আক্রমণের ভয়াবহতায় তীব্র ধাক্কা খেয়েছে পশ্চিমারা। সাদাতকে তারা পছন্দ করত। সাদাত এমন একজন মুসলিম শাসক ছিলেন যাঁকে তারা বুঝতে পারত। তিনি ‘ধর্মান্ধ’ না হয়েও যেন ধার্মিক ছিলেন; পশ্চিমারা ইসরায়েলের সাথে তাঁর শন্তি উদ্যোগ ও তাঁর খোলা দুয়ার নীতিকে সমীহ করত। আমেরিকান ও ইউরোপিয় যুবরাজ, রাজনীতিক ও প্রেসিডেন্টদের এক বিরাট দল সাদাতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিয়েছিলেন। কোনও আরব নেতা অবশ্য আসেননি, রাস্তায়ও জনতার কোনও ভীড় ছিল না। মিশরিয় জনগণ সাদাতের জন্যে চোখের পানি ফেলেনি, কিংবা পরে ইরানিরা যেমন খোমেনির লাশের চারপাশে করবে তেমনিভাবে তাঁর কফিনের পাশে ভীড় করেনি, শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। আরও একবার আধুনিক পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকতর প্রথাগত সমাজগুলো বিপরীত মেরুতে সরে গিয়েছিল, এবং ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করতে পারেনি তারা।
আমরা যেমন দেখেছি, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মিশরিয় সাদাতের শাসনের সাথে ইসলামের চেয়ে বরং জাহিলিয়াহ আমলেরই বেশি মিল বলে মনে করতেন। ১৯৮০ সালে মুসলিম ক্যালেন্ডারের অন্যতম পবিত্র দিনে কায়রোয় গ্রীষ্মকালীন শিবির অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা জামাত আল-ইসলামিয়াহর ছাত্র সদস্যরা সালাদিন মসজিদ দখল করে নেয়, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে এবং সাদাতকে একজন ‘তার্তার’ হিসাবে নিন্দা জানায়। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেও কেবল নামেই মুসলিম ত্রয়োদশ শতকের অন্যতম মঙ্গোল শাসক ছিলেন তার্তার জামাতের অন্য দমিত সদস্যরা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংস জিহাদে নিবেদিত গোপন সেলের নেটওয়ার্কে যোগ দেয়। খালেদ ইসলামবুলি ছিল এই জিহাদি সংগঠনের সদস্য।
সাদাত এই মতদ্বৈততা সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। বন্ধু শাহ’র নিয়তি বরণ করতে চাননি। ১৯৭৮ সালে তাঁর ভাষায় ল অভ শেম জারি করেন তিনি। প্রতিষ্ঠিত নিয়ম থেকে চিন্তায়, কথায় বা কর্মে যেকোনও ধরনের বিচ্যুতি নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ও সম্পত্তি ও পাসপোর্টের বাজেয়াপ্তিকরণের শাস্তিযোগ্য হবে। নাগরিকদের উপর সরকারের প্রতি সমালোচনামূলক কোনও সংগঠনে যোগ দান, কোনও প্রচারণায় অংশ গ্রহণ বা ‘জাতীয় শান্তির প্রতি হুমকি সৃষ্টি’ করতে পারে এমন কোনও কিছু প্রকাশনার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমনকি কারও পারিবারিক পরিবেশে মামুলি মন্তব্যও বিনা শাস্তিতে পার পাওয়ার জো ছিল না।৪১ সাদাতের জীবনের শেষ মাসগুলোতে সরকার আরও বেশি নিপীড়ক হয়ে উঠেছিল। ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৮১ সাদাত তাঁর চেনা ১৫৩৬ জন সমালোচককে আটক করেন; তাঁদের ভেতর মন্ত্রীসভার সদস্য, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, যাজক ও ইসলামি গ্রুপের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এভাবে আটক একজন ইসলামিস্ট ছিল সাদাতের ঘাতকের ভাই মুহাম্মদ ইসলামবুলি।৪২
আমরা সাদাতের হত্যাকারীর অনুপ্রেরণা সম্পর্কে ইসলামবুলির জিহাদি সংগঠনের আধ্যাত্মিক গুরু আব্দ আল-সালাম ফারাজের নিবন্ধে একটা ধারণা পেতে পারি। হত্যাকাণ্ডের পর, ডিসেম্বরে আল-ফরিদাহ আল-গায়বাহ (“দ্য নেগলেক্টেড ডিউটি’) প্রকাশিত হয়েছিল। অ্যাপোলোজিয়া ছিল না এটা, আবার আদতে সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যেও লেখা হয়নি। এটা সংগঠনের সদস্যদের মাঝে গোপনে বিলি করা হয়েছিল বলে মনে হয় এবং জঙ্গী মুসলিমরা পরস্পরের সাথে কী বিষয়ে কথা বলছে, কী তাদের উদ্বেগের বিষয়, তাদের ভীতি কী নিয়ে, এসব সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়। মুসলিমদের, যুক্তি তুলে ধরেছেন ফারাজ, একটা জরুরি দায়িত্ব রয়েছে। আল্লাহ পয়গম্বর মুহাম্মদকে (স) একটি প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কোরানের উদ্ধৃতি দিয়ে ফারাজ তাঁর নিবন্ধের শুরু করেছেন যেখানে দেখা যায় মুহাম্মদের (স) কাছে প্রথম ঐশীবাণী আসার মাত্র তের বছরের ভেতরই আল্লাহ তাঁর নির্দেশ পালনে ব্যর্থ মুসলিমদের প্রতি অধৈর্য হয়ে উঠেছিলেন। ‘তাদের জন্যে কি এখনও সময় আসেনি’ তৎপর হওয়ার? অসন্তোষের সাথে প্রশ্ন করেছেন আল্লাহ।৪৩ চৌদ্দশো বছর পরে তিনি কতখানি অধৈর্য হতে পারেন! সুতরাং, মুসলিমদের অবশ্যই আল্লাহ’র ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্যে সম্ভাব্য সব কিছু করতে হবে। তাদের শান্তিপূর্ণ, অহিংস পদ্ধতিতে ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে মনে করা আগের প্রজন্মগুলোর মতো হলে চলবে না। একমাত্র উপায় হচ্ছে জিহাদ, পবিত্র যুদ্ধ ৪৪
জিহাদই ছিল শিরোনামের ‘অবহেলিত দায়িত্ব’। ফারাজ যুক্তি দেখান যে, মুসলিমরা এখন আর এই পবিত্র সহিংসতা প্রয়োগ না করলেও এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শত বছরের ইসলামি ঐতিহ্যের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে কুতবের মতোই নিষ্ঠুরভাবে নৈর্বাচনিক হতে হয়েছে ফারাজকে, এবং এই প্রক্রিয়ায় অনিবার্যভাবে বিকৃত মুসলিম দর্শন তুলে ধরেছেন তিনি। আবার, এটা নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভুত বিকৃতি ছিল। ফারাজ জোর দিয়ে বলেছেন যে, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় তরবারি। একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন তিনি, যেখানে পয়গম্বর ধর্মের স্বার্থে যুদ্ধে অনিচ্ছুক ব্যক্তি এমনভাবে মারা যাবে ‘যেন সে কোনওদিন মুসলিম ছিল না, বা যে কিনা কপটাচারে পরিপূর্ণ, কেবল বাহ্যিকভাবেই মুসলিমের ভান করে বলেছেন বলে কথিত রয়েছে।৪৫ কোরানে আল্লাহ মুসলিমদের স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘তোমাদের জন্যে যুদ্ধের বিধান দেওয়া হলো, যদিও এ তোমাদের পছন্দ নয়।’৪৬ মুসলিমদের তিনি নির্দেশ দিয়েছেন
