ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করা যে খুবই কঠিন সেটাই পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হতে চলেছিল। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে নাজুক ও অসুস্থ খোমেনি আরও একবার সাংবিধানিক বিভিন্ন ইস্যুতে ভাষণ দেন। এইবার কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্স শ্রম আইনে বাধার সৃষ্টি করছিল, তাদের মতে এটা শরীয়াহ বিরোধী ছিল। প্রতিক্রিয়াশীল ও অভিজাতপন্থী উলেমাদের চেয়ে জনপ্রিয় মজলিসের সমর্থক খোমেনি জনগণের কল্যাণের স্বার্থে প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রের মৌলিক ইসলামি ব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকার কথা ঘোষণা করেন। শরীয়াহ ছিল প্রাক শিল্পায়ন বিধি, আধুনিক বিশ্বের বাস্তব প্রয়োজনের নিরীখে তার অভিযোজন প্রয়োজন। খোমিন যেন এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র চাইলে
যেকোনও ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শ্রম…নাগরিক বিষয়াদি, কৃষি বা অন্য কোনও ব্যবস্থা দিয়ে মৌল ইসলামি ব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত করতে পারে ও সেবা দিতে পারে…এটা রাষ্ট্রের সাধারণ ও সামগ্রিক নীতিমালার বাস্তবায়নে উপায় হিসাবে একচেটিয়া অধিকার।২৯
স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন খোমেনি। এই ধরনের বাস্তব বিষয়ে রাষ্ট্রের অবশ্যই ‘একচেটিয়া’ অধিকার থাকতে হবে ও প্রথাগত ধর্মের বাধাসৃষ্টিকারী বিধিবিধান থেকে মুক্তি পেতে হবে। দুই সপ্তাহ পরে আরও অগ্রসর হন তিনি। প্রেসিডেন্ট খামেনি তাঁর মন্তব্যকে এটা বোঝাতে ব্যাখ্যা করেন যে, প্রধান ফাকিহর আইনের ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার রয়েছে। খোমেনি জবাবে বলেন, তিনি তেমন কিছু বোঝাতে চাননি। ফাকিহ হিসাবে তাঁর নিজস্ব বিধানের কোনও রকম উল্লেখ না করে তিনি পুনরাবৃত্তি করেন যে, সরকার কেবল স্বর্গীয় আইনের ব্যাখ্যা করারই অধিকারী নয়, বরং খোদ আইনেরই বাহন। সরকার আল্লাহ কর্তৃক পয়গম্বরকে দান করা সেই স্বর্গীয় আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ‘প্রান্তিক স্বর্গীয় আইনের উপর অগ্রাধিকার রয়েছে তাঁর।’ এমনকি প্রার্থনা, রমযানের উপবাস এবং হাজ্জের মতো ‘স্তম্ভ’গুলোর ক্ষেত্রে এর অগ্রাধিকার আছে:
সরকারের যেকোনও বৈধ চুক্তি এককভাবে রদ করার ক্ষমতা রয়েছে… সেই চুক্তি যদি ইসলাম ও দেশের স্বর্থের পরিপন্থী হয়ে। ধর্মীয় বা সেক্যুলার যাই হোক না কেন, ইসলামের স্বার্থ বিরোধী হলে তাকে রোধ করতে পারে।
শত শত বছর ধরে শিয়ারা বিভিন্ন বলয়ের বিচ্ছিন্নতার উপর জোর দিয়ে এসেছে: ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার পরম মিথোস রাজনীতির বাস্তব লোগোসের অর্থ যোগালেও তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এখন খোমেনি যেন জনগণের স্বার্থ ও ইসলামের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্যে সরকারের প্রয়াসে অবশ্যই কোনও বাধা দেওয়া যাবে না বলে জোর দিচ্ছিলেন।
