বাওহা ও সাপ্তাহিক পত্রিকা আল- মুসাওয়ারের সম্পাদক নবাবি আহমেদকে গুলি করে। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে তারা মিশরিয় পার্লামেন্টের স্পিকার রিফাত মাহজুবকে হত্যা এবং ১৯৯২ সালে কট্টর সেক্যুলারিস্ট ফারাজ ফোদাকে গুলি করে হত্যা করে। সেই বছরই প্রথম বারের মতো ইউরোপিয় ও আমেরিকান পর্যটকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে।৬৬ অর্থনীতির ক্ষেত্রে পর্যটন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় হামলা ও নির্বিচার, আনাড়ী গণগ্রেপ্তারের পথ ধরেন মুবারক, ফলে আগুনে যেন ঘি ঢালা হয়। ১৯৯৭ সাল নাগাদ মানবাধিকার গ্রুপগুলো ২০,০০০ সন্দেহভাজন গেরিলাকে বিনা বিচারে মিশরিয় কারাগারে বন্দি রাখার দবি তোলে, অনেককে আবারও-কেবল নিরীহ প্যামফ্ল্যাট রাখা বা কোনও সভায় যোগদানের ঠুনকো অপরাধে আটক করা হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ১৭ই নভেম্বর সন্ত্রাসী দল জামাত আল ইসলামিয়াহ লক্সরে ‘এই হামলাই শেষ হামলা নয়, কারণ সরকার যতদিন নিপীড়ন অব্যাহত রাখবে ও ইসলামি আন্দোলনের সন্তানদের হত্যা করে চলবে ততদিন মুজাহিদিনরা কাজ চালিয়ে যাবে’৬৭ বলে আটান্ন জন বিদেশী পর্যটক ও মিশরিয়কে হত্যা করে। যুদ্ধ চলছে। মরিয়া ভাব ও অসহয়ত্ব সুন্নি মুসলিমদের সংখ্যালঘু অংশকে হত্যার ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে ইসলামকে এমন এক মতাদর্শে পরিণত করতে অনুপ্রাণিত করে চলেছে যা ধর্মের সামগ্রিক বিকৃতি।
*
মিশরের মতো ইসরায়েলও আরও বেশি করে ধর্মীয় দেশে পরিণত হতে চলেছিল। ১৯৮০-র দশকে হেরেদিমের রাজনৈতিক উত্থানের মতো আর কোথাওই তা এতখানি প্রকট ছিল না। আল্ট্রা-অর্থডক্স ইহুদিদের একটি সংখ্যালঘু অংশ ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সহজাতভাবে অশুভ ভেবে এসেছে, ‘এমন দূষণ যা সকল দূষণকে আবৃত করে, এক সামগ্রিক ধর্মদ্রোহীতা যা অন্যসব ধর্মদ্রোহীকে অন্তর্ভুক্ত করে।’ ‘এর একেবারে মূলে যায়নবাদ আমাদের ধর্মের আবিশ্যিক বিষয়গুলোকে অস্বীকার করে,’ ১৯৭৫ সালে নেচারেই কারতার নিউজ লেটারে লিখেছেন ইয়েরামিয়ে দোম্ব। ‘এ এক পরম অস্বীকৃতি যা খুব গভীরে, একেবারে ভিত্তিতে, শেকড়ে গিয়ে পৌঁছেছে।’৬৯ তবে অধিকাংশ হেরেদিম এতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়নি। তারা স্রেফ রাষ্ট্রটিকে ধর্মীয় তাৎপর্যবিহীন মনে করেছে ও একে দারুণ নিস্পৃহতার সাথে দেখেছে। এই নিরপেক্ষতা তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে সক্ষম করে তুলেছিল। হাসিদিম এমনকি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রের সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানে আটকা পড়া স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গের নিষ্কৃতি লাভ হিসাবে ধর্মীয় আলোকেও দেখতে পেরেছে। শুয়োরের মাংস নিষিদ্ধকরণ বা আরও কঠোর সাব্বাথ পালন উৎসাহিত করণের মতো বিধান জারির লক্ষ্যে চাপ প্রয়োগ করে তারা ইসরায়েলকে মেসিয়ানিক পরিবর্তনের পথে আরও উপযুক্ত করে তুলতে পারবে। লিথুয়ানিয় মিসনাগদিমের আরও বাস্তব সম্মত প্রবণতা ছিল। নিজেদের আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে গভীরভাবে ইয়েশিভা বিশ্বে আবদ্ধ করেছিল তারা এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছে। রাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, অভ্যন্তরীণ বা বিদেশ নীতির প্রশ্নে তারা সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ছিল। কোনও একটি দলের পরিবর্তে অন্য কোনও দলকে সমর্থনের ক্ষেত্রে তাদের একমাত্র বিবেচনার বিষয় ছিল ইয়েশিভোতের জন্যে এর দেওয়া তহবিলের পরিমাণ ও রাজনৈতিক সমর্থন দানের ইচ্ছা।৭০
