অংশীবাদীদের যেখানে পাবে বধ করবে। তাদেরকে বন্দি করবে, অবরোধ করবে ও তাদের জন্যে প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওত পেতে থাকবে।৪৭
ফারাজের বিশ্বাস ছিল, তরবারির এই পঙক্তি মুহাম্মদের (স) কাছে মুসলিমদের প্রতি শত্রুর সাথে শান্তি স্থাপন ও সৌজন্যের সাথে আচরণের নির্দেশ দানের পঙক্তি অবতীর্ণ হওয়ার অনেক পরে অবতীর্ণ হয়েছিল। সুতরাং, এগুলো যেসব আয়াতে কোরানকে সহিংতা বিরোধী মনে হয় সেগুলোকে রদ করে দিয়েছে।৪৮
কিন্তু ফারাজের একটা সমস্যা ছিল। কোরান কেবল মূর্তিপূজকদের লক্ষ্য করেছে (‘যারা আল্লাহ’র পাশে তুচ্ছ বস্তুতে ঐশ্বরিকতা আরোপ করে’), কিন্তু সাদাত নিজেকে মুসলিম দাবি করে বলেছেন, তিনি পাঁচটি ‘স্তম্ভ’ পালন করেন। মুসলিমরা কীভাবে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে? ফারাজ ইবন তাঈমিয়াহর ফতওয়ায় এর জবাব খুঁজে পেয়েছেন, যিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, চতুর্দশ শতাব্দীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী মঙ্গোল শাসকগণ আসলে ধর্মদ্রোহী ছিলেন, কারণ তাঁরা শরীয়াহর বদলে নিজেদের বিধান মোতাবেক শাসন করেছেন। * মিশরের বর্তমান শাসক, ঘোষণা করেছেন ফারাজ, মঙ্গোলদের চেয়েও খারাপ। মঙ্গোল বিধানে অন্ততপক্ষে কিছু পরিমাণ ক্রিশ্চান ও ইহুদি আইনের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু মিশরের আইনি ব্যবস্থা আজ ‘অবিশ্বাসের আইনের’ উপর ভিত্তি করে রচিত, বিধর্মীরা এর সৃষ্টি করেছে, উপনিবেশবাদীদের মাধ্যমে মুসলিমদের উপর আরোপ করা হয়েছে।৫°
বর্তমান যুগের শাসকগণ ইসলাম হতে বিচ্ছিন্ন। সাম্রাজ্যবাদের টেবিলে বেড়ে উঠেছে এরা, সেটা ক্রুসেডারিজমই হোক বা কমিউনিজম অথবা যায়নবাদ। নাম ছাড়া তারা ইসলামের কোনও কিছুই ধারণ করে না, যদিও তারা প্রার্থনা করে ও উপবাস পালন করে ও নিজেদের মুসলিম দাবি করে।৫১
১৯৮০ সালে যেসব ছাত্র সালাদিন মসজিদ দখল করেছিল, তারাও সাদাতকে মঙ্গোল শাসকদের সাথে তুলনা করেছিল। ফারাজের ধারণাসমূহ চরমপন্থীদের একটা ছোট গ্রুপের মাঝে সীমিত ছিল বলে মনে হয় না। ১৯৮০-র দশক নাগাদ তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে থাকে।
ফারাজ স্বীকার করেছেন যে, ইসলামি আইনে জিহাদ সমবেত দায়িত্ব হিসাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। পবিত্র যুদ্ধ শুরু করা কোনও ব্যক্তি বিশেষের কাজ নয়, বরং তা এমন এক সিদ্ধান্ত যা কেবল সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবেই গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু, জোর দিয়ে বলেছেন ফারাজ, উম্মাহ বাইরের শক্তির হাতে আক্রান্ত হলেই কেবল এই আইন প্রযোজ্য হতে পারে। আজকের দিনের পরিস্থিতি ঢের বেশি খারাপ, কারণ বিধর্মীরা আসলে মিশর দখল করে নিয়েছে। সুতরাং, যুদ্ধ করার যোগ্যতা রাখে এমন প্রতিটি মুসলিমের পক্ষেই জিহাদ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে ইসলামের গোটা জটিল ঐতিহ্য একটা মাত্র বিন্দুতে সংকীর্ণ হয়ে গেছে: সাদাতের মিশরে ভালো মুসলিম হওয়ার একমাত্র উপায় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংস যুদ্ধে অংশগ্রহণ।