অনেকে ধরে নিয়েছিল যে খোমেনি তাঁর নিজস্ব সরকারের কথা বোঝাচ্ছেন এবং তিনি বেলায়েত-ই ফাকিহ মতবাদকে ইসলামের ‘স্তম্ভগুলোর’ চেয়েও উচ্চতর এক পর্যায়ে তুলে আনতে চাইছেন বলে ভেবেছে। পাশ্চাত্য পর্যবেক্ষকগণ খোমেনির বিরুদ্ধে অতিক্ষমতাধর ভাববার অভিযোগ এনেছেন। কিন্তু স্পিকার রাফসানজানি উল্লেখ করেন, খোমেনি ফাকিহর কথা বলেননি। খোমেনির সবচেয়ে রেডিক্যাল সমর্থকদের ভীত করে তিনি মত প্রকাশ করেন যে, ‘সরকার’ বলে খোমেনি মজলিসের কথাই বুঝিয়েছেন। ১২ই জানুয়ারি, ১৯৮৮ এক অসাধারণ বয়ানে রাফসানজানি বেলায়েত-ই ফাকিহর এক নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেন। আল্লাহ পয়গম্বরের মাধ্যমে কোরানে উম্মাহর প্রয়োজনীয় সকল আইন প্রকাশ করেননি। তিনি এই ক্ষমতা মুহাম্মদকে (স) প্রদান করেছেন, যিনি তাঁর ‘ভাইস-জিরেন্টে’ পরিণত হয়েছেন এবং এইসব গৌণ বিষয়ে তাঁকে নিজস্ব সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগের কর্তৃত্ব দিয়েছেন। এখন প্রধান ফাকিহ ইমাম খোমেনি নিজের ক্ষমতা মজলিসের হাতে তুলে দিয়েছেন, নিজস্ব সহজাত বিবেচনা থেকেই এখন মজলিসকে আইন প্রণয়ন করতে হবে। এর মানে কি তবে ইরান পাশ্চাত্য গণতন্ত্রকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল? কোওনভাবেই না। আইন প্রণয়নের এই অধিকার জনগণ নয়, এসেছে আল্লাহ’র কাছ থেকে, যিনি তাঁর ক্ষমতা পয়গম্বর, ইমাম এবং এখন ইমাম খোমেনিকে দিয়েছেন এবং তারাই-জনগণ নয়-মজলিসের শাসনের বৈধতা দান করেছেন। ‘সুতরাং বুঝতেই পারছেন,’ তাগিদ দিয়েছেন রাফসানজানি, ‘গণতন্ত্ৰ পশ্চিমের চেয়ে ঢের ভালো রূপে উপস্থিত রয়েছে,’ কারণ তা আল্লাহয় প্রোথিত। এটা ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্যে, বেলায়েত-ই ফাকিহর অনুমতিতে স্বাস্থ্যকর সরকার পদ্ধতি।’৩১ আবারও পশ্চিমের মতোই আধুনিক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ইরানকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু এবার তা এসেছে ইসলামি মোড়কে যার সাথে জনগণ নিজেদের সম্পর্কিত করতে এবং তাদের নিজস্ব শিয়া ঐতিহ্যের সাথে একে সংযুক্ত করতে পেরেছে।
রাফসানজানি সম্ভবত নিজের সীমার বাইরে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু খোমেনিকে খুশি মনে হয়েছে। ১৯৮৮ সালের বসন্তকালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি যাজকদের কোনও উল্লেখ ছাড়াই স্রেফ মজলিসকে সমর্থন করার জন্যে জনগণের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষী জনগণ সুপ্ত ভর্ৎসনা বুঝতে ভুল করেনি, উলেমারা অর্ধেক আসন খুইয়েছিল। নতুন মজলিসে ২৭১ সদস্যের মধ্যে ৬৩ জন সদস্য প্রথাগত মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন।৩২ আবার, খোমেনিকে ফলাফলে সন্তুষ্ট মনে হয়েছে। ১৯৮৮ সালের শীতে সংবিধানের সংশোধন আকাঙ্ক্ষী অধিকতর বাস্তববাদী রাজনীতিবিদদের প্রতিও সবুজ সঙ্কেত দান করেছিলেন তিনি। অক্টোবরে উলেমারা যাতে দেশের প্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্যে তাগিদ দেন তিনি। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবেন ‘বিশেষজ্ঞরা, বিশেষ করে কেবিনেট মন্ত্রী, উপযুক্ত মজলিস কমিটিসমূহ … বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা কেন্দ্রগুলো….উদ্ভাবক, আবিষ্কারকারী এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ বিশেষজ্ঞ।’৩৩ দুই মাস পরে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি কমিটিকে কাজ করার অনুমতি দান করেন তিনি। অধিকতর রেডিক্যাল ইসলামপন্থীরা হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইমামের অনুমোদনে বাস্তববাদীরা বিজয়ী হচ্ছিল বলে মনে হয়েছে।
