আরও বহু মৌলবাদীর মতো অক্ষরবাদী ছিলেন ফারাজ। তিনি এমনভাবে ঐশীগ্রন্থ পাঠ করেছেন যেন তার প্রতিটি ক্ষেত্রে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি, এবং তাকে প্রতিদিনের জীবনে সহজে প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োগ করা যাবে। এটা ঐশীগ্রন্থের মিথোসকে বাস্তব কর্মতৎপরতার নীলনকশা হিসাবে ব্যবহার করার আরেক বিপদ তুলে ধরে। প্রাচীন আদর্শ ছিল মিথোস ও লোগোসকে আলাদা রাখা: রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল যুক্তির এখতিয়ার। বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গিয়ে এই সুন্নি মৌলবাদীরা যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে তিক্ত সত্য জানতে পেরেছিল এমনকি সাদাতের ঘাতকরা তাদের বিশ্বাস মতে আল্লাহ’র আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেও আল্লাহ হস্তক্ষেপ করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি। সাদাতের মৃত্যুর পর কোনও রকম ঝামেলা ছাড়াই প্রেসিডেন্ট হন হোসনি মোবারক, আর সেক্যুলারিস্ট সরকারই এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় বহাল আছে।
দ্য নেগলেক্টেড ডিউটি-র চিন্তাভাবনা চরমপন্থীদের ছোট একটি দলের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না বলেই মনে হয়, বরং পর্যবেক্ষকদের ধারণার চেয়ে ব্যাপকহারে সেই সময় মিশরিয় সমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল ৫৯ অল্প সংখ্যক মিশরিয়ই সত্যিকার অর্থে সাদাতের হত্যা চেয়েছিল, বেশির ভাগই হত্যাকাণ্ডে দুঃখ পেয়েছে, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাদের অটল ভাব ছিল রীতিমতো লক্ষণীয় ও হিমশীতল। উদাহরণ স্বরূপ, আল-আযহারের শায়খগণ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করলেও সাদাতের বিদায়ে তাঁদের শোকাহত মনে হয়নি। হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরপর প্রকাশিত আযহারিয় পত্রিকায় সাদাতের কোনও ছবি ছিল না, হত্যার কথা দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় তীর্যকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। দ্য নেগলেক্টেড ডিউটি-র বিরুদ্ধে জোরালভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাঁড়ানো একমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্য হচ্ছেন মুফতি, ফারাজের নিবন্ধের বিস্তারিত উত্তর দিয়েছেন তিনি। তিনি ঘোষণা দেন যে, অন্য একজন আচার পালনকারী মুসলিমকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করা নিষিদ্ধ। তাকফিরের (সমাজচ্যুতি) চর্চা কখনওই ইসলামে প্রচলিত ছিল না, কারণ কেবল আল্লাহ’র পক্ষেই কারও অন্তরের খবর রাখা সম্ভব। তিনি তরবারীর পঙক্তিসমূহকে সেগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা করেছেন, সপ্তম শতাব্দীর মদিনার বিশেষ পরিবেশের প্রতি সাড়া হিসাবে সেগুলোর উদ্ভব হয়েছে বলে দেখিয়েছেন। মিশরের বিংশ শতাব্দীর পরিস্থিতিতে অক্ষরে অক্ষরে সেগুলোকে প্রয়োগ করা যাবে না। তারপরও ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে প্রধান সুফি সাময়িকী জার্নাল অভ ইসলামিক মিস্টিসিজম-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে মুফতি এটা নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিলেন যে, তাঁর পাঠকরা ফারাজের শিক্ষার সাথে পরিচিত থাকবেন, যদিও দ্য নেগলেক্টেড ডিউটি কেবল প্রকাশিত হয়েছিল, সবার পক্ষে তা পড়া সম্ভব ছিল না। এইসব ভাবনা সম্ভবত ভক্ত বলয়ে প্রচারিত হয়ে সাধারণ বুলিতে পরিণত হয়েছিল। মিশরিয়দের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হত্যাকাণ্ডকে মহাপাপ মনে করলেও অনেকেই সাদাতের বেলায় নিরাসক্ত বোধ করেছে। নাসেরের মৃত্যুর পর অবস্থা অনেক বদলে গিয়েছিল। মিশরিয়রা এখন তাদের নেতাদের মাঝে সত্যিকারের ইসলামি গুণের দেখা পেতে চাচ্ছিল, সেক্যুলারিস্ট রীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল তারা।
মুবারককে দেশের ধর্মীয় ঝোঁক উপলব্ধি করতে হয়েছিল। তিনি অবিলম্বে ১৯৮১ সালে সাদাতের ক্র্যাকডাউনের সময় আটক সকল বন্দিকে ছেড়ে দেন। ইসলামি আন্দোলনসমূহকে নিয়ন্ত্রণের জোর চেষ্টা করে গেছেন তিনি, কিন্তু কেবল নির্দিষ্ট গ্রুপকে টার্গেট করেছেন। মুসলিম ব্রাদারহুডকে (সরকারীভাবে তখনও স্বীকৃতি পায়নি) দলীয় নির্বাচনে অংশ নিতে এবং সরকারে নিজেদের পক্ষে একটা অবস্থান সৃষ্টি করার অনুমতি দিয়েছেন। সোসায়েটির নতুন রাজনৈতিক সংগঠন দ্য ইসলামিক অ্যালায়েন্স যত্নের সাথে চরমপন্থীদের সাথে দূরত্ব তৈরি করে, মিশেরের কপ্টিক ক্রিশ্চানদের সাথে সম্পর্কন্নোয়ন এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কাজ করার প্রয়াস পায়। মিশর এখন খুবই ধর্মীয় রাষ্ট্র। বর্তমানে ১৯৬০-র দশকের নাসেরবাদের মতোই ইসলাম প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ব্রাদারস-এর শ্লোগান ‘ইসলামই সমাধান’ ক্রমবর্ধমান সংখ্যাক মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টি করছে বলে মনে হয়।৬১ ব্যক্তিগত ধার্মিকতা সংক্রান্ত প্রশ্নাবলী এখন ম্যাগাজিন ও সাময়িকীর চিঠিপত্রের পাতায় প্রাধান্য বিস্তার করছে, প্রচার মাধ্যমে ইসলামি ইস্যু নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মীয় পোশাক এখন সর্বত্র, নারী-পুরুষ ক্লাসরুমে নিয়মিতভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে, সাধারণ জীবনে প্রার্থনার নির্দিষ্ট স্থান এখন সাধারণ ব্যাপার।৬২ মিশরকে পূর্ণ ইসলামি আইনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ও ইসলামকে সংবিধানের ভিত্তি করে তোলার ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা এখনও রয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনে ধর্মীয় প্রার্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। মিশর মোটামুটি বহুদলীয়, গণতান্ত্রিক দেশ, কিন্তু দুর্নীতি এখনও ব্যাপক বিস্তৃত, নির্বাহী স্বৈরাচারী এবং রাষ্ট্রীয় দল কেবল শাসক দল হিসাবে থাকতে রাজি নয়। সন্দেহ আছে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণ অধিকতর ধার্মিক নেতাদের পক্ষে ভোট দেবে। এর ফলে ইসলাম মুবারকের সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
