এমনি অন্তর্কলহের প্রেক্ষাপটে মৃত্যুর চার মাস আগে ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯, ব্রিটিশ ভারতীয় লেখক সালমান রূশদির বিরুদ্ধে ফতওয়া জারি করেন খোমেনি। রূশদি তাঁর দ্য স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসে এমন একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন বহু মুসলিমের কাছে যাকে পয়গম্বর মুহাম্মদের (স) ব্লাসফেমাস চিত্রায়ন মনে হয়েছে। পয়গম্বরকে এখানে একজন কামুক, প্রতারক ও স্বেচ্চাচারী হিসাবে তুলে ধরেছেন তিনি-এবং সবচেয়ে বিপজ্জনকভাবে-বলার চেষ্টা করেছেন যে কোরান শয়তানি প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এটা এমন এক উপন্যাস যা অনন্য সাধারণভাবে উত্তর আধুনিক বিশ্বের ঝিম লাগানো দ্বিধা তুলে ধরেছে। যেখানে কোনও সীমা নেই, নিশ্চয়তা নেই, পরিষ্কার বা সহজবোধ্য নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। আক্রমণাত্মক অনুচ্ছেদগুলো ছিল এক ধরনের ব্রেক ডাউনে আক্রান্ত ও পাশ্চাত্যের ইসলামবিরোধী কৃসংস্কার লালনকারী একজন বিভ্রান্ত ভারতীয় চিত্র তারকার স্বপ্ন ও কল্পনা। ব্লাসফেমি ছিল আঁকড়ে ধরা অতীতের স্মৃতি বাতিল করে প্রাচীন বিভিন্ন সূত্র থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন পরিচয় অর্জন করারও প্রয়াস। কিন্তু বহু মুসলিম মুহাম্মদের (স) এই ছবিকে গভীরভাবে আঘাতসৃষ্টিকারী হিসাবে অনুভব করেছে। এটা তাদের নিজস্ব মুসলিম ব্যক্তিত্বের পবিত্র কিছুর লঙ্ঘন মনে হয়েছে। ব্রিটেনের অন্যতম উদার মুসলিম ড. যাকি বাদাওয়ি দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকাকে বলেছেন, রূশদির বাক্যগুলো ‘কোনও মুসলিমের আপন বোনকে ধর্ষণ করার চেয়েও ঢের বেশি খারাপ।’ প্রতিটি মুসলিম সত্তার ইসলাম চর্চায় পয়গম্বর এমনি অন্তস্থঃ সত্তায় পরিণত হয়েছেন যে উপন্যাসটি ‘যেন আপনার দেহে ছুরিকাঘাত করা বা আপনার বোনকে ধর্ষণ করা’র মতো। পাকিস্তানে দাঙ্গা হয়েছে, এবং ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে বইটি পোড়ানো হয়েছে। এখানে পাকিস্তান ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিমদের এক বিরাট অংশ বাস করে, এরা কেবল ক্রিশ্চান ধর্মের প্রতি আক্রমণের জন্যেই শাস্তি দানকারী ব্রিটিশ ব্লাসফেমি আইনের প্রতি আপত্তি জানিয়েছে। ইংল্যান্ডে ব্যাপক বিস্তৃত কুসংস্কার সম্পর্কে সজাগ ছিল তারা। ১৩ই ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিসের গুলিবর্ষণের দৃশ্য দেখে খোমেনি ধরে নেন উপন্যাসটা অবশ্যই খারাপ। তাঁর ফতওয়া সারা বিশ্বের মুসলিমদের ‘যেখানেই পাওয়া যাক সালমান রুশদি ও তাঁর প্রকাশককে হত্যা করার’ নির্দেশ দেয়।
পরের মাসে অনুষ্ঠিত ইসলামিক কনফারেন্সে পঁয়তাল্লিশটি সদস্যের ভেতর চুয়াল্লিশটি দেশ অনৈসলামিক হিসাবে ফতওয়ার নিন্দা করে। ইসলামি বিধানে কোনও অভিযুক্তকে বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড দান অনুমোদনযোগ্য নয়, অমুসলিম দেশে মুসলিম আইনও প্রয়োগ করা যায় না। ইসলামের আরও একটি বিকৃতি ছিল এই ফতওয়াটি। খোমেনির অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক গুরু মোল্লা সদরা তীব্রভাবে এই ধরনের অনুসন্ধায়ী সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরোধিতা