প্রকৃতপক্ষেই এই ধরনের জিম্মি আটক বন্দিদের প্রতি আচরণের নির্দিষ্ট ইসলামি আইনের লঙ্ঘন করে। কোরান দাবি করে, মুসলিমদের প্রতিপক্ষের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। এখানে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, নিয়মিত যুদ্ধ ছাড়া বন্দি আটক (যা স্বয়ং আমেরিকান জিম্মি আটক ও তাদের বন্দি রাখা প্রত্যাখ্যান করে) বেআইনি। বন্দিদের সাথে অবশ্যই দুর্ব্যবহার করা যাবে না, বৈরিতা শেষ হয়ে যাবার পর তাদের হয় দয়া প্রদর্শন করে বা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিতে হবে। কোনও মুক্তিপণ না মিললে বন্দিকে কাজের সন্ধান করার সুযোগ দিয়ে ছেড়ে দিতে হবে যাতে সে নিজেই সেই অর্থ মেটাতে পারে; তাকে যে মুসলিমের হেফাযতে দেওয়া হয়েছে তাকে অবশ্যই বন্দিকে সেই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহে সাহায্য করতে হবে।’ বন্দিদের প্রতি এই আচরণ সংক্রান্ত একটি হাদিস খোদ পয়গম্বরের প্রতি নির্দেশ করে। ‘তোমরা যা খাবে তাকেও তাই খেতে দিতে হবে, একই রকম পোশাক পরতে দিতে হবে, কোনও কঠিন কাজ করতে দিলে তাদের সেই কাজে সাহায্য করতে হবে।” স্বৈরাচারী সরকারের হাতে তার বাস্তবভিত্তিক কারণে বিদেশের মাটিতে নির্বাসিত শিয়া ইমামদের শ্রদ্ধাকারী শিয়াদের কাছে জিম্মি আটক বিশেষভাবে নিন্দনীয় হওয়া উচিত। এভাবে জিম্মি আটক রাজনৈতিকভাবে হয়তো অর্থপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ধর্মীয় বা ইসলামির কোনওটাই নয়।
মৌলবাদ একটি যুদ্ধংদেহী বিশ্বাস, নিজেকে বৈরী পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে যুদ্ধে লিপ্ত মনে করে। এটা দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্ষতিগ্রস্ত ও অনেক সময় বিকৃত করে। আমরা যেমন দেখেছি, খোমেনি বহু মৌলবাদীকে আক্রান্তকারী এমনই বিকৃত ফ্যান্টাসিতে ভুগেছেন। ২০শে নভেম্বর, ১৯৭৯, জিম্মিদের আটক করার অল্প পরে, বেশ কয়েক শো সৌদি আরবের সুন্নি সশস্ত্র মৌলবাদী মক্কার কাবাহ দখল করে নেয় এবং তাদের নেতাকে মাহাদী ঘোষণা করে। খোমেনি এই অপবিত্রকরণের নিন্দা করে একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যোগসাজশের ফল বলে বর্ণনা করেছেন। সাধারণত লোকে যখন বিপদাপন্ন বোধ করে তখনই এই ধরনের ষড়যন্ত্রের ধারণা দেখা দেয়। ইরানের ভবিষ্যৎ ভাবনা ছিল ম্লান। খোমেনির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান হারে সরকারের বিরুদ্ধে মোহমুক্তি ঘটছিল। সরকারের কোনও রকম সমালোচনা বা বিরোধিতাই সহ্য করা হচ্ছিল না। ১৯৮১ সালে খোমেনির সাথে অন্য প্রধান আয়াতোল্লাহদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে; একদিকে শরীয়া আইনে সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন আকাঙ্ক্ষী রেডিক্যাল ইসলামিস্ট ও অন্যদিকে বামপন্থী সেক্যুলারিস্ট ও সাধারণদের ভেতর কার্যত যুদ্ধ চলছিল। মাত্ৰ এক বছর প্রেসিডেন্ট থাকার পর বানি সদর ২২শে জুলাই, ১৯৮১ উৎখাত হন; প্যারিসে পালিয়ে যান তিনি। ২৮শে জুন খোমেনির প্রধান যাজকীয় মিত্র আয়াতোল্লাহ বিহিশতি এবং ইসলামি বিপ্লবী দলের পঁচাত্তর জন সদস্য দলীয় হেডকোয়ার্টারে এক বোমা বিস্ফোরণে নিহন হন।