খসড়া সংবিধানের বিরোধী পক্ষ শক্তিশালী ছিল। বামপন্থী গেরিলা আন্দোলনগুলো, ইরানের অভ্যন্তরের জাতিগত সংখ্যালঘু ও প্রভাবশালী মুসলিম পিপল’স রিপাবলিকান পার্টি (আয়াতোল্লাহ শরিয়তমাদারি প্রতিষ্ঠিত) প্রবলভাবে এর বিরুদ্ধে ছিল। উদারপন্থী ও পাশ্চাত্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমবর্ধমানহারে তাদের চোখে নতুন সরকারের ধর্মীয় বাড়াবাড়ির কারণে হতাশ হয়ে পড়ছিল: সাবেক শাহর স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করে এবার ইসলামি স্বৈরতন্ত্রের কব্জায় পড়তে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল তাদের কাছে। তারা লক্ষ করেছিল, খসড়া সংবিধানে কেবল ইসলামি আইন ও রেওয়াজকে লঙ্ঘন না করার ক্ষেত্রেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীনতা (যার জন্যে উদারপন্থীরা পাহলভীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল) নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বাযারগান বিশেষভাবে স্পষ্টবক্তা ছিলেন। সরাসরি খোমেনিকে আক্রমণ না করার ব্যাপারে সবসময়ই সতর্ক ছিলেন তিনি, তবে ইসলামি বিপ্লবী দলে, তাঁর দাবি অনুযায়ী ইসলামি বিপ্লবের গোটা লক্ষ্যকেই লঙ্ঘনকারী প্রস্তাবিত সংবিধানিক ধারাসমূহের জন্যে দায়ী, তাঁর ভাষায়, প্রতিক্রিয়াশীল যাজকদের বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর ছিলেন।
সঙ্কটের মুখে পড়েছিলেন খোমেনি। ৩রা ডিসেম্বর, ১৯৭৯, এক জাতীয় গণভোটে খসড়া সংবিধানের উপর জনগণের ভোট দানের তারিখ স্থির হয়েছিল। বেলায়েত-ই ফাকিহ পরাস্ত হতে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছিল। এই পর্যন্ত খোমেনি ছিলেন বাস্তববাদী; পাহলভী সরকারকে উৎখাত করার জন্যে নিপুণভাবে বামপন্থী, ইসলামপন্থী, বুদ্ধিজীবী, জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থীদের কোয়ালিশনকে সামাল দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালের শেষ নাগাদ এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে পরিচালিত বিভিন্ন গ্রুপের এই অসম মৈত্রী ভেঙে যেতে বসেছে এবং বিপ্লবের ভবিষ্যৎ-তিনি স্বয়ং বুঝতে পারছিলেন সেটা-বিপদাপন্ন। তখন অজ্ঞাতসারে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মহাশয়তান হিসাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও তেহরানের নতুন ইসলামি সরকারের সম্পর্ক সতর্ক হলেও সঠিক ছিল। ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯, খোমেনির ইরানে ফিরে আসার অল্প পরেই ছাত্ররা রাজধানীর আমেরিকান দূতাবাসে আক্রমণ চালিয়ে দখল করে নেওয়ার প্রয়াস পায়, কিন্তু খোমেনি ও বাযারগান দ্রুত অনুপ্রবেশকারীদের বহিষ্কারের পদক্ষেপ নেন। তা সত্ত্বেও মহাশয়তান সম্পর্কে আস্থাহীন ছিলেন খোমেনি, আমেরিকা বিনা যুদ্ধে ইরানে তার স্বার্থ ছেড়ে দেবে, এটা বিশ্বাস করতে পারেননি। আমরা অধিকাংশ মৌলবাদীদের যে বৈকল্যে তাড়িত হতে দেখি, সেই একই কারণে খোমেনি বিশ্বাস করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্রেফ উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করছে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৫৩ সালের মুসাদ্দিককে উৎখাত করার মতোই নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে হুমকি দেবে। ২২শে অক্টোবর, ১৯৭৯ মরণব্যধি ক্যান্সারের চিকিৎসা গ্রহণের জন্যে শাহ নিউ ইয়র্ক সিটিতে গেলে খোমেনির সন্দেহ যেন নিশ্চিত হয়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ও তেহরানের তরফ থেকে সাবেক শাহকে প্রবেশাধিকার না দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হলেও কার্টারের বিশ্বাস ছিল যে, এই মানবিক সেবার ক্ষেত্রে সাবেক এই অনুগত মিত্রকে তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না।
সাথে সাথে মহাশয়তানের বিরুদ্ধে খোমেনির বাগাড়ম্বর আরও জ্বলাময়ী হয়ে ওঠে। শাস্তি প্রদানের জন্যে রেযা শাহকে ইরানে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করেন তিনি, সাবেক সরকারের অনুগত সকল কর্মচারীকে ছাঁটাইয়ের আহ্বান জানান। খোদ ইসলামি ইরানের অভ্যন্তরেই পশ্চিমের উপর নির্ভরশীল বিশ্বাসঘাতকদের ঘাপটি মেরে থাকার ঘোষণা দেন তিনি, তাদের অবশ্যই জাতির ভেতর থেকে বহিষ্কার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বাযারগান এবং সেই সাথে খসড়া সংবিধানের অন্য বিরোধীরাই যে এই আক্রমণের লক্ষ্য ছিলেন সেটা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। ১লা নভেম্বর বিমান যোগে আলজেরিয় স্বাধীনতার বার্ষিকীতে যোগ দিতে গিয়ে কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা গনিউ ব্রেনিস্কির সাথে করমর্দনরত অবস্থায় ছবি তোলায় খোমেনির চালে হেরে যান বাযারগান। ইসলামি বিপ্লবী দলে তাঁর প্রতিপক্ষ বাযারগানকে আনেন্দের সাথে আমেরিকান এজেন্ট হিসাবে গালমন্দ করতে শুরু করে। এমনি উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ৪ঠা নভেম্বর প্রায় তিন হাজার ইরানি ছাত্র তেহরানে আমেরিকান দূতাবাসে আক্রমণ চালিয়ে নব্বইজনকে জিম্মি হিসাবে আটক করে। প্রথমে খোমেনি অচিরেই তাদের মুক্তি নিশ্চিত করবেন এবং আগের মতো ছাত্রদের প্রত্যাহারের নির্দেশ দেবেন বলে মনে হয়েছিল। খোমেনি ছাত্রদের দূতাবাসে হামলার বিষয়টি আগে থেকে জানতেন কিনা আজও তা স্পষ্ট নয়। সে যাই হোক, প্রায় তিনদিন নীরব ছিলেন তিনি। কিন্তু বাযারগান যখন বুঝতে পারলেন, দূতাবাস মুক্ত করার জন্যে খোমেনির সমর্থন পাচ্ছেন না, নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে ৬ই নভেম্বর বিদেশমন্ত্রী ইব্রাহিম ইয়াযদিসহ পদত্যাগ করলেন তিনি। মাত্র কয়েক দিন আটক রাখার উদ্দেশ্য থাকলেও ছাত্ররা অবাক হয়ে উপলব্ধি করেছিল যে আসলে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর এক প্রধান বিরোধ জন্ম দিয়েছে তারা। খোমেনি ও ইসলামি বিপ্লবী প্রজাতন্ত্র ছাত্রদের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন। বিশ্বজুড়ে জিম্মি নাটকের ব্যাপক প্রচার খোমেনিকে এক নতুন নিশ্চয়তা দেয়। মহিলা জিম্মি ও কৃষ্ণাঙ্গ মেরিন গার্ডদের মুক্তি দেওয়া হলেও বাকি বাহান্নজন আমেরিকান কূটনীতিককে ৪৪৪ দিন বন্দি করে রাখা হয় এবং ইরানি রেডিক্যালিজমের প্রতীকে পরিণত হয় এই ঘটনা।
