কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্সের সাথে অচলাবস্থার অবসানের লক্ষ্যে মজলিসের প্রাণবন্ত বক্তা হোজ্জাত উল-ইসলাম রাফসানজানি খোমেনিকে প্রধান ফাকিহ হিসাবে ভূমি সংস্কার বিল পাসে তাঁর কর্তৃত্ব প্রয়োগের আবেদন জানালেন। ইসলামি বিষয়ে সংবিধান প্রধান ফাকিহকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার দিয়েছে। কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্সের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিতে পারতেন তিনি। রাফসানজানি পরামর্শ দিলেন যে, খোমেনি চাইলে জনগণের কল্যাণে প্রয়োজন হলে একজন জুরিস্টকে কোরান ও সুন্নাহয় প্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়নি এমন সব বিষয়ে ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের’ বিধান দেওয়ার ক্ষমতাদানকারী ইসলামি নীতি মাসলাহাহ’র উদ্ধৃত করতে পারেন। কিন্তু খোমেনি তেমন কিছু করতে চাননি। তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন যে, প্রধান ফাকিহর অবস্থান আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের যে কর্তৃত্ব থাকা প্রয়োজন সেটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। প্রবীন মানুষ ছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত ক্যারিশমা অনুযায়ী তিনি সরকারের সিদ্ধান্তে নাক গলানো ও তা বদলে দিতে থাকলে মজলিস ও কাউন্সিল সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ও অখণ্ডতা হারাবে, ইসলামি সংবিধান মরণ থেকে রেহাই পাবে না। কাউন্সিল ও মজলিসের এই টানাপোড়েন অব্যাহত ছিল।
ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রতিদিন শাহাদৎ বরণ করে চলা ইরানি শিশুদের উদাহরণ টেনে উলেমাদের লজ্জা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন খোমেনি। এই শিশু শহীদরা একটি অতীন্দ্রিয় দর্শনকে বাস্তব নীতিতে পরিণত করার নৈতিক বিপদ তুলে ধরেছে। যুদ্ধ ঘোষণার মুহূর্ত থেকে কিশোররা তাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠানোর আবেদন জানাতে মসজিদে ভিড় জমাতে শুরু করেছিল। তাদের অনেকেই বিপ্লবের সময় রেডিক্যাল হয়ে ওঠা বস্তি ও শ্যান্টি টাউন থেকে এসেছিল। পরে তাদের অনিবার্যভাবে বিষণ্ন ও গম্ভীর জীবনকে অ্যান্টিক্লাইমেক্স হিসাবে আবিষ্কার করে। কেউ কেউ ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডাউনট্রেডেনে যোগ দিয়েছে বা কন্সট্রাকশন জিহাদে কাজ করেছে, তবে এর সাথে রণক্ষেত্রের উত্তেজনার কোনও তুলনা চলতে পারে না। ইরান যুদ্ধের পক্ষে কারিগরি দিক থেকে সমৃদ্ধ ছিল না; জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটেছিল, দেশের তরুণরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডাউনট্রেডেন অ্যাকশনের জন্যে উদগ্রীব বিশ মিলিয়ন তরুণের এক সেনাবাহিনীর নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়েছিল। বার বছরের কিশোররা যাতে বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়াই যুদ্ধে যাবার জন্যে নাম লেখানোর যোগ্যতা অর্জন করতে পারে সেজন্যে সরকার একটি আইন পাশ করে। ইমামের শিষ্যে পরিণত হবে তারা, মারা গেলে তাদের স্বর্গে স্থান পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেওয়া