র্যাবাইরা প্রাদোকে সমাজচ্যুত করার সময়ই বারুচ স্পিনোযার বিরুদ্ধে বিচার কাজেরও সূচনা করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র তেইশ বছর। প্রাদোর বিপরীতে স্পিনোযা আমস্টারডামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। পর্তুগালে ইহুদি ধর্মপ্রচারকের জীবন যাপন করেছিলেন তাঁর বাবা-মা। আমস্টারডামে আসার পর তাঁরা অর্থডক্স ইহুদিবাদে ধর্মান্তরিত হতে পেরেছিলেন। ফলে স্পিনোযাকে কখনওই ধাওয়া বা নির্যাতনের শিকার হতে হয়নি। সব সময়ই উদার আমস্টারডামে বাস করেছেন তিনি, জেন্টাইল বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে যাতায়াত ছিল। বিনা বাধায় নিজ ধর্মবিশ্বাসের চর্চা করার সুযোগ ছিল। অসাধারণ কেতার তোরাহ স্কুলে প্রথাগত শিক্ষা লাভ করেন তিনি। তবে আধুনিক গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যায় পড়াশোনা করেছেন। ব্যবসা বাণিজ্যের জীবন স্থির হয়েছিল স্পিনোযার, তাঁকে নিবেদিতপ্রাণ ধার্মিক বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ১৬৫৫ সালে আমস্টাডামে প্রাদোর আগমনের অল্প পরেই আকস্মিকভাবে সিনাগগে প্রার্থনায় যাওয়া বন্ধ করে দেন তিনি, সন্দেহের কথাকে ভাষা দিতে শুরু করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বাইবেলের তিনি টেক্সটে স্ববিরোধিতা রয়েছে, তাই ঐশী উৎসের নয়, এটা মানব রচিত বলেই প্রমাণিত হয়। তিনি প্রত্যাদেশের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে যুক্তি দেখান যে ‘ঈশ্বর’ স্রেফ খোদ প্রকৃতির সামগ্রিকতা। শেষ পর্যন্ত ২৭শে জুলাই, ১৬৫৬ তারিখে র্যাবাইগণ স্পিনোযার বিরুদ্ধে সমাজচ্যুতির ফরমান জারি করেন। প্রাদোর বিপরীতে স্পিনোযা সমাজে থাকার অনুরোধ জানাননি। চলে যেতে পেরে খুশি ছিলেন, ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত ধর্মের আওতার বাইরে সফলভাবে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনকারী প্রথম ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি।
প্রাদো বা দা কোস্তার চেয়ে স্পিনোযার পক্ষে জেন্টাইল বিশ্বে বেঁচে থাকা অনেকাংশে সহজতর ছিল। মেধাবী ছিলেন তিনি, পরিষ্কারভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারতেন এবং প্রকৃত স্বাধীন মানুষ হিসাবে এর সাথে সম্পর্কিত অনিবার্য নৈঃসঙ্গকে ধারণ করতে পেরেছেন। নেদারল্যান্ডসে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি, ক্ষমতাশালী পৃষ্ঠপোষকগণ তাঁকে যুক্তিসঙ্গত রেয়াত দিয়েছেন। ফলে হতদরিদ্র অবস্থায় জীবন কাটাতে হয়নি তাঁকে। প্রায়শঃ যেমন মনে করা হয়, স্পিনোযা বেঁচে থাকার তাগিদে লেন্স ঘঁষতে বাধ্য হননি, বরং অপটিক্সে নিজের কৌতূহল নিবৃত্ত করতেই একাজ করেছিলেন। তখনকার সময়ের বেশ কয়েকজন নেতৃত্বস্থানীয় জেন্টাইল বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু তারপরেও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি রয়ে গিয়েছিলেন। ইহুদি ও জেন্টাইলরা সমানভাবে তাঁর ধর্মহীনতাকে হয় ভয়ঙ্কর বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাবে আবিষ্কার করেছে। ৩৭
কিন্তু তাসত্ত্বেও স্পিনোযার নাস্তিক্যবাদে আধ্যাত্মিকতা ছিল, কারণ জগৎকে তিনি ঐশী ভাবতেন। জাগতিক বাস্তবতায় ব্যাপ্ত ঈশ্বরের একটা ছবিই স্পিনোযাকে বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় পূর্ণ করে রেখেছিল। শর্ট ট্রিটাইজ অন গড-এ (১৬৬১) যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, দার্শনিক গবেষণা ও চিন্তাভাবনাকে এক ধরনের প্রার্থনা মনে করতেন তিনি। এই উপাস্য জানবার মতো কোনও বস্তু নন, বরং আমাদের ভাবনার নীতি। এ থেকে অগ্রসর হয়ে বলা হয়েছে, আমরা যখন জ্ঞান অর্জন করে আনন্দ বোধ করি সেটা ঈশ্বরের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক ভালোবাসা মাত্র। প্রকৃত দার্শনিক, স্পিনোযা বিশ্বাস করতেন, তিনি যাকে স্বজ্ঞামূলক জ্ঞান বলেছেন, তার চর্চা করবেন, অন্তর্দৃষ্টির একটা ঝলক আলোচনার ভেতর দিয়ে সংগ্রহ করা তার সমস্ত তথ্যকে সমন্বিত করবে, এবং এটা ছিল এমন এক অভিজ্ঞতা স্পিনোযা যাকে ঈশ্বর বলে বিশ্বাস করেছেন। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি বলেছেন ‘স্বর্গসুখ’ (বিটিচ্যুড): এই পর্যায়ে দার্শনিক বুঝতে পারেন যে তিনি ঈশ্বর হতে অবিচ্ছেদ্য ও মানুষের মাধ্যমেই ঈশ্বর অস্তিত্ববান। এটা ছিল অতীন্দ্রিয় দর্শন, জন অভ দ্য ক্রস ও তেরেসা অভ আভিলার চর্চিত আধ্যাত্মিকতার যৌক্তিক ভাষ্য হিসাবে দেখা যেতে পারত একে। কিন্তু এই ধরনের ধর্মীয় অন্তর্দৃষ্টির কোনও ফুরসত স্পিনোযার ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন একজন দুয়ে ঈশ্বরের আকাঙ্ক্ষা করতে গিয়ে মানুষ তার নিজ প্রকৃতি হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। পরবর্তী কালের দার্শনিকগণ স্পিনোযার স্বর্গসুখের পরমানন্দের অনুসন্ধানকে বিব্রতকর আবিষ্কার করে ঈশ্বরকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করবেন। তা সত্ত্বেও এ বিশ্ব জগতের প্রতি মনোসংযোগ ও অতিপ্রাকৃতকে অস্বীকার যাওয়ার ভেতর স্পিনোযা ইউরোপের অন্যতম প্ৰথম সেক্যুলারে পরিণত হয়েছিলেন।
অনেক আধুনিক মানুষের মতো স্পিনোযা সব ধরনের আনুষ্ঠানিক ধর্মকে বিতৃষ্ণার সাথে দেখতেন। তাঁর সমাজচ্যুতির অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে একে তেমন একটা বিস্ময়কর বলা যাবে না। প্রত্যাদিষ্ট ধর্মবিশ্বাসসমূহকে ‘বিশ্বাসপ্রবণতা ও কুসংস্কারের স্তূপ’ ও ‘অর্থহীন রহস্যের জটলা’ হিসাবে নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।৩৮ বাইবেলিয় টেক্সটে নিজেকে মগ্ন করে নয়, যুক্তির বাধাহীন ব্যবহারে আনন্দ লাভ করেছেন; ফলে ঐশীগ্রন্থসমূহকে তিনি সম্পূর্ণই বস্তুগত দৃষ্টিতে দেখেছেন। একে স্বর্গীয় প্রত্যাদেশ হিসাবে দেখার বদলে স্পিনোযা জোরের সাথে বলেছেন যে, বাইবেলকে অন্য যেকোনও টেক্সটের মতোই পড়তে হবে। বৈজ্ঞানিকভাবে বাইবেল পাঠকারীদের ভেতর তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি এর ঐতিহাসিক পটভূমি পরীক্ষা করেছেন, সাহিত্যিক ঘরানা পরখ করেছেন, ও রচয়িতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আপন রাজনৈতিক ধারণা পরখ করতেও বাইবেল ব্যবহার করেছেন। পাশ্চাত্য আধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হতে চলা ইউরোপের সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আদর্শ তুলে ধরা ব্যক্তিদের ভেতর অন্যতম ছিলেন স্পিনোযা। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, প্রিস্টরা ইসরায়েলের রাজার চেয়ে বেশি ক্ষমতা হাতে পাবার পর রাষ্ট্রের আইন-কানুন শাস্তিমূলক ও প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। আদিতে ইসরায়েল রাজ্য ধর্মতান্ত্রিক ছিল, কিন্তু স্পিনোযার দৃষ্টিভঙ্গিতে, ঈশ্বর ও সাধারণ জনগণ একই থাকায় মানুষের কণ্ঠস্বরই ছিল সার্বভৌম। পুরোহিতরা ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পর আর ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শোনা যায়নি৷ কিন্তু স্পিনোযা লোকানুবর্তী ছিলেন না। অধিকাংশ প্রাক আধুনিক দার্শনিকের মতোই অভিজাতবাদী ছিলেন তিনি, সাধারণ জনগণকে যৌক্তিক চিন্তাভাবনায় অক্ষম মনে করতেন। তাদের কোনও ধরনের আলোকন যোগাতে এক জাতীয় ধর্মের প্রয়োজন পড়বে, কিন্তু প্রত্যাদিষ্ট আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ববোধ ও উদারতার স্বাভাবিক নীতিমালার ভিত্তিতে এই ধর্মকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। ৪১
