এটা অবশ্যই শ্রদ্ধাযোগ্য, কিন্তু এখানে একটা সমস্যা রয়েছে। মানুষের অর্থ ও মিথোসের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তাদের আবার কঠিন, যৌক্তিক লোগোসও প্রয়োজন। প্রাক আধুনিক সমাজে এই দুটি বলয়কে অবিচ্ছেদ্য মনে করা হয়েছে। কিন্তু মিথকে যেমন যৌক্তিক বা যুক্তিভিত্তিক পরিভাষায় ব্যাখ্যা করা যায়নি, ঠিক তেমনি একে বাস্তব রাজনীতিতেও প্রকাশ করা যায়নি। এটা কঠিন ছিল, এবং অনেক সময় আবশ্যিকভাবে ধর্ম ও রাজনীতির বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। ইমামতের ধর্মতত্ত্ব দেখিয়েছে যে, অতীন্দ্রিয় দর্শন ও একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজনীয় কঠিন বাস্তববাদীতার ভেতর এক ধরনের বৈসাদৃশ্য রয়েছে। খোমেনি অনেক সময় মিথোস ও লোগোসের সূক্ষ্ম পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেছেন। এর ফলেই তাঁর বেশ কিছু নীতি বিপর্যয়কর ছিল। জিম্মি সংকটের পরপর তেলের আয় আকস্মিক হ্রাস ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আদর্শগত শুদ্ধি পররাষ্ট্র দপ্তর ও শিল্পক্ষেত্রে যোগ্য লোকের অভাব সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমকে বৈরী করে ইরান গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, খুচরো যন্ত্রাংশ এবং কারিগরি পরামর্শ বাজেয়াপ্ত করেছিল। ১৯৮২ সাল নাগাদ মূদ্রাস্ফীতি চড়ে ওঠে, সৃষ্টি হয়েছিল ভোগ্যপণ্যের মারাত্মক ঘাটতির, বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগে (৫০ ভাগ শহরে)।২১ জনগণের ভোগান্তি ধর্মীয় দিক থেকে জনকল্যাণকে ক্ষমতায় আসার এজেন্ডার একেবারে সবার উপরে স্থান দানকারী সরকারের পক্ষে বিব্রতকর ছিল। দরিদ্রদের জন্যে যথাসাধ্য করেছেন খোমেনি। পাহলভীদের আমলে সবচেয়ে দুর্দশার শিকার অংশের ভোগান্তি লাঘবে ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডাউনট্রডেন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ফ্যাক্টরি ও ওয়ার্কশপে ইসলামি সংগঠনসমূহ শ্রমিকদের সুদবিহীন ঋণের যোগান দিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কন্সট্রাকশন জিহাদ কৃষক সমাজের জন্যে এবং কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও কল্যাণমূলক প্রকল্পে, বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় নতুন দালানকোঠা নির্মাণের জন্যে তরুণ শ্রমিক নিয়োগ করেছে। কিন্তু ইরাকের সাথে যুদ্ধে কারণে এইসব প্রয়াস মার খেয়ে গেছে, যা খোমেনির সৃষ্টি ছিল না।
অতীন্দ্রিয় ও প্রায়োগিকের মধ্যকার টানাপোড়েন সম্পর্কে সজাগ ছিলেন খোমেনি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জনসংশ্লিষ্টতা ও সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রয়োজন। পাশ্চাত্য এর নিজস্ব আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় যেমন আবিষ্কার করেছে, এটাই শিল্পায়িত, প্রযুক্তিয়ায়িত সমাজে কার্যকর একমাত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা। আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে জনগণের কাছে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্যে ইসলামি প্রেক্ষাপট দান করাই ছিল তাঁর বেলায়ত-ই ফাকিহ তত্ত্বের প্রয়াস। প্রধান ফাকিহ ও কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ানস নির্বাচিত মজলিসকে পাশ্চাত্য সেক্যুলারিস্ট আদর্শের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে অক্ষম মুসলিমদের প্রয়োজনীয় একটি অতীন্দ্রিয় ধর্মীয় তাৎপর্য দেবে: বেলায়েত-ই ফাকিহ এভাবে পার্লামেন্টের বাস্তব কর্মকাণ্ডের জন্যে একটি অতীন্দ্রিয় ভিত্তি প্রদান ও আধুনিকতাকে ঐতিহ্যবাহী দর্শনে ধারণ করার একটি প্রয়াস ছিল। কিন্তু নাজাফের মাদ্রাসায় বেলায়েত-ই ফাকিহ গড়ে তুলেছিলেন খোমেনি। বলা হয়ে থাকে, কাগজে কলমে ভালো হলেও ইরানের মাটিতে বাস্তব প্রয়োগ করতে গিয়ে সেটা সমস্যাসঙ্কুল প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৮১ সালের গোড়ার দিকে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, এবং এই সমস্যা খোমেনিকে বাকি জীবন জ্বালিয়ে মেরেছে। ২২
