মধ্য জানুয়ারির দিকে সবকিছুর অবসান ঘটে। প্রধানমন্ত্রী বখতিয়ার শাহ’র বিদায় নিয়ে আলোচনা করেন, মুখ রক্ষা করতে একে সাময়িক বলে ঘোষণা করা হয়। রাজ পরিবার মিশরে চলে যায়, তাদের স্বাগত জানান সাদাত। বখতিয়ার রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দান, সাভাক বিলোপ, ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে তেল বিক্রিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও উল্লেখযোগ্য সামরিক ব্যয় হ্রাসের ঘোষণা দিয়ে বিপ্লব ঠেকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। জনতা, তাদের ভাষায়, ইমামের প্রত্যাবর্তনের জন্যে ফেটে পড়ছিল। ১লা ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ খোমেনিকে ফিরে আসার অনুমতি দিতে বাধ্য হন বখতিয়ার।
তেহরানে খোমেনির প্রত্যাবর্তন ছিল বিশ্বকে চিরতরে বদলে দিয়েছে বলে মনে হওয়া বাস্তিলের পতনের মতো সেইসব প্রতীকী ঘটনার মতো। ইরান ও ইরানের বাইরের অঙ্গীকারাবদ্ধ সেক্যুলারিস্টদের কাছে এটা ছিল এক অন্ধকার মুহূর্ত, যৌক্তিকতার বিরুদ্ধে কুসংস্কারের মহাবিজয়। কিন্তু ইসলাম নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে ভেবে ভীত সুন্নি বা শিয়া নির্বিশেষে বহু মুসলিমের কাছে এটা ছিল এক আলোকিত পুনর্জাগরণ। কোনও কোনও ইরানি শিয়ার কাছে খোমেনির প্রত্যাবর্তনকে অলৌকিক ঘটনার মতো মনে হয়েছে; অনিবার্যভাবে গোপন ইমামের অতীন্দ্রিয় প্রত্যাবর্তনের মতো মনে হয়েছে। তিনি তেহরানের রাস্তায় দিয়ে যাওয়ার সময় জনতা ‘ইমাম খোমেনি’র নামে শ্লোগান দিয়েছে, ন্যায়বিচারের এক নতুন সূচনার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল তারা। আয়াতোল্লাহ শরিয়তমাদারির মতো প্রবীন মুজতাহিদগণ ইমাম খেতাবের ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, খোমেনি গোপন ইমান নন দাবি করে সরকারীভাবে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারী নীতি যাই হোক না কেন, লক্ষ লক্ষ ইরানি জনতার কাছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খোমেনি ইমামই ছিলেন। তাঁর জীবন ও ব্রত স্পষ্টভাবেই আদতে ইতিহাসে ঐশীসত্তার উপস্থিতি ও সক্রিয় থাকার প্রমাণ মেলে। খোদ বিপ্লবের মতো খোমেনি যেন কোনও এক প্রাচীন মিথকে বাস্তবতায় পরিণত করেছিলেন।
খোমেনির প্রত্যাবর্তনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তাহা হেজাযি একটি কবিতা প্ৰকাশ করেছিলেন যেখানে বহু ইরানির সাগ্রহ প্রত্যাশা ফুটে উঠেছে: ‘ইমামের প্রত্যাবর্তনের দিন’ এক সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধের প্রত্যাশা করেছে। কেউ আর কখনও মিথ্যা বলবে না, চোরের হাত থেকে বাঁচতে দরজা আটকে রাখার দরকার হবে না, সবাই মিলেমিশে খাবে:
ইমামকে ফিরতেই হবে…
যেন ন্যায় আবার সিংহাসনে আসীন হতে পারে,
যাতে অশুভ, বিশ্বাসঘাতকতা আর ঘৃণা
চিরকালের জন্যে মুছে যায় পৃথিবী থেকে।
ইমাম যখন ফিরে আসবেন,
ইরান-এই বিধ্বস্ত, আহত মাতা-
চিরকালের জন্যে মুক্তি পাবে
স্বেচ্ছাচার ও অজ্ঞতা এবং লুটপাট,
অত্যাচার ও বন্দিত্বের শৃঙ্খল থেকে।৮২
পয়গম্বর মুহাম্মদের (স) একটি হাদিস উদ্ধৃত করতে পছন্দ করতেন খোমেনি, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদে প্রত্যাবর্তন করছেন তিনি; শারীরিক, রাজনৈতিক যুদ্ধ নয় বরং নিজেকে জয় ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধ ও সমাজে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার অনেক কঠিন, জটিল ও কষ্টকর সংগ্রাম। তেহরানে ফেরার পর খোমেনি নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন যে ছোট জিহাদ শেষ হয়েছে এবার, অন্তহীন বড় জিহাদের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে।
