সন্দেহাতীতভাবে স্পিনোযা ছিলেন আধুনিক চেতনার অন্যতম বাহক। পরবর্তী সময়ে সেক্যুলার ইহুদিদের এক ধরনের নায়কে পরিণত হবেন তিনি। ধর্ম থেকে নীতির ভিত্তিতে তাঁর যাত্রাকে তারা শ্রদ্ধা করেছে। কিন্তু জীবদ্দশায় স্পিনোযার কোনও ইহুদি অনুসারী ছিল না; যদিও এটা স্পষ্ট যে, বহু ইহুদিই তখন মৌলিক পরিবর্তনের জন্যে প্রস্তুত ছিল। মোটামুটি স্পিনোযার সেক্যুলার যুক্তিবাদ গড়ে তোলার সময়টিতেই এক মেসিয়ানিক উন্মাদনায় আক্রান্ত হয়েছিল ইহুদি জগৎ যুক্তিকে যা হাওয়ায় উড়িয়ে দেবে বলে মনে হয়েছে। আধুনিক কালের অন্যতম প্রথম মিলেনিয়াল আন্দোলন ছিল এটা, নারী-পুরুষকে পবিত্র অতীতের সাথে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে সম্পূর্ণ নতুন কিছুর দিকে অগ্রসর হতে ধর্মীয় উপায় যুগিয়েছিল। আমাদের কাহিনীতে প্রায়ই এটা লক্ষ করব আমরা। অল্প সংখ্যক লোকই আধুনিকতার সেক্যুলারিস্ট দর্শন উপস্থাপনকারী অভিজাত দার্শনিকদের বুঝতে সক্ষম ছিল। বেশির ভাগই ধর্মের উপর ভরসা করে নতুন বিশ্বে যাত্রা করেছিল, যা তাদের অতীতের সাথে এক ধরনের সান্ত্বনামূলক ধারাবাহিকতার বোধ দিয়েছে ও পৌরাণিক কাঠামোয় আধুনিক লোগোসকে ভিত্তি দিয়েছে।
এটা প্রতীয়মান যে, সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ অনেক ইহুদিই বিচ্ছিন্নতার একটা অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। আমস্টারডামের মারানো সম্প্রদায়ের মতো ইউরোপের আর কোনও ইহুদিই স্বাধীনতা ভোগ করেনি। স্পিনোযা জেন্টাইলদের সাথে মিশতে পেরেছিলেন ও নতুন বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই তাঁর রেডিক্যাল নতুন প্রস্থান সম্ভব হয়েছিল। ক্রিশ্চান জগতের অন্যান্য জায়গায় ইহুদিরা মূলধারার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ষোড়শ শতাব্দী নাগাদ কোনও ইহুদিই ‘ঘেটো’ নামে পরিচিত বিশেষ ইহুদি এলাকার বাইরে থাকতে পারত না। এর মানে ছিল ইহুদিদের অনিবার্যভাবে অন্তর্মুখী জীবন যাপন করতে হত। বিচ্ছিন্নতা অ্যান্টিসেমিটিক সংস্কার উস্কে দিয়েছিল। ইহুদিরা স্বভাবতই নিপীড়নকারী জেন্টাইল বিশ্বের বিরুদ্ধে তিক্ততা ও সন্দেহের মাধ্যমে সাড়া দিয়েছিল। ঘেটোগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ জগতে পরিণত হয়। ইহুদিদের নিজস্ব স্কুল, নিজস্ব সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব স্নানঘর, কবরস্থান ও কসাইখানা ছিল। ঘেটোগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও স্বপরিচালিত ছিল। নির্বাচিত র্যাবাই ও প্রবীনদের কেহিলা (গোষ্ঠীগত সরকার) ইহুদি আইন মোতাবেক নিজস্ব আদালত পরিচালনা করত। কার্যত ঘেটো ছিল রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র, পৃথিবীর ভেতরে আরেক পৃথিবী। বাইরের জেন্টাইল সমাজের সাথে ইহুদিদের যোগাযোগ ছিল-প্রায়শঃ তাদের সেই ইচ্ছাও ছিল কম। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় নাগাদ মনে হয় যে অনেকেই তাদের সীমাবদ্ধতায় বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। সাধারণত অস্বাস্থ্যকর, নোংরা এলাকায় ছিল ঘেটোগুলোর অবস্থান। উঁচু দেয়ালে ঘেরাও করা ছিল সেগুলো, যার মানে ছিল জনসংখ্যার আধিক্য, কিন্তু সীমানা সম্প্রসারণের কোনও সম্ভাবনা ছিল না। এমনকি রোম বা ভেনিসের অপেক্ষাকৃত বড় ঘেটোতেও বাগান করার মতোও কোনও জায়গা ছিল না। নিজেদের জন্যে জায়গা বাড়ানোর একটা উপায়ই ছিল ইহুদিদের: আগের দালানের উপর নতুন করে আরেক তলা নির্মাণ, এবং প্রায়শঃই সেটা অপর্যাপ্ত ফাউন্ডেশনের উপর, ফলে সবকিছু ধসে পড়ত। অগ্নিকাণ্ড ও রোগশোকের হুমকি ছিল সারাক্ষণ। ইহুদিদের ভিন্ন পোশাক পরতে বাধ্য করা হত। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মোকাবিলা করতে হয়েছে তাদের। প্রায়শঃই ফেরিঅলা বা দর্জির কাজই ছিল তাদের সামনে একমাত্র উন্মুক্ত পেশা। বৃহৎ আকারের কোনও বাণিজ্যিক উদ্যোগের অনুমতি ছিল না। ফলে জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ দানের উপর নির্ভর করে থাকত। সূর্যালোক ও প্রকৃতির সাথে সম্পর্করহিত ইহুদিরা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওরা মানসিকভাবেও বন্দি ছিল। ইউরোপের বিজ্ঞান ও শিল্পকলার সাথে তাদের কোনও যোগাযোগ ছিল না। ওদের নিজস্ব স্কুলগুলো ভালো ছিল, কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দীর পরে ক্রিশ্চান জগতের শিক্ষাকার্যক্রম আরও উদার হয়ে উঠছিল যখন, ইহুদিরা তখনও কেবল তোরাহ ও তালমুদে পাঠে মগ্ন ছিল। কেবল নিজস্ব টেক্সট ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে মগ্ন থাকায় ইহুদিদের শিক্ষায় চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। ৪২
ইসলামি বিশ্বের ইহুদিরা ক্রিশ্চান বিশ্বের ইহুদিদের মতো নিষেধাজ্ঞার অধীন ছিল না। জিম্মি’র (‘প্রতিরক্ষা প্রাপ্ত সংখ্যালঘু’) মর্যাদা পেয়েছিল তারা, যতক্ষণ ইসলামি রাষ্ট্রের আইন ও সার্বভৌমত্ব স্বীকার করছে ততক্ষণ এটা তাদের নাগরিক ও সামরিক প্রতিরক্ষা দিয়েছে। ইসলামের ইহুদিরা নির্যাতিত হয়নি; অ্যান্টি- সেমিটিজমের কোনও ঐতিহ্য ছিল না, জিম্মিরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হলেও পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল ওদের, নিজেদের আইন অনুযায়ী নিজস্ব কর্মকাণ্ড চালাতে পারত ওরা; ইউরোপের ইহুদিদের তুলনায় ঢের ভালোভাবে মূলধারার সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশ নিতে পারত। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ দেখাবে, এমনকি ইসলামি বিশ্বের ইহুদিরাও অস্থির হয়ে উঠছিল, আরও বৃহত্তর মুক্তির সন্ধান করছিল তারা। ১৪৯২ সাল থেকে ইউরোপে একের পর এক বিপর্যয়ের সংবাদ পাচ্ছিল তারা, তারপর ১৬৪৮ সালে পোল্যান্ডে ইহুদিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্যাতনের খবরে রীতিমতো সম্ভ্রন্ত ওঠে। বিংশ শতাব্দীর আগে আর যার কোনও তুলনা মিলবে না।
