খোমেনি পিতামাতাদের সরকারের প্রতি বৈরী সন্তানদের ত্যাগ করার ও যেসব ইরানি ধর্ম নিয়ে পরিহাস করে তাদের ধর্মদ্রোহী ঘোষণা ও মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য অপরাধে অপরাধী হিসাবে তাদের বিচারের নির্দেশ দিলে বোধগম্যভাবেই পশ্চিমারা ভীত হয়ে উঠেছিল। ইউরোপ ও আমেরিকায় এক পবিত্র মূল্যে পরিণত হওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার আদর্শের লঙ্ঘন ছিল এটা। কিন্তু পশ্চিমারা এটাও লক্ষ করতে বাধ্য হয়েছিল যে খোমেনি কখনওই ইরানি জনগণকে, বিশেষ করে বাজারি, মাদ্রাসা ছাত্র, অল্প-পরিচিত উলেমা ও দরিদ্রদের ভুলে যাননি।১৬ শাহর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় এদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, এরা আধুনিক রীতিনীত উপলব্ধি করতে পারেনি। পাশ্চাত্য সেক্যুলারিস্টরা যেখানে ঐতিহ্য অগ্রাহ্য করাকে প্রোমিথিয়ান ও বীরত্বসূচক মনে করতে শিখেছে, খোমেনির অনুসারীরা সেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকেই সর্বোচ্চ মুল্যবিশিষ্ট হিসাবে দেখে আসছিল; তারা ব্যক্তির অধিকারকে পরম মনে করেনি। খোমেনিকে বুঝতে পারলেও পশ্চিমকে বুঝতে পারেনি তারা। তখনও ধর্মীয়, প্রাক আধুনিক ঢঙে কথা বলেছে, ভেবেছে, পশ্চিমারা যা বুঝতে পারেনি। কিন্তু নিজেকে পোপিয় আবহ দিচ্ছিলেন না খোমেনি। তিনি জোর দিচ্ছিলেন যে, তাঁর ‘ভ্রান্তিহীনতা’র মানে এই নয় যে তিনি ভুল করেন না। তিনি তাঁর প্রতিটি কথাকেই ঐশী অনুপ্রাণিত বাণী ভেবে বসা শিষ্যের প্রতি বিরক্ত বোধ করেছেন। ‘আমি গতকাল এমন কিছু বলে থাকতে পারি, যেটা আজ বদলে ফেলেছি, আবার কালও বদলে ফেলব,’ ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ানের যাজকদের উদ্দেশে বলেছিলেন তিনি। ‘এর মানে এই নয় যে গতকাল আমি একটা বিবৃতি দিয়েছিলাম বলেই একে ধরে বসে থাকতে হবে। ১৭
তাসত্ত্বেও ‘অভিব্যক্তির ঐক্য’ ছিল সীমাবদ্ধ, কেউ কেউ বলবেন, ইসলামের বিকৃতিও। ইহুদি ও ক্রিশ্চান মৌলবাদীরাও অনেক সময় কঠোরভাবে—কেবল ধর্ম সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই সঠিক বলে তাদের নিজস্ব ঢঙে গোঁড়া সমরূপতার উপর জোর দিয়েছে। খোমেনির ‘অভিব্যক্তির ঐক্য’ ইসলামের আবিশ্যিক বিষয়গুলোকে মতাদর্শের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে; খোমেনির নিজস্ব তত্ত্বকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিয়ে স্বর্গীয় সত্যি সংক্রান্ত নেহাতই মানবীয় ধারণাকে পরম মর্যাদা দান করে বহুঈশ্বরবাদীতার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু খোমেনির বিপদাশঙ্কা থেকেও এর সৃষ্টি হয়েছিল। বছরে পর বছর ধর্মের প্রতি ধ্বংসাত্মক এক আগ্রাসী সেক্যুরাইজড শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিলেন তিনি; সাদ্দামের বিরুদ্ধে লড়তে হাচ্ছিল তাঁকে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি বহির্বিশ্বেও চরম বৈরিতার ব্যপারে তীক্ষ্ণভাবে সজাগ ছিলেন। ‘অভিব্যক্তির ঐক্য’ ছিল আত্মরক্ষামূলক উপায়। ইরানকে আরও একবার ইসলামী দেশে পরিণত করে খোমেনি ইসলামকে ধ্বংস করতে উদ্দত এক খোদাহীন বিশ্বে একটা নতুন বিরাট ছিটমহল সৃষ্টি করছিলেন। দমননীতির অভিজ্ঞতা, অনুমিত বিপদ এবং ক্রমবর্ধমান সেক্যুলার বিশ্বের মূল অস্তিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করার ধারণা যুদ্ধংদেহী আধ্যাত্মিকতার সৃষ্টি করেছে এবং ইসলামের বিকৃত ছবি তৈরি করেছে। দমনের অভিজ্ঞতা ছিল ভীতিকর, ফলে নিপীড়ক ধর্মীয় দর্শনের সৃষ্টি হয়েছে।
খোমেনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, বিপ্লব আধুনিক বিশ্বের যৌক্তিক বাস্তববাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল। লোকে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, দুজ্ঞেয় লক্ষ্য বিশিষ্ট একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে প্রাণ উৎসর্গ করতে রাজি আছে তারা। ‘একটি উন্নত আবাস পেতে কেউ কি তার সন্তানকে শহীদ হওয়ার পথে ঠেলে দিতে রাজি আছে?’ ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে কারুশিল্পীদের এক সমাবশে প্রশ্ন রেখেছিলেন তিনি। ‘এটা কোনও ইস্যু নয়। ইস্যু হচ্ছে অন্য জগৎ। শাহাদৎ মানেই ভিন্ন জগতের জন্যে। আল্লাহ’র সকল পয়গম্বর ও সাধুই এই শাহাদৎ কামনা করে এসেছেন…জাতিও এই অর্থ চায়।’১৮ বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ জীবনের পরম অর্থ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এটা সব সময়ই মিথের এখতিয়ার ছিল। পশ্চিমে মিথলজির পরিত্যাগ কোনও কোনও মহলে এক অনুমিত শূন্যতার জন্ম দিয়েছে, সার্ত্র যাকে ঈশ্বর আকৃতির গহ্বর হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বহু ইরানি তাদের দৈনন্দিন ও রাজনৈতিক জীবনে আকস্মিক অন্তর্মুখীনতায় দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। খোমেনি বিশ্বাস করেছিলেন, মানুষ তিনমাত্রার প্রাণী; তাদের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত চাহিদা রয়েছে, এবং ধর্মকে কেন্দ্রিয় পরিচয়ে পরিণতকারী একটি রাষ্ট্রের পক্ষে প্রাণ উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রদর্শন করে তাদের সম্পূর্ণ মানবিক পরিচয় উদ্ধারের প্রয়াস পাচ্ছিল তারা। স্বয়ং খোমেনি এমনকি সংকটের কালেও রাজনীতির দুর্জ্জেয় বৈশিষ্ট্য খুব কমই বিস্মৃত হতেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বানি সদর সাবেক শাহর সামরিক কর্মচারীদের কারাগার থেকে মুক্ত করে সরাসরি অপারেশনে পাঠানো ফলদায়ী হতে পারে বলে পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রত্যাখ্যান করেছেন খোমেনি। তিনি বলেছিলেন, বিপ্লব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা আঞ্চলিক অখণ্ডতা সংক্রান্ত ছিল না। তিনি ইমাম আলির শাসনের বিরোধিতাকারী সিরিয়ায় উমাঈয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধকালীন একটি গল্প বলেছিলেন। সেনাবাহিনী যুদ্ধে রওয়ানা দেওয়ার ঠিক আগে আলি সৈনিকদের উদ্দেশে স্বর্গীয় একত্ব (তাওহিদ) সম্পর্কে ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর কর্মকর্তারা এমন একটা সময়ে এই ধরনের বয়ান উপযুক্ত কিনা জানতে চাইলে আলি জবাব দিয়েছিলেন: ‘কোনও পার্থিব লাভালাভের জন্যে নয়, বরং এই কারণেই আমরা মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করছি।২০ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা, যাকে অবশ্যই ঈশ্বরের একত্বের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। মুসলিমরা তাওহিদের জন্যে যুদ্ধ করছিল, সিরিয়া জয় করার জন্যে নয়।
