মধ্যবিত্ত শ্রেণী পরিত্যাগ করার পর শাহ’র আর কোনও আশাই ছিল না। নিশ্চয়ই বিপদ টের পেয়েছিলেন তিনি। ৮ই সেপ্টেম্বর শুক্রবার ভোর ৬:০০ টায় সামরিক আইন জারি করা হয়, সকল মহাসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে সেদিন সকালে আরেকটি শান্তিপূর্ণ র্যালিতে যোগ দিতে জালেহ স্কোয়ারে সমবেত হওয়া বিশ হাজার বিক্ষোভকারীর একথা জানা ছিল না। তারা সভা ভাঙতে অস্বীকৃতি জানালে সৈনিকরা গুলি বর্ষণ করে, ফলে সম্ভবত নয় শো লোক প্ৰাণ হারায়। এই হত্যাকণ্ডের পর জনতা মহাক্ষিপ্ত হয়ে পথে পথে ব্যারিকেড তৈরি করে দালানকোঠায় আগুন ধরিয়ে দেয়, এদিকে ট্যাংক থেকে তাদের উপর গুলি বর্ষণ করতে থাকে সৈন্যরা।৩ ১০ই সেপ্টেম্বর, রোববার, সকাল ৮:০০টায় প্রেসিডেন্ট কার্টার ক্যাম্প ডেভিড থেকে শাহকে ফোন করে তাঁর প্রতি সমর্থনের নিশ্চয়তা দেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউস এই ফোনালাপ অনুষ্ঠানের কথা নিশ্চিত করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বিশেষ সম্পর্কের কথা আবার নিশ্চিত করা হয়। বলা হয় যে, জালেহ স্কয়ারে প্রাণহানির জন্যে প্রেসিডেন্ট দুঃখ প্রকাশ করলেও তিনি শাহ কর্তৃক সদ্য সূচিত রাজনৈতিক উদারীকরণ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।৭৪
কিন্তু জালেহ হত্যাকাণ্ডের পর এমনকি মহাশয়তানের সমর্থনও আর শাহকে রক্ষা করতে পারত না। তেল শ্রমিকরা এবার ধর্মঘটে যোগ দিল; এবং অক্টোবরের শেষ নাগাদ আগের তুলনায় তেল উৎপাদন ২৮ শতাংশ হ্রাস পায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নীরব থাকা গেরিলা গ্রুপগুলো আবার সামরিক নেতা ও সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে শুরু করে। ৪ঠা নভেম্বর ছাত্ররা তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের তোরণ থেকে শাহ’র মূর্তি টেনে নামায়: ৫ই নভেম্বর বাজার বন্ধ হয়ে যায়, ছাত্ররা ব্রিটিশ দূতাবাসে হামলা করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের অফিস, সিনেমা হল ও মদের দোকান বন্ধ হয়ে যায়।৫ এই দফা সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেনি।
এই সময়ের ভেতর ইরাকি সরকার তেহরানের চাপের প্রতি সাড়া দিয়ে খোমেনিকে নাজাফ থেকে বাহিষ্কার করেছিল, প্যারিসে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। এখানে সম্প্রতি পুনর্জাগরিত ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতারা তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন, এক বিবৃতিতে খোমেনি এবং তাঁরা উভয়পক্ষই ১৯০৬ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকার কথা বলেন। ২রা ডিসেম্বর, মুহররম মাস এগিয়ে আসার সাথে সাথে রীতি মোতাবেক আবেগী নাটক রাওদাহ ও হুসেইনের শাহাদৎ বাষিকী পালনের অনুষ্ঠানের বদলে জনগণের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করা উচিত বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন খোমেনি। এইসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের রেডিক্যাল সম্ভাবনা সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে গিয়েছিল। মুহররমের প্রথম দিন রাতে লোকেরা সরকারের কার্য্য উপেক্ষা করে শাহাদৎ বরণে প্রস্তুতির প্রতীক হিসাবে শাদা কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় ছুটাছুটি করতে থাকে। অন্যরা ছাদ থেকে লাউডস্পিকারে শাহ বিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে। বিবিসি দাবি করে যে কেবল এই কয়েক দিনের পুলিস ও সেনাবাহিনীর হাতে সাত শো লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল।৭৬ ৮ই ডিসেম্বর তেহরানের উত্তরে বেহেশত-ই যাহরা কবরস্থানে সমবেত হয় ছয় হাজার মানুষ, এখানে বহু শাহীদকে কবর দেওয়া হয়েছিল, ‘শাহর মৃত্যু চাই!’ শ্লোগান দিচ্ছিল তারা। ইস্ফাহানে বিশ হাজার মানুষ রাস্তায় মিছিল করে, তারপর ব্যাংক, সিনেমা হল ও আমেরিকান টেকনিশিয়ানদের আবাস বিভিন্ন ফ্ল্যাটে আক্রমণ চালায়। ৯ই ডিসেম্বর, আশুরার পূর্বক্ষণে সদ্য কারামুক্ত আয়াতোল্লাহ তালেকানি এক জাঁকাল মিছিলের নেতৃত্ব দেন, মিছিলটি টানা ছয় ঘণ্টা তেহরানের রাস্তা প্রদক্ষিণ করে: ৩০০,০০০ থেকে দেড় মিলিয়ন লোক তাতে অংশ নেয়, নীরবে চারজন চারজন করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটে যায়। তাব্রিয, কুম, ইস্ফাহান ও মাশাদেও শান্তিপূর্ণ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।৭৭
খোদ আশুরার দিন তেