দা কোস্তার ট্র্যাজিডি দেখায় যে, ইউরোপে তখনও পর্যন্ত ধর্মীয় জীবনের বিকল্প কোনও সেক্যুলার রীতির অস্তিত্ব ছিল না। আপনি অন্য ধর্ম গ্রহণ করতে পারতেন বটে, কিন্তু খুবই ব্যতিক্রমী মানুষ না হলে (দা কোস্তা যা ছিলেন না), ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাইরে টিকে থাকতে পারতেন না। সমাজচ্যুত থাকার বছরগুলোতে দা কোস্তা চরমভাবে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছেন, ইহুদি ও ক্রিশ্চানরা তাঁকে সমানভাবে বর্জন করেছিল, পথেঘাটে বাচ্চারা তাঁকে টিটকারী মারত।৩৫
কিছুটা কম করুণ হলেও মোটামুটি সমান বাঙ্ময় ছিল হুয়ান দা প্রাদোর ঘটনা। ১৬৫৫ সালে আমস্টারডামে আসেন তিনি। প্রায়ই দা কোস্তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা- ভাবনা করতেন। বিশ বছর পর্তুগালের গোপন ইহুদি সংগঠনের সদস্য ছিলেন তিনি, কিন্তু ধারণা করা হয়, ১৬৪৫ সালের দিকেই ডেইজমের মারানো ধরনের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন তিনি। মেধাবী বা পদ্ধতিগত চিন্তাবিদের কোনওটাই ছিলেন না প্রাদো। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, কেবল যুক্তির উপর নির্ভর করে ইহুদিবাদের মতো কনফেশনাল কোনও ধর্ম মেনে চলা অসম্ভব। উপাসনার জীবন, কাল্ট ও অতীন্দ্রিয় গুরুত্ববিহীন প্রাদো কেবল এই উপসংহারে উপনীত হতে পেরেছিলেন যে, ‘ঈশ্বর’ কেবল প্রকৃতির বিধানের অনুরূপ। তারপরেও আরও দশ বছর তিনি গোপন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর কাছে ‘ইহুদিধর্ম’ যেন বন্ধুবর্গের মতো; একটা নিবিড়ভাবে গঠিত দলে তাঁর দেখা নিবিড় বন্ধনের অভিজ্ঞতা যা তাঁর জীবনের অর্থ যোগান দিয়েছে, কারণ তিনি যখন আর্মস্টারডামে পৌঁছে সেখানকার র্যাবাইদের প্রতি বিরূপ ধারণা লাভ করেন, তারপরেও ইহুদি সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরেই থাকতে চেয়েছিলেন। দা কোস্তার মতো প্রাদো অনেক বছর নিজের চিন্তাভাবনার স্বাধীনতা ও পছন্দমতো উপাসনা করার অধিকার টিকিয়ে রেখেছিলেন। ‘ইহুদি ধর্ম’ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ধারণা ছিল। আসল ব্যাপারের মুখোমুখি হয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। জোরালভাবে আপত্তি তুলে ধরেছিলেন প্রাদো। ইহুদিরা কেন ভাবে যে ঈশ্বর কেবল তাদেরই বেছে নিয়েছেন? এই ঈশ্বর আসলে কী? ঈশ্বরকে বর্বরোচিত কাণ্ডজ্ঞানহীন কতগুলো আইন চাপিয়ে দেওয়া এক ব্যক্তি না ভেবে বরং প্রথম কারণ হিসাবে চিন্তা করাই কি অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত নয়? প্রাদো পরিণত হন বিব্রতকারীতে। র্যাবাইরা ইবারিয়া থেকে আগত নব্য ইহুদিদের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন (অনেকের সাথেই প্রাদোর ভাবনার মিল ছিল), তাঁর ডেইজম বরদাশত করতে পারছিলেন না তাঁরা। ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ১৬৫৭ তারিখে তাঁকে সমাজচ্যুত করা হয়; কিন্তু তারপরেও সমাজ ত্যাগে অস্বীকার গেছেন তিনি।