১৯৮১ সালে মজলিস সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করবে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমি সংস্কারের প্রস্তাব উত্থাপন করে। এই পদক্ষেপের প্রতি খোমেনির সহানুভূতি ছিল। শরীয়াহর বিধানের বিরোধী হলেও জনগণ এতে উপকৃত হত। তিনি এও বুঝতে পারছিলেন যে ইরান এই ধরনের মৌলিক সংস্কার অর্জন করতে না পারলে তা কৃষিভিত্তিক ও সামন্তবাদী রয়ে যাবে, যেকোনও আধুনিকায়ন প্রয়াসই হবে উপরিগত। কিন্তু ভূমি সংস্কার বিল সমস্যার মুখে পড়ে। সংবিধান অনুযায়ী সকল আইনেরই কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্স কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার কথা ছিল; তাদের মতে ইসলাম বিরোধী হলে যেকোনও আইন নাকচ করার ক্ষমতা ছিল তাঁদের। কাউন্সিলের বহু উলেমারই বিপুল পরিমাণ জমি ছিল, তাদের সামনে বিলটি উপস্থিত করা হলে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তাঁরা, তাঁদের সিদ্ধান্তের পক্ষে শরীয়াহ আইনের উল্লেখ করেন। খোমেনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। যাজকগণের, তিনি বলেন, ‘যোগ্যতা নেই এমন কোনও বিষয়ে নাক গলানো উচিত নয়। সেটা ‘ক্ষমার অযোগ্য পাপ হবে, কারণ তাতে যাজকদের প্রতি জাতির মনে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হবে।২৩ যাজকগোষ্ঠী ধর্ম ও ফিকহ বুঝলেও আধুনিক অর্থনীতি বোঝেন না; ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে অবশ্যই একটি আধুনিক রাষ্ট্র হতে হবে, যেখানে নিজস্ব দক্ষতার ক্ষেত্রে কাজ করার জন্যে বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।
কিন্তু অচলাবস্থা অব্যাহত থাকে। কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্স এই ইস্যুতে পিছু হটতে অস্বীকৃতি জানায়, খোমেনি আরও আধ্যাত্মিক কৌশলের আশ্রয় নেন। ১৯৮১ সালের মার্চে যাজকদের একটি দলকে তিনি বলেন: ‘নিজেকে সংস্কার না করে কারও অন্যকে সংস্কার করার চিন্তা করা উচিত নয়। খোদ যাজকগণই স্বার্থপরতা আর অর্থহীন ক্ষমতায় দ্বন্দ্বে ব্যস্ত থাকলে সাধারণ জনগণকে আর ইসলামে ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। উলেমার প্রতিটি সদস্যকে অবশ্যই দেশের উন্নয়নে বাধার সৃষ্টিকারী এই অহমবাদ অতিক্রম করতে হবে। সমাধান হচ্ছে ‘এমন এক পর্যায়ে উঠে আসা যেখানে তুমি…নিজেকে উপেক্ষা করতে পারবে,’ উপসংহারে পৌঁছেছেন খোমেনি, ‘যখন প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার মতো কোনও সত্তা থাকে না, তখন আর কোনও বিরোধ, কোনও সংঘাত থাকে না।২৪ খোমেনি অনুসৃত অতীন্দ্রিয় ইরফান থেকেই এর সরাসরি উদ্ভব; সন্ধানী আল্লাহ’র নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিবর্তনকারী আল্লাহ’র দর্শনকে ধারণ করতে না পারা পর্যন্ত স্বার্থপর আশাআকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত করে নেয়। কিন্তু আধুনিক রাজনীতির গতিময়তা আধ্যাত্মিক ধ্যানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ান্সের উলেমাগণ খোমেনির আবেদনে কান দেননি। রাজনীতি সাধারণভাবে নারী-পুরুষকে সত্তার উন্নত সত্তা দিয়ে আকর্ষণ করে। আধুনিক সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পর বিরোধী স্বার্থের একটা ভারসাম্যের ভেতর দিয়ে কাজ করে, এই ধরনের আত্মবিনাশ দিয়ে নয়। বেলায়েত-ই ফাকিহ’র প্রণয়নের সময় খোমেনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, কাউন্সিল অভ গাডিয়ান্সের উলেমাগণ অদৃশ্যের অতীন্দ্রিয়, গোপন (বাতিন ) মূল্যবোধসমূহকে নিশ্চিত করবেন; কিন্তু সে জায়গায় তাদের সাধারণ মরণশীলদের মতোই যাহিরের বস্তুবাদে আটকে আছেন বলে মনে হয়েছে।
