টেক্সাসের বেলায় গাবলারদের বিপক্ষে লড়াইকারী উদারপন্থী সংগঠন পিপল ফর দ্য আমেরিকান ওয়ে যুক্তি দেখিয়েছিল, রক্ষণশীলরা এই ধরনের ১২৪টি বিরোধের ক্ষেত্রে মাত্র ৩৪টিতে জয় লাভ করেছে। উদারবাদীরা নিজস্ব সংগঠন তৈরি করে পাল্টা যুদ্ধ শুরু করছিল। সুতরাং, অগ্রগতি ছিল ধীর, এটা মৌলবাদীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল, তাদের ধারণা ছিল পরমানন্দ অত্যাসন্ন, এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ইতিহাসে সক্রিয়, আপন শক্তিতে ন্যায়পরায়ণদের রক্ষা করছেন। কোনও কোনও মৌলবাদী তাদের নেতারা বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন বলে বিশ্বাস করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮২ সারেল গর্ভপাতের পূর্ণ বিলুপ্তির দাবি করার বদলে জেরি ফলওয়েল এর প্রাপ্যতা সীমাবদ্ধ করার অধিকতর বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেন। প্রেসিডিন্ট নির্বাচনের প্রচারণাকালে প্যাট রবার্টসন মূলধারার বিভিন্ন গোষ্ঠী সম্পর্কে রয়েসয়ে শোভন বক্তব্য রাখেন, যদিও মৌলবাদী অর্থডক্সি দাবি করে যে ধর্মদ্রোহী চার্চগুলোকে প্রত্যেক সুযোগেই আক্রমণ করতে হবে।
প্রটেস্ট্যান্ট পুনর্জাগরণের গোড়ার দিকের এই বছরগুলোয় আধুনিক রাজনীতির সমঝোতা দাবি শিখেছিলেন ফলওয়েল ও রবার্টসন। গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ক্ষমতার জন্যে প্রতিযোগিতা দরকষাকষি ও প্রতিপক্ষের জন্য কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, সেখানে চরম নীতিমালা সফল হতে পারে না। বিশেষ কিছু নীতিকে অলঙ্ঘনীয় ও সেকারণে আপোসহীন বিবেচনাকারী কোনও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে এর সাথে তাল মেলানো কঠিন। মৌলবাদীরা প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হওয়া সেক্যুলার রাজনীতির বিশ্বে তারা পছন্দ করুক বা না করুক, কোনও কিছুই এভাবে পবিত্র নয়। যেকোনও ধরনের সাফল্য অর্জনের জন্যে ফলওয়েল ও ববার্টসনকে শয়তান বিবেচনা করা প্রতিপক্ষকে ছাড় দিতে হয়েছে। একটা টানাপোড়েন ছিল: আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্বে প্রবেশ করে মৌলবাদীরা আবিষ্কার করেছে যে, তারা কেবল অশুভের সাথে মিশছেই না বরং যেসব বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে রাজনীতির মাঠে নেমেছিল সেগুলোর কোনও কোনওটা তাদের প্রভাবিতও করছে। এটা ছিল তাদের সমস্যার একটি দিক মাত্র। শতাব্দীর শেষ দুই দশকে মৌলবাদীরা যেসব সমাধানের দিকে ধাবিত হয়েছে মনে করেছিল সেগুলোর কোনও কোনওটা খোদ ধর্মের পক্ষেই পরাজয় ছিল।
১০. পরাজয়? (১৯৭৯-৯৯)
মৌলবাদী রিকনকুইস্তা দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ধর্ম আর যাই হোক অবলুপ্ত শক্তি ছিল না। ইরানি বিপ্লবের পর পর জনৈক উত্তেজিত মার্কিন সরকারী কর্মকর্তার মতো আর একথা বলার জো ছিল না: ‘ধর্মকে আবার কে কবে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে? মৌলবাদীরা ধর্মবিশ্বাসকে ছায়া থেকে বের করে এনে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, আধুনিক সমাজে এক বিশাল জনগণের কাছে এটা আবেদন রাখতে পারে। তাদের বিজয় সেক্যুলারিস্টদের হতাশায় ভরে দিয়েছিল; এটা আলোকন যুগের পোষ মানানো, নম্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে নমিত বিশ্বাস ছিল না। এটা যেন আধুনিকতার মূল্যবোধ উপেক্ষা করে যাচ্ছিল। ১৯৭০ দশকের শেষার্ধের ধর্মীয় আক্রমণ দেখিয়ে দিয়েছিল যে, বিভিন্ন সমাজ মেরুকৃত অবস্থায় রয়েছে; বিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ধার্মিক ও সেক্যুলারিস্টরা আরও বেশি বিভক্ত হয়ে গেছে। এখন আর একে অন্যের ভাষায় কথা বলতে পারছে না এরা, পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারছে না। সম্পূর্ণ খাঁটি যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলবাদ ছিল বিপর্যয়, কিন্তু মৌলবাদীদের মতে এটা বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের অবৈধ আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হওয়ায় এটা বিস্ময়কর ছিল না। কীভাবে আমরা এইসব মৌলবাদকে ধর্মীয় আন্দোলন হিসাবে মূল্যায়ন করব? মৌলবাদীদের বিজয় কি সত্যিকার অর্থে ধর্মের পরাজয়ের সমান, আর মৌলবাদী হুমকীর কি অবসান ঘটেছে?
