খোমেনির চোখে জিম্মিরা ছিলেন দৈববর। বাইরের শত্রু মহাশয়তানের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে, তাদের আটক ও বিপ্লব উত্তর আমেরিকার প্রতি জন্মানো ঘৃণা এক অভ্যন্তরীণ দুষ্কালে ইরানিদের খোমেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। বাযারগানের বিদায় এক নিমেষে খসড়া সংবিধানের সবচেয়ে উচ্চকিত বিরোধীর মুছে দিয়েছিল ও বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করেছে। যথারীতি ডিসেম্বরের রেফারেন্ডামে লক্ষণীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সংবিধান পাস হয়। খোমেনি জিম্মি সংকটকে স্রেফ নিজের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির আলোকেই বিবেচনা করেছিলেন। গোড়াতে বানি সদরের কাছে যেমন ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি:
তৎপরতার বহু সুবিধা রয়েছে। অমেরিকানরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্ব লাভ দেখতে চায় না। জিম্মিদের আটক রেখে নিজেদের অভ্যন্তরীণ কাজ শেষ করব আমরা, তারপর ছেড়ে দেব ওদের। এটা আমাদের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। বিরোধীরা আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করার সাহস পাবে না। কোনও ঝামেলা ছাড়াই আমরা সংবিধানকে জনগণের সামনে ভোটের জন্যে তুলে ধরতে পারব, প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠান করা যাবে। আমরা এইসব কাজ শেষ করার পরই জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া যাবে।৪
খোমেনির জ্বলাময়ী বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও এটা ইসলামের মিথোসের বাতলে দেওয়া নীতি ছিল না, বরং এক ধরনের বাস্তবভিত্তিক লোগোস। তাসত্ত্বেও সঙ্কট খোমেনির নিজস্ব প্রোফাইলও বদলে দিয়েছিল। একজন বাস্তববাদী রাজনীতিক হয়ে থাকার বদলে তাঁর নিজের দৃষ্টিতেই পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে উম্মাহর সংগ্রামে নেতায় পরিণত হয়েছিলেন তিনি; ‘বিপ্লব’ শব্দটি তাঁর ভাষণে প্রচলিত ইসলামি পরিভাষার অনুরূপ প্রায় পবিত্র মূল্য লাভ করেছিল: একমাত্র তিনিই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখেন এবং এর শক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। একই সময়ে সারা বিশ্বে সঙ্কটের ফলে ইরান ও ইসলাম সম্পর্কে অস্বাভাবিকভাবে নয়া ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ায় খোমেনিকে ভেতরের বাইরের প্রতিপক্ষের হুমকির মুখে বিপ্লবের নাজুকতা সম্পর্কে ঢের বেশি সজাগ করে তুলেছিল। ১৯৮০ সালের মে মাসের শেষের দিকে ও জুলাই মাসের মাঝামাঝি সরকারের বিরুদ্ধে চারটি ভিন্ন ভিন্ন অভ্যুত্থান উন্মোচিত হয়েছিল এবং বছরের শেষ পর্যন্ত সেক্যুলারিস্ট গেরিলা ও খোমেনির বিপ্লবী গার্ডদের ভেতর অবিরাম যুদ্ধ বজায় ছিল। এই দিনগুলোর বিভ্রান্তি ও ভীতি সারা ইরান জুড়ে তথাকথিত বিপ্লবী কাউন্সিলের গজিয়ে ওঠার ভেতর দিয়ে আরও প্রবল হয়ে উঠেছিল, সরকার এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। এইসব কোমিতেহ বেশ্যাবৃত্তি বা পাহলভীদের অধীনে বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত থাকার মতো ‘অনৈসলামিক আচরণ’-এর অপরাধে শত শত লোককে হত্যা করে। একটি কেন্দ্রিয় শক্তির পতনের পর এই ধরনের স্থানীয় সংস্থার আবির্ভাব সমাজকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত বিপ্লবের সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য বলেই মনে হয়। খোমেনি এই কোমিতেহগুলোর বাড়াবাড়ির নিন্দা করেছেন, এসবকে ইসলামি আইনের পরিপন্থী ও বিপ্লবের সত্যতা বিনষ্টকারী ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সেগুলোকে ভেঙে তো দেনইনি বরং শেষ পর্যন্ত নিজের আনুকূল্যে এনে নিয়ন্ত্রণ করেছেন ও তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের সমর্থকে পরিণত করেছেন।o ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরও মোকাবিলা করতে হয়েছিল খোমেনিকে। ২০শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮০ ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনের বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে হামলা করে। এর মানে, খোমেনি সূচিত সামাজিক সংস্কার কর্মসূচি স্থগিত রাখতে হয়েছিল। এই সময় জুড়ে আমেরিকান জিম্মি একটা উদ্দেশ্য পূরণ করেছে। কেবল প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পরই ১৯৮১ সালের ২০শে জানুয়ারি (নতুন মার্কিন প্রেসডিন্ট রোনাল্ড রেগানের ক্ষমতা গ্রহণের দিন) তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
অবশ্য জিম্মিদের দুর্ভোগ অনিবার্যভাবে নয়া ইসলমি প্রজাতন্ত্রের ইমেজকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সঙ্কটের সময় মহাশয়তানের বিপুল পাপাচার নিয়ে বড় বড় বুলি সত্ত্বেও এই জিম্মি আটকের ভেতর ধর্মীয় বা ইসলামি কিছু ছিল না। বরং উল্টো। জিম্মি আটকের বিষয়টি সকল ইরানির ভেতর জনপ্রিয় না নাহলেও অনেকেই এর প্রতীকীবাদ উপলব্ধি করতে পেরেছিল। দূতাবাসকে কোনও বিদেশী দেশের এলাকা মনে করা হয়, এভাবে ছাত্রদের দখলদারি ছিল আমেরিকার সার্বভৌমত্বের উপর আগ্রাসনের মতো। কিন্তু তাসত্ত্বেও অনেকের চোখে ইরানের দূতাবাসে আমেরিকার নাগরিকদের আটকে রাখার ব্যাপারটি জুৎসই মনে হওয়ার কারণ অনেক দশক ধরে ইরানিরা মনে করে এসেছে যে পাহলভী স্বৈরাচারকে সমর্থন দিয়ে আসা দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচণাতেই নিজ দেশে কারাবন্দি ছিল তারা। কিন্তু ধর্ম নয়, এটা ছিল প্রতিশোধের রাজনীতি। দখলের গোড়ার দিনগুলোতে জিম্মেদের কারও কারও হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল, তাদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিত্যাগ করেছে বলে জানানো হয়েছে। পরে জিম্মিদের আরও আরামদায়ক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু এই ধরনের নিষ্ঠুরতা ও দুর্ব্যবহার ইসলামসহ সকল প্রধান কনফেশনাল ধর্মের মৌল দর্শনের বিরোধিতা করে: বাস্তব দয়ার দিকে চালিত না হলে কোনও ধর্মীয় মতবাদ বা অনুশীলন খাঁটি হতে পারে না। বৌদ্ধ, হিন্দু, তাওবাদী ও সকল একেশ্বরবাদী বিশ্বাস একমত পোষণ করে যে পবিত্র বাস্তবতা স্রেফ দুর্জয়, ‘দূর আকাশে’ নয় বরং তিনি প্রতিটি মানুষের অন্তরে বাস করেন; সুতরাং তাকে পরম সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে দেখতে হবে। মৌলবাদী বিশ্বাস, তা সে ইহুদি, ক্রিশ্চান বা মুসলিমই হোক, ক্রোধ ও ঘৃণার ধর্মতত্ত্বে পরিণত হলে এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না।