যেতে পারে। লক্ষ লক্ষ কিশোর রক্তরাঙা পট্টি (শহীদের চিহ্ন) পরে যুদ্ধক্ষেত্রে ভীড় জমাতে শুরু করেছিল। কেউ কেউ মাইনফিল্ড পরিষ্কার করেছে, সেনাবাহিনীর সামনে থেকে দৌড়ে গেছে এবং প্রায়শঃই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। অন্যরা পরিণত হয়েছিল আত্মঘাতী বোমাহামলাকারীতে, কামিকাযি স্টাইলে ইরাকি ট্যাংকের উপর হামলা করেছে। তাদের অছিয়তনামা লেখাতে বিশেষ লিপিকারদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর বেশকয়েকটাই ইমাম খোমেনির কাছে লেখা চিঠির রূপ নিয়েছিল, এবং ‘বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে বেহেশতের পথে’ যুদ্ধ করার আনন্দ ও তাদের জীবনে তাঁর বয়ে আনা আলোর কথা বলেছে সেগুলো।২৫
এই তরুণরা বিপ্লবে খোমেনির বিশ্বাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। অদৃশ্যের শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে ‘সাক্ষী’ হতে ইমাম হুসেইনের নজীর অনুসরণ করে প্রাণ দিচ্ছিল তারা। এটা ছিল নিগূঢ়বাদের সর্বোচ্চ রূপ, যার মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজেকে অতিক্রম করে ঈশ্বরের সাথে ঐক্য অর্জন করে। তাদের প্রবীন পুরুষদের বিপরীতে এই শিশুরা আর স্বার্থপরতা ও বস্তুগত জগতের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা ‘প্রকৃতির দাস’ থাকেনি। ইরানকে তারা ‘এমন একটি অবস্থা অর্জনে সাহায্য করছিল যাকে স্বর্গীয় বলে উল্লেখ করা ছাড়া আর কোনওভাবেই বর্ণনা করা সম্ভব নয়।’২৬ নারী-পুরুষ যতক্ষণ বস্তু ও পার্থিব বিষয়ের দিকে মনোযোগী থাকবে, মানবেতরে পরিণত হবে তারা। ‘মৃত্যু মানে কিছু না নয়,’ ঘোষণা করেছিলেন খোমেনি। ‘এটাই জীবন।’২৭ শাহাদৎ বরণ পাশ্চাত্য যৌক্তিক বাস্তববাদীতার বিরুদ্ধে ইরানের বিদ্রোহ ও জাতীর আত্মার জন্যে মহান জিহাদের ক্ষেত্রে আবিশ্যিক জরুরি অংশে পরিণত হয়েছিল ২৮ কিন্তু খোমেনির শাহাদৎ বরণ ‘কিছু না নয়’ বলে জোর দেওয়া সত্ত্বেও হাজার হাজার শিশুকে ভীতিকরভাবে অকাল সহিংস মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার ভেতর নিহিলিজম ছিল। এটা জীবনের পবিত্র অলঙ্ঘনীয়তা সংক্রান্ত এবং প্রয়োজনে আমাদের জীবনের বিনিময়ে হলেও সন্তানদের জীবন বাঁচানোর সহজাত তাগিদের ধার্মিক ও সেক্যুলারিস্ট সবার পক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক মানবীয় মূল্যবোধ বিরোধী। শিশু শহীদের এই কাল্ট তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মবিশ্বাসের মৌলবাদীরা সমানভাবে প্ৰবণ ধর্মের এমন আরেকটি মারাত্মক বিকৃতি। সম্ভবত এর উদ্ভব ঘটেছে আমাদের ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষী শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার ভীতি থেকে। তবে অতীন্দ্রিয়, পৌরাণিক আজ্ঞাকে একটি বাস্তব ভিত্তিক, সামরিক বা রাজনৈতিক নীতিমালায় পরিবর্তনের বিপদটুকুও তুলে ধরে এটা। মোল্লা সদরা সত্তার অতীন্দ্রিয় মৃত্যুর কথা বলার সময় হাজার হাজার তরুণের স্বেচ্ছা শারীরিক মৃত্যুর কথা ভাবেননি। আবার, আধ্যাত্মিক বলয়ে নিপুণভাবে কাজ করে এমন কিছুকেই আক্ষরিক ও প্রায়োগিকভাবে পার্থিব জীবনে অনূদিত হলে তা বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে।