*
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৌলবাদী পুনর্জাগরণ ১৯৭০-র দশকের শেষের দিকে এতখানি নাটকীয় ছিল না। আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টদের এতটা চরম পন্থা বেছে নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। ইহুদিদের মতো তারা তখনও হলোকাস্ট ও গণহত্যার স্মৃতিতে তাড়িত হচ্ছিল না, কিংবা মুসলিমদের মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনেরও শিকার ছিল না। আধুনিক সেক্যুলার সংস্কৃতি থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন বোধ করেছে তারা, কিন্তু তাদের নেতারা অন্তত সমৃদ্ধি ও সাফল্য উপভোগ করেছেন। এটাই পরে তাদের অন্যতম সমস্যা প্রমাণিত হবে। বহিরাগত হিসাবে নিজেদের বিশ্বাস সত্ত্বেও আমেরিকায় প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল, শাস্তির ভীতি ছাড়াই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পারছিল তারা এবং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে গণতন্ত্রকে ব্যবহার করছিল। তা সত্ত্বেও ১৯৭০-র দশকের শেষ নাগাদ, আমরা যেমন দেখেছি, মৌলবাদীরা তাদের বিগত পঞ্চাশ বছরের নীতি অনুযায়ী সমাজ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার বদলে আসলে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠা উচিত বলে মনে করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, একটা প্রভাব সৃষ্টি করে আমেরিকাকে ফের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার মতো সুযোগ তাদের রয়েছে। এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, পারিবারিক মূল্যবোধ, গর্ভপাত ও ধর্মীয় শিক্ষার মতো বিভিন্ন ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য ইভাঞ্জেলিকাল ভোটার সংগঠিত করা সম্ভব। প্রাচীন ভীতি রয়ে গেলেও নতুন আস্থাও সৃষ্টি হয়েছে।
এই পুনর্জাগরিত মৌলবাদের প্রতীক ছিল জেরি ফলওয়েলের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মরাল মেজরিটি। অবশ্য খোদ মৌলবাদীদের তরফ থেকে নয় দলটির মূল অনুপ্রেরণা এসেছিল ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি গঠনকারী তিনজন পেশাদার ডানপন্থী সংগঠকের কাছ থেকে। রিচার্ড ভিগনেরি, হাওয়ার্ড ফিলিপস ও পল ওয়েরিচ রিপাবলিকান পার্টির উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, এমনকি উদারপন্থী রিচার্ড শউইকারকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রানিং মেট হিসাবে বেছে নেওয়া রোনাল্ড রেগান হতেও নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন তাঁরা। প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ হ্রাসের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে রক্ষণশীল হওয়ায় ১৯৬০-র দশকে আমেরিকার সরকারী ও বেসরকারী জীবনে অনুপ্রবেশ করা নৈতিক ও সামাজিক উদারবাদের বিরোধিতার লক্ষ্যে একটি নতুন রক্ষণশীল দল গঠন করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। ইভাঞ্জেলিকাল ও মৌলবাদী প্রটেস্ট্যান্টদের শক্তি লক্ষ করেছিলেন তাঁরা এবং জেরি ফলওয়েলকেই তাদের প্রয়োজন মেটানোর উপযুক্ত মনে করেছেন। আগে থেকেই তাঁর নিজস্ব সমাবেশ, লিবার্টি কলেজ ও টেলিভিশন দর্শক ভিত্তিক এলাকা ছিল।৮৩ মরাল মেজরিটিতে প্রধান হয়ে ওঠা টিম লাহাই ও গ্রেগ ডিক্সনের মতো মৌলবাদীগণ ও সুপার চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেছেন আর কোনও গোষ্ঠী থেকে কোনও রকম নিন্দার ভয় করতেন না তাঁরা। আগে থেকেই অন্যদের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল তাদের: তাঁদের প্রায় সবাই ব্যাপ্টিস্ট ও ব্যাপ্টিস্ট বাইবেল সোসায়েটির ফেলোশিপের সদস্য ছিলেন।