এটা ছিল সম্পূর্ণ সমন্বয়ের অতীত দুটো দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত। তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাদো ও র্যাবাইগণ, উভয়ই সঠিক ছিলেন। প্রচলিত ইহুদিবাদের কোনও অর্থ করতে পারেননি প্রাদো, মনের অতীন্দ্রিয় ছাঁচ হারিয়ে ফেলেছিলেন; কাল্ট ও আচারের মাধ্যমে ধর্মের গভীরতম অর্থ খুঁজে বের করার সুযোগ পাননি কোনওদিন। সব সময়ই তাঁকে যুক্তি ও নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টির উপর নির্ভর করতে হয়েছে; এখন আর তা পরিত্যাগ করতে পারেননি। তবে র্যাবাইরাও সঠিক ছিলেন। প্রাদোর ডেইজমের সাথে তাঁদের চেনা ইহুদিবাদের কোনও ধরনের সাথেই মিল ছিল না। প্রাদো একজন ‘সেক্যুলার ইহুদি’ হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে এই ধরনের কোনও কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। প্রাদো বা র্যাবাইদের কারও পক্ষেই একে সঠিকভাবে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। এটা ছিল একদিকে পুরোপুরিভাবে যৌক্তিক বিশ্বদৃষ্টি ও অন্যদিকে কাল্ট ও মিথে গড়ে ওঠা ধর্মীয় মানসিকতার সংঘাতের একটি ধারার প্রথমটি।
এইসব নীতিগত সংঘাতে প্রায়শঃ যেমন হয়, কোনও পক্ষই খুব ভালো আচরণ করেনি। উদ্ধত মানুষ ছিলেন প্রাদো, র্যাবাইদের প্রকাশ্যে গালি দিতেন। একবার তলোয়ার নিয়ে সিনাগগে তাঁদের উপর হামলে পড়ারও হুমকি দিয়েছিলেন। র্যাবাইরাও কম সম্মানের সাথে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। প্রাদোর পেছনে গুপ্তচর লাগিয়েছিলেন তাঁরা। এই গুপ্তচর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আরও রেডিক্যাল রূপ নেওয়ার খবর দিয়েছিল। সমাজচ্যুত হওয়ার পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ধর্ম হচ্ছে আবর্জনা; এবং তথাকথিত ‘প্রত্যাদেশ’ নয়, যুক্তিই হবে সব সময় সত্যের একক বিচারক। প্রাদো কীভাবে শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন সেটা কেউ জানে না। তাঁকে সমাজ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। অ্যান্টওয়ার্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। কেউ কেউ বলেন, তিনি এমনকি ক্যাথলিক চার্চের সাথে আপোসরফায় পৌঁছুনোর প্রয়াসও পেয়েছিলেন। তাই যদি হয়, তা ছিল মরিয়া পদক্ষেপ, যা আবারও দেখায় যে সপ্তদশ শতাব্দীতে একজন সাধারণ গঠনের মানুষের পক্ষে ধর্মের সীমানার বাইরে অবস্থান করা কতখানি অসম্ভব ছিল।৩৬
প্রাদো ও দা কোস্তা, এরা দুজনই ছিলেন আধুনিক চেতনার অগ্রদূত। তাঁদের কাহিনী দেখায়, কনফেশনাল ধর্মের মিথোস মনের অধিকতর স্বজ্ঞামূলক অংশের চর্চাকারী প্রার্থনা ও আচারের আধ্যাত্মিক অনুশীলন ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। কেবল যুক্তি দুর্বল ডেইজমের জন্ম দিতে পারে, অচিরেই যা প্রত্যাখ্যাত হয়, কারণ আমরা যখন বিষাদের মুখোমুখি হই বা বিপদে পড়ি তখন তা কোনও কাজে আসে না। প্রাদো ও দা কোস্তা বিশ্বাস হারিয়েছিলেন কারণ তাঁরা ধর্ম অনুশীলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু আমস্টারডামের আরেক মারানো ইহুদি দেখিয়েছেন যে খোদ যুক্তির অনুশীলনই এতটা আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক হয়ে উঠতে পারে যার ফলে মিথের প্রয়োজন কমে আসে। এই পৃথিবীই ধ্যনের একমাত্র বস্তুতে পরিণত হয়। এবং মানুষই, ঈশ্বর নন, সব বস্তুর মানদণ্ডে পরিণত হয়। কোনও ব্যতিক্রমী নারী বা পুরুষের মাঝে খোদ যুক্তি চর্চা এক ধরনের অতীন্দ্রিয় আলোকন এনে দিতে পারে। এটাও আধুনিক অভিজ্ঞতারই অংশ ছিল।