করেছেন। চিন্তার স্বাধীনতার উপর জোর দিয়েছিলেন তিনি। আরও একবার ইসলাম একটি মারাত্মক আঘাত সহ্য করেছে, এই বিশ্বাস থেকে মুসলিম ক্ষোভের উদ্ভব হয়েছিল; বহু বছরের দমন, মর্যাদাহ্রাস ও সেক্যুলারিস্ট হামলা মুসলিম কাণ্ডজ্ঞানকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। ফতওয়া ছিল এক ধরনের যুদ্ধ, পশ্চিমের সেক্যুলার ও উদারপন্থীরা একে সেভাবেই দেখেছে, তারা তাদের সবচেয়ে পবিত্র মূল্যবোধ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করেছে। তাদের চোখে, মানবতা-অতিপ্রাকৃত আল্লাহ নন-সকল জিনিসের পরিমাপক; নারী-পুরুষকে অবশ্যই তাদের মননশীলতার সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার জন্যে স্বাধীনতা দিতে হবে। মুসলিম, যাদের কাছে আল্লাহ’র সাবভৌমত্বই শেষ কথা, তারা এটা মেনে নিতে পারেনি। রূশদি ঘটনা ছিল সমন্বয়ের অতীত দুটি অর্থডক্সির সংঘাত; কোনও পক্ষই অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারেনি। একই দেশে বাসরত বিভিন্ন গ্রুপ একে অন্যের সম্পূর্ণ বিপক্ষে ও সম্ভাব্য যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
১৯৮৯ সালের জুন মাসে খোমেনির পরলোকগমনের পরপরই ধার্মিক ও সেক্যুলারিস্টদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। পশ্চিমে খোমেনিকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করা হত, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ইরানিদের বাঁধভাঙা শোকের মাতম দেখে লোকে মহাবিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কফিন ঘিরে জনতা এমন প্রবলভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল যে লাশ উল্টে পড়ে গিয়েছিল; ইমামকে যেন চিরকালের জন্যে নিজেদের কাছে রেখে দিতে চেয়েছিল তারা। অবশ্য, তাঁর মৃত্যুর পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভেঙে খানখান হয়ে যায়নি। প্রকৃতপক্ষেই, তা ব্যাপক স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। জিম্মি ইস্যুর মতো ফতওয়া পশ্চিমের শত্রুতা যোগালেও ইরান পাশ্চাত্য চেতনার কাছাকাছি অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হয়েছে। ৯ই জুলাই, ১৯৮৯ তারিখে পাশ হওয়া নতুন সংবিধান একটি অধিকতর সেক্যুলার, বাস্তবভিত্তিক ধরনের সরকারের দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ তুলে ধরেছে। প্রধান ফাকিহর উপর আর অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা আরোপ করা হচ্ছিল না, কিংবা খোমেনির মতো জনপ্রিয় গ্রহণযোগ্যতায় অভিষিক্ত হওয়ারও প্রয়োজন ছিল না। তাঁকে যুক্তিসঙ্গতভাবে ইসলামি আইন জানতে হবে, কিন্তু প্রবীন মুজতাহিদ হওয়ার আর দরকার পড়বে না। একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলে, ‘রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি’ই হবে নতুন নেতার চূড়ান্ত যোগ্যতার গুণ। কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্স ভেটো প্রয়োগের অধিকার রেখে দিলেও নতুন এক্সপিডেয়েন্সি কাউন্সিলের মাধ্যমে এর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এইসব পরিবর্তনের ফলে মজলিস গার্ডিয়ান্সের বাধার মুখে পড়া বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়নে সক্ষম হয়।৩৫