১১ এই পর্যায় অবধি খোমেনি সাধারণদের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব দিতে পছন্দ করেছেন, কিন্তু অক্টোবরে হুজ্জাত উল-ইসলাম আলি খামেনিকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুমোদন দেন তিনি। মজলিসে যাজকরা এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন। ১৯৮৩ সাল নাগাদ সরকারের সকল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা হয়। বানি সদরের বিদায়ের পর মুজাহিদিন-ই খালক আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল; ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (মুসাদ্দিকের নাতির নেতৃত্বাধীন) এবং শরিয়তমাদারির মুসলিম পিপল’স রিপাবলিকান পার্টি ভেঙে দেওয়া হয়। খোমেনি ক্রমবর্ধমানহারে ‘অভিব্যক্তির সমরূপতা’র উপর জোর দিচ্ছিলেন।১২
কোনও একটি বিপ্লবের পর প্রায়শঃই যেমন ঘটে, নতুন শাসকগোষ্ঠী আগেরটির মতোই স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষের ঘেরাও অবস্থায় আদর্শিক সমরূপতার উপর জোর দিতে শুরু করেছিলেন খোমেনি। কিন্তু ইসলামি পরিভাষায় এটা ছিল এক নতুন বিচ্যুতি। ইহুদিবাদের মতো ইসলাম অনুশীলনের সমরূপতার দাবি করলেও কখনওই মতবাদগত অর্থডক্সির কথা বলেনি। শিয়াদের একজন মুজতাহিদের ধর্মীয় আচরণের অনুকরণ (তাকলিদ) করার কথা ছিল, কিন্তু তাঁর বিশ্বাসের সাথে একমত পোষণ করার কথা ছিল না তাদের। কিন্তু এখন খোমেনি জোরের সাথে ইরানিদের তাঁর বেলায়েত-ই ফাকিহ মেনে নিতে ও সব ধরনের বিরোধিতা ভুলে যাবার কথা বলছিলেন। ‘অভিব্যক্তির ঐক্য’, ১৯৭৯ সালে হাজ্জ যাত্রীদের উদ্দেশে বলেছিলেন তিনি, ‘বিজয়ের আসল রহস্য।১৩ সঠিক আদর্শ বেছে না নেওয়া পর্যন্ত জনগণ তিনি তাদের জন্যে যেমন আধ্যাত্মিক সম্পূর্ণতা আশা করছেন সেটা অর্জন করা সম্ভব হবে না। মতামতের প্রশ্নে কোনও গণতন্ত্র থাকবে না; জনগণকে অবশ্যই প্রধান ফাকিহকে মেনে চলতে হবে, যাঁর অতীন্দ্রিয় যাত্রা তাঁকে ‘প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস’ যুগিয়েছে। তখনই তারা ইমামদের পথে চলতে পারবে।১৪ কিন্তু এর অর্থ স্বৈরাচার ছিল না। বৈরী বিশ্বে টিকতে হলে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ‘ইসলাম আজ শত্রু ও ব্লাসফেমির মুখোমুখি,’ আযেরবাইযানের এক প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন তিনি। ‘আমাদের প্রয়োজন ক্ষমতা। মহান ও প্রশংসিত আল্লাহ’র শরণাপন্ন হয়ে এবং অভিব্যক্তির ঐক্যের ভেতর দিয়ে ক্ষমতা লাভ করা যেতে পারে।১৫ পরাশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চাইলে মুসলিমদের অন্তর্কলহে লেগে থাকলে চলবে না। আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ার কারণে দীর্ঘদিন ‘দুই জাতিতে’ বিভক্ত ইরানকে ঐক্যবদ্ধ ও ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
