খোমেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরের দিন, আয়াতোল্লাহ খামেনিকে ফাকিহ ঘোষণা করা হয়; এবং ২৮শে জুলাই, ১৯৮৯, রাফসানজানি নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর কেবিনেট থেকে রেডিক্যালরা বাদ পড়েন; মন্ত্রীদের এক তৃতীয়াংশই ছিলেন পশ্চিমে শিক্ষিত; তারা আরও পাশ্চাত্য বিনোয়াগ ও আরও পুঁজিপতি, অর্থনৈতিক ব্যাপারে সরকারের ভূমিকাকে খাট করার প্রতি জোর দিতে থাকেন। তারপরেও সমস্যা থেকে গিয়েছিল। কট্টরপন্থীরা বাস্তববাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে; কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্সের রক্ষণশীলরা তখনও সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন অংশ ত্রুটিপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজন যেন ইরানিদের বৃহত্তর বহুত্ববাদ ও পাশ্চাত্য ঐতিহ্যের চেয়ে বরং শিয়া ঐতিহ্যের ভিত্তিতে সেক্যুলারিজমের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। লোকে ইসলামি পরিবেশে পাশ্চাত্য মূল্যবোধের দিকে অগ্রসর হতে পারছিল, সেগুলোর প্রতি আগের চেয়েও কম বৈরী ছিল।
গুরত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের বিষয়টি ইরানের অন্যতম নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী আব্দোলকরিম সুরোশের রচনায় লক্ষ করা যেতে পারে। লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন সুরোশ, বিপ্লবের পর খোমেনির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করেছেন। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অংশ নন তিনি, কিন্তু যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করে থাকেন। তাঁর শুক্রবারের ভাষণগুলো ঘনঘন প্রচারিত হয় এবং মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যতম উল্লেখযোগ্য বক্তা তিনি। সুরোশ খোমেনি ও শরিয়তি, এই দুজনকেই শ্রদ্ধা করলেও তাঁদের অতিক্রম করে যান। পশ্চিম সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সঠিক, তিনি এমনও বলেছেন, বিংশ শতাব্দীর শেষে বহু ইরানির তিনটি পরিচয় থাকবে: প্রাক ইসলামি, ইসলামি ও পশ্চিমা; একে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই হবে তাদের। পশ্চিমের সমস্ত কিছুই দূষিত বা আসক্ত করার মতো নয়। কিন্তু সুরোশ পশ্চিমের অতি রেডিক্যাল সেক্যুলারিস্ট রীতি মেনে নেবেন না। তাঁর দৃষ্টিতে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ ধর্মের গ্রহণযোগ্য বিকল্পের যোগান দিতে পারে না। মানুষের সব সময়ই তাকে বস্তুর উর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার মতো আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন। ইরানিদের আধুনিক বিজ্ঞানের মূল্যবোধ উপলব্ধি করা শিখতে হবে, কিন্তু আবার নিজস্ব শিয়া ঐতিহ্যও ধরে রাখতে হবে।৭ ইসলামকেও অবশ্যই পরিবর্তিত হতে হবে: ফিকহকে অবশ্যই আধুনিক শিল্পায়িত বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, নাগরিক অধিকারের দর্শন ও একবিংশ শতকে নিজের শক্তিতে টিকে থাকার মতো একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব গড়ে তুলতে হবে। সুরোশ আবার উলেমা শাসনেরও বিপক্ষে ছিলেন, কারণ ‘ধর্মের উদ্দেশ্য অনেক বড়, তাকে কেবল যাজকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সুরোশ প্রায়শঃই অধিকতর রক্ষণশীল যাজকদের সামলোচনার মুখোমুখি হতেন, কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা বোঝায় যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র একে পশ্চিমের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো বিপ্লব উত্তর একটি পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
১৯৯৭ সালের ২৩শে মে হোজ্জাত উল-ইসলাম সায়ীদ খাতামি এক ভূমিধস বিজয়ের ভেতর দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে এটা যেন আরও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। সম্ভাব্য ৩০ মিলিয়ন ভোটের মধ্যে ২২ মিলিয়নই পেয়েছিলেন তিনি। অবিলম্বে পশ্চিমা জগতের সাথে আরও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সালমান রুশদির বিরুদ্ধে দেওয়া ফতওয়ার সাথে তাঁর দেশের সম্পর্কের অবসান ঘটান। পরে ফাকিহ আয়াতোল্লাহ খামেনি একে অনুমোদন দেন। তারপরও খাতামি তাঁর সংস্কার পদক্ষেপকে কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্সের তরফ থেকে বাধাগ্রস্ত হতে দেখেন, কিন্তু তাঁর নির্বাচন জনগণের একটা বড় অংশের পক্ষ থেকে বৃহত্তর বহুত্ববাদ, ইসলামি আইনের আরও কোমল ব্যাখ্যা ও ‘হতদরিদ্রদের’ জন্যে অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও নারীদের জন্যে আরও প্রগতিশীল নীতিমালার* আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছিল। ইসলাম থেকে পিছু হটার কোনও ব্যাপার ছিল না। ইরানিরা তখনও তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শিয়া মোড়কেই আবদ্ধ দেখতে চাইছিল বলে মনে হয়েছে, আধুনিক মূল্যবোধসমূহকে যা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে মনে করা কোনও কিছু থেকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে বলে মনে হয়েছে। এমন হতে পারে যে, কোনও একটি রেডিক্যাল আন্দোলনকে এর আগ্রাসন ও অসন্তোষের ভেতর দিয়ে কাজ করতে দেওয়া হলে তা অন্যান্য ট্র্যাডিশনের সাথে সৃজনশীলভাবে মিথষ্ক্রিয়া করতে শিখতে পারে, নিকট অতীতের সহিংসতা এড়িয়ে যায় এবং সাবেক শত্রুর সাথে মৈত্রী গড়ে তোলে।
[* ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে এটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যখন ইরানি ছাত্ররা আরও গণতন্ত্রের এবং উলেমাদের হাতে বাধাগ্রস্ত হবে না, এমন একটি ইসলামি সরকারের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল।]
১৯৮১ সালে পশ্চিমা বিশ্ব সুন্নি মৌলবাদীদের হাতে প্রেসিডেন্ট সাদাতের হত্যাকাণ্ডের সংবাদে গভীর শোক প্রকাশ করার মুহূর্তে মিশরে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সাফল্য উদযাপনের উদ্দেশ্যে এক কুচকাওয়াজ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন সাদাত। কুচকাওয়াজের একটা ট্রাক সহসা ঠিক প্রেসিডেনশাল স্ট্যান্ডের সামনে লাইন ছেড়ে বের হয়ে আসে। ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট খালেদ ইসলামবুলিকে ট্রাক থেকে লাফ দিয়ে নেমে ছুটে আসতে দেখে সাদাত উঠে দাঁড়ান, তিনি ভেবেছিলেন অফিসারটি তাঁকে স্যালুট করতে যাচ্ছে। কিন্তু তার বদলে মেশিনগানের এক ঝাঁক বুলেট ছুটে আসে। সাদাতের দেহ লক্ষ্য করে ক্রমাগত গুলি বর্ষণ করতে থাকে ইসলামবুলি, এমনকি নিজে পেটে গুলি খাওয়ার পরেও চিৎকার করে বলছিল, ‘কুত্তাটাকে, বেঈমানটাকে আমার হাতে তুলে দাও!’ হামলা মাত্র পঞ্চাশ সেকেন্ড স্থায়ী হলেও সাদাত ছাড়াও আরও সাতজন প্ৰাণ হারিয়েছিল, এবং অন্য আঠাশজন আহত হয়েছে।