তরুণ শিষ্যদের অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়া প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ফারাজ। গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা করলেও জিহাদের সদস্যরা যতদূর সম্ভব নৈতিক আচরণ করার প্রয়াস পাচ্ছিল। পরিকল্পনা গোপন রাখার স্বার্থে কী মিথ্যা বলা গ্রহণযোগ্য হবে? অপরাধী শাসকদের হত্যার সাথে সাথে নিরীহ দর্শকদের হত্যার বেলায় কী হবে? মিশরে, পারিবারিক কর্তৃত্ব যেখানে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ, তরুণতর সদস্যরা জানতে চাইছিল, বাবা-মার অনুমতি ছাড়াই এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে?৫৩ ইসরায়েলের হাত থেকে জেরুজালেম মুক্ত করার আগে সাদাতের বিরুদ্ধে জিহাদে নামার প্রশ্নে নিশ্চিতভাবেই উদ্বেগ ছিল: কোনটা প্রাধান্য পাবে? ফারাজ উত্তর দিয়েছেন, জেরুজালেমের জন্যে জিহাদ কেবল একজন নিবেদিত প্রাণ মুসলিম নেতার নেতৃত্বেই হতে পারে, বিধর্মীর হাতে নয়। তিনি আল্লাহ’র প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে মারাত্মক আস্থাও প্রকাশ করেছেন। একবার সত্যিকারের ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে, জেরুজালেম আপনাআপনিই মুসলিম শাসনে ফিরে আসবে কোরানে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মুসলিমরা অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে, ‘তোমাদের হাতে আল্লাহ ওদেরকে শাস্তি দেবেন, ওদেরকে অপদস্থ করবেন, ওদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন ও বিশ্বাসীদের চিত্ত প্রশান্ত করবেন।’৫৫ (কোরান ৯:১৪) এই টেক্সটের আক্ষরিক পাঠ থেকে ফারাজ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, মুসলিমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আল্লাহ ‘হস্তক্ষেপ করবেন [এবং] প্রাকৃতিক বিধান পাল্টে দেবেন।’ জঙ্গীবাদীরা কি অলৌকিক সাহায্য আশা করতে পারে? ফারাজ বিষণ্নভাবে জবাব দিয়েছিলৈন, ‘হ্যাঁ।’৫৬
সাদাতের হত্যাকাণ্ডের পর কোনও ফলোআপ না হতে দেখে পর্যবেক্ষকরা দারুণ বিস্মিত হয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা অভ্যুত্থানের কোনও পরিকল্পনা করেনি বলে মনে হয়েছে, কিংবা গণ বিক্ষোভের আয়োজনেরও চেষ্টা করেনি। এর কারণ ছিল সম্ভবত প্রেসিডেন্টকে হত্যা করে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করার পর মুসলিমদের ঐশী হস্তক্ষেপের উপর আস্থা। ফারাজ যেন একে নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা বিরাট অসম্ভাব্যতার মুখোমুখী দাঁড়ানোর কথা জানলেও,৫৭ ফারাজ একে ব্যর্থতার ‘নির্বোধ’ ভীতি হিসাবে দেখেছেন। মুসলিমের কাজ আল্লাহ’র নির্দেশ পালন করা। ‘ফলাফলের জন্যে আমরা দায়ী নই।’ ‘বিধর্মীদের শাসনের অবসান ঘটলে, সবকিছু মুসলিমদের আয়ত্তে এসে যাবে। ৫৮
