পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের আলোকে যৌনতার উপর গুরুত্ব আরোপ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। নিউ ক্রিশ্চান রাইট ঠিক ইসলামপন্থীদের মতোই নারীর অবস্থান নিয়ে ভাবিত ছিল, কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ঢের বেশি ভয়ার্ত ছিল। নারী স্বাধীনতার আন্দোলন মৌলবাদী নারী-পুরুষকে সমানভাবে ত্রাসে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। মরাল মেজরিটির অন্যতম রোমান ক্যাথলিক নেতা ফিলিস শ্যাফির চোখে নারীবাদ একটা ‘রোগ,’ বিশ্বের সকল দুর্গতির কারণ। ইভ ঈশ্বরের অবাধ্য হয়ে নিজ মুক্তি দাবি করার পর থেকেই নারীবাদ এই পৃথিবীতে পাপ এবং এর সাথে ‘ভয়, রোগ, বেদনা, ক্রোধ, ঘৃণা, বিপদ, সহিংসতা ও সব ধরনের কদর্যতা বহন করে এনেছে। প্রস্তাবিত সমঅধিকারের সংশোধনী সরকারের কর বৃদ্ধি, সোভিয়েত কায়দার নার্সারি প্রতিষ্ঠা ‘ও আমাদের জীবনের অবশিষ্ট সমস্ত দিকের ফেডারালাইজেশনের’৯২ ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু না। বেভারলি লাহাইয়ের চোখে নারীবাদ ‘অসুস্থতার চেয়েও বেশি কিছু’; মার্ক্সবাদী মানবতাবাদীদের শিক্ষা ভিত্তিক ‘মৃত্যুর দর্শন এটা… রেডিক্যাল নারীবাদীরা আত্মধ্বংসী; তারা গোটা একটা সভ্যতার মরণ ডেকে আনার চেষ্টা করছে।’ এখন স্বামীদের মধ্যমঞ্চে আনার জন্যে সক্রিয় হওয়া ও নিজেদের নারীসুলভ আত্মসউৎসর্গের শিক্ষায় নতুন করে শিক্ষা লাভ করা ক্রিশ্চান নারীর দায়িত্ব। ‘আমাদের সমাজকে রক্ষা করা’, ‘সভ্যতা ও মানবজাতিকে একবিংশ শতাব্দীতে নিয়ে আসা’ তাদের দায়িত্ব।” মৌলবাদীদের কল্পনাকে দীর্ঘদিন ধরে তাড়া করে আসা অন্যান্য অশুভের সাথে নারীবাদের সম্মিলন ষড়যন্ত্রভীতিরই প্রমাণ। সমাজের অখণ্ডতা ও এমনকি স্থায়ীত্বকেও নারীদের প্রথাগত অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত করেছে তারা।
প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদী ও অধিকাংশ গোষ্ঠীর ক্রিশ্চান রক্ষণশীলরা যেন সেক্যুলার মানবতাবাদের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের নপুংসক মনে করেছিল বলে মনে হয়। পুরুষের অক্ষমতা নিয়ে বেশি গভীরভাবে চিন্তিত মনে হয়েছে তাদের। টিম ও বেভারলি লাহাই তাঁদের বেস্ট সেলিং সেক্স ম্যানুয়াল দ্য অ্যাক্ট অভ ম্যারিজ: দ্য বিউটি অভ সেক্সুয়াল লাভ (১৯৭৬)-এ দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, আধুনিক পুরুষ ‘আগের চেয়ে নিজেদের পৌরুষ সম্পর্কে কম নিশ্চিত’। পুরুষরা অক্ষম, যৌনতার ক্ষেত্রে সমস্যাক্রান্ত, স্ত্রীদের সন্তুষ্ট করার ব্যাপারে বা অন্য পুরুষের সাথে তুলনায় নিজেদের দক্ষতায় উদ্বিগ্ন।৯৪ এর তুলে ধরে নারীর আত্ম-প্রতিষ্ঠা। এমনকি মৌলবাদী নারীরা পর্যন্ত এই সাংস্কৃতিক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে; ফলে পুরুষরা ‘মেয়েলী’ বা এমনকি ‘পুরুষত্বহীন’ হয়ে পড়ছে।