যারা তখনও বিশেষ করে আলোকনের নীতিমালা মেনে চলত তাদের পক্ষে ইরানের ইসলামি বিপ্লব বিশেষভাবে অস্বস্তিকর ছিল। বিপ্লব কঠোরভাবে সেক্যুলারিস্ট ধরনের হওয়ার কথা ছিল। জাগতিক বাস্তবতা যখন এক নতুন মর্যাদা অর্জন করে ও ধর্মের অতীন্দ্রিয় বলয় হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে প্রস্তুত হয়, ঠিক তেমন একটা সময়েই তা সংঘটিত হয় বলে মনে করা হত। হান্নাহ আরেন্দট তাঁর জনপ্রিয় গবেষণা অন বিভ্যুলুশন (১৯৬৩)-এ যেমন ব্যাখ্যা করেছেন: ‘শেষ পর্যন্ত এমন হতে পারে যে আমরা যাকে বিপ্লব আখ্যায়িত করে থাকি সেটা এক নতুন সেক্যুলারিজমের জন্ম ডেকে আনা ক্রান্তিকাল মাত্র।” জনপ্রিয় গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে একটি ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রের আবির্ভাব যেন পাশ্চাত্য প্রজ্ঞার এর আপাত আনাড়ী প্রত্যাখ্যানে প্রায় বিব্রতকর দারুণ অতিকল্পনা বলে মনে হয়েছে। ইরানি বিপ্লবের ঠিক অব্যবহিত পর কেউই আশা করেনি যে খোমেনির সরকার টিকে থাকবে। আধুনিক ইসলামি সরকারের মতো ধর্মীয় অভ্যুত্থানের ধারণাটিই স্বাভাবিক যুক্তিতে স্ববিরোধী মনে হয়েছিল।
কিন্তু পশ্চিমাদের এই সত্য মেনে নিতে হয়েছিল যে, অধিকাংশ ইরানি ইসলামি শাসন চায়। বহু আমেরিকান ও ইউরিাপিয় পর্যবেক্ষক আস্থার সাথে ‘উন্মাদ মোল্লাহদের’ উৎখাত করতে যে ‘মধ্যপন্থীদের’ অবির্ভাবের প্রত্যাশা করেছিলেন, তাদের আবির্ভাব ঘটেনি। বিপ্লবের পর ইরানে জাতীয়তাবাদী ও সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র আকাঙক্ষীরা নিজেদের সংখ্যালঘু হিসাবে আবিষ্কার করেছে। অবশ্য, ইসলামি সরকারের রূপ ঠিক কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে কোনও ঐকমত্য ছিল না। শরিয়তির অনুসারী পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীগণ হ্রাসকৃত যাজকীয় শাসনের সাথে সাধারণ মানুষের শাসন চেয়েছেন। খোমেনির নতুন প্রধানমন্ত্রী মেহেদি বাযারগান অনৈসলামিক পার্লামেন্টারি আইনে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতাসহ একটি মুজতাহিদদের কাউন্সিলসহ ১৯০৬ সালের সংবিধানে (রাজতন্ত্র বাদে) ফিরে যেতে চেয়েছেন। কুমের মাদ্রাসাগুলো খোমেনির বেলায়েত-ই ফাকিহ’র বাস্তবায়নের জন্যে চাপ দিতে থাকে, কিন্তু আয়াতোল্লাহ শরিয়তমাদারি ও আয়াতোল্লাহ তালেকানি অতীন্দ্রিয়বাদে অনুপ্রাণিত একটি যাজক গোষ্ঠীর হাতে জাতির শাসন ভার তুলে দেওয়ার এই ধারণার প্রবল বিরোধী ছিলেন, কেননা তা শত বছরের শিয়া ঐতিহ্যের লঙ্ঘন করে। এমন এক রাজনীতিতে ভীষণ বিপদের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন তাঁরা। ১৯৭৯ সালের অক্টোবর নাগাদ মারাত্মক বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল।৩ বাযারগান ও শরিয়তমাদারি খোমেনির অনুসারীদের তৈরি ফাকিহকে (খোমেনি) সর্বোচ্চ ক্ষমতদানকারী খসড়া সংবিধান আক্রমণ করেন, যিনি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং অনায়াসে প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পারবেন। সংবিধান একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, একটি মন্ত্রীসভা ও বার সদস্য বিশিষ্ট শরীয়া বিরোধী আইনের বিরুদ্ধে ভেটো দানের ক্ষমতাসহ একটি কাউন্সিল অভ গার্ডিয়ানের ব্যবস্থাও রেখিছিল।