৯৫ এই ভীতি মৌলবাদীদের সমকামীতা সম্পর্কে ভীতিও তুলে ধরে যাকে তারা নারীবাদের মতোই আমেরিকার পতনের কারণ মহামারী মনে করেছে।৯৬ ‘এটা সর্বোচ্চ ধরনের বিকৃতি,’ জোরের সাথে বলেছেন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সমকামীতার বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে খ্যাতি লাভ করা জেমস রবিসন। ‘এটা ঈশ্বর বিরোধিতা, ঈশ্বরের বাণীর বিরোধিতা, সমাজ বিরোধী, প্রকৃতি বিরোধী। এটা কল্পনা বা বর্ণনা করতে গেলেও বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করে।’৯৭ মৌলবাদীরা সমাকমীতাকে শিশুভোগের মতো ভাববার ক্ষেত্রে একমত ছিল। এটা ‘সেক্যুলার মানবতাবাদের’ শিকারে পরিণত ভাঙা ঘরের পরিণাম হওয়ার ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিল তারা।৯৮ পারিবারিক মূল্যবোধ সংক্রান্ত মৌলবাদী লেখকগণ আমেরিকার প্রকৃত পুরুষের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে একমত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপকভাবে কোনও কোনও মৌলবাদী যেন নারীসুলভ মূল্যবোধের ধর্মে পরিণত হওয়া খোদ ক্রিশ্চান ধর্মেই নির্বীজকরণের সুপ্ত প্রবণতার অস্তিত্ব থাকার বিষয়ে উদ্বিগ্ন মনে হয়েছে: ক্ষমা, করুণা এবং নমনীয়তা। কিন্তু জেসাস মেয়েলি স্বভাবের ছিলেন না, বলেছেন এডউইন লুই কোল: তিনি ছিলেন ‘নির্ভীক নেতা, শয়তানকে পরাস্তকারী, দুরাত্মাকে বিতাড়ন করেছেন, প্রকৃতির উপর ক্ষমতা দেখিয়েছেন, ভণ্ডদের ধরিয়ে দিয়েছেন।’৯৯ তিনি নিষ্ঠুর হতে পারতেন: ক্রিশ্চানদেরও আগ্রাসী হতে হবে, ব্যাটল ফর দ্য ফ্যামলি-তে জোরের সাথে বলেছেন টিম লাহাই। তাদেরও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে।১০০ এক উগ্র, পৌরুষদীপ্ত ক্রিশ্চান ধর্মের আকাঙ্ক্ষা মরাল মেজরিটির অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রতি বৈরিতার কারণও ব্যাখ্যা করে। এটাও তাদের প্রচারণার অংশ ছিল, ঋজু, সক্ষম ও যোদ্ধা পৌরুষকে নতুন করে জীবিত করে তোলা।
অংশত মৌল ভীতি থেকে নিউ ক্রিশ্চান রাইটের তৎপরতা সৃষ্টি হয়েছিল। মৌলবাদীরা অস্পষ্টভাবে নিজেদের নির্বীজ ও গভীরভাবে হীন ভেবেছে। তাদের আদর্শে কোনও পরিবর্তন ঘটেনি, তবে এখন তারা তাদের গোষ্ঠীকে মূলধারার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার বহু বছরের নির্দেশের পর সমাজ জীবনে রাজনৈতকিভাবে সক্রিয় করে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক প্রচারণামূলক আন্দোলনের মতোই কাজ শুরু করেছিল মরাল মেজরিটি নেটওয়ার্ক। ভোট দানের জন্যে সদস্যদের নিবন্ধন করাই ছিল তাদের মূল কাজ, তাদের সঠিকভাবে ভোট দানের পদ্ধতি শেখানো হয়েছে এবং ভোট দানে সক্ষম ছিল তারা। সক্রিয়তার প্রয়োজন ব্যাখ্যা করতে র্যালির আয়োজন করেছে তারা, জনগণকে লবিইং ও নিউজ লেটার তৈরির কাজে শিক্ষিত করে তুলেছে; প্রচার মাধ্যমকে প্রভাবিত করার শিক্ষাও দিয়েছে। যত নিম্ন বা স্থানীয় পর্যায়েরই হোক না, সরকারী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে ক্রিশ্চানদের তাগিদ দেওয়া হয়। উদারপন্থী ও সেক্যুলারিস্টরা ক্রমে জনজীবনে উচ্চকিত নবজন্ম উপস্থিতি সম্পর্কে ধীরে ধীরে সজাগ হয়ে উঠতে থাকে। পরবর্তী এক দশকে উগ্র ক্রিশ্চানরা মূলধারার প্রতিষ্ঠানসমূহ উপনিবেশে পরিণত করতে শুরু করে। ১৯৮৬ সালে প্যাট রবার্টসন এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ক্রিশ্চানরা কোনও কোনও রাজনীতিবিদের পথের কাঁটা হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। বছরের পর বছর পাবলিক অ্যাকশন কমিটিগুলো তাদের দৃষ্টিতে অনাকাঙ্ক্ষিত নীতি প্রচারকারীদেরই পদের জন্যে স্থির করে এসেছে। ‘রিপোর্ট কার্ড’ বের করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধারণের সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল তারা। এবার ক্রিশ্চান অ্যাক্টিভিস্টরা গান ল-এ ‘ভুল’ ভোটদানকারী, গর্ভপাতের তহবিলে দানকারী বা সমঅধিকার সংশোধনীতে ভোটদানকারীদের নিশানা করতে শুরু করেছিল। প্রতিরক্ষা, স্কুলে প্রার্থনা বা সমকামীদের অধিকারের বেলায় ভুল দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা পরিবার বিরোধী, আমেরিকা বিরোধী ও ঈশ্বর বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে মৌলবাদী অ্যাক্টিভিস্টদের যেন অদক্ষ মনে হয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে আধুনিক রাজনীতির খেলা শিখে নেয় তারা। যাজক ও টেলিভিশন উপস্থাপক ছিলেন এরা, জন্মগতভাবে রাজনীতিক নন; কিন্তু তারপরেও বেশ সাফল্য অর্জন কিেছলেন। তাঁদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য সম্ভবত সমঅধিকার সংশোধনী প্রতিহত করা। প্রয়োজনীয় দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্যে তেত্রিশটি রাজ্যের ভোটের দরকার ছিল, ১৯৭৩ সাল নাগাদ তিরিশটি রাজ্য পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ১০১ কিন্তু ফিলিস শ্যাফলির প্রয়াস ও স্থানীয় ক্রিশ্চান রাইট অ্যাক্টিভিস্টদের প্রচারণা সংশোধনীর গতি স্তব্ধ করে দেয়: নেব্রাস্কা, টেনেসি, কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা ও দক্ষিণ ডাকোটা, তাদের আগের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। তা নাহলে মরাল মেজরিটি এমনকি স্কুলে প্রার্থনা বা গর্ভপাতের মতো বিষয়েও ফেডারেল বা রাজ্য বিধান বদলাতে পারেনি। আরকানস ও লুইসিয়ানায় অবশ্য স্কুলের পাঠ্যক্রমে ডারউইনের বিবর্তনবাদের পাশাপাশি জেনেসিসের আক্ষরিক শিক্ষা দেওয়ারও পক্ষে বিল গৃহীত হয়েছিল। সাফল্যের এই আপাত অভাব ক্রিশ্চান অ্যাক্টিভিস্টদের অবশ্য হতাশ করেনি, তারা যুক্তি দেখিয়েছে, কংগ্রেসের উভয় কক্ষে একটা অতিরক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ে তোলাই তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। সেটা অর্জিত হলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার স্বাভাবিকভাবেই অগ্রসর হবে।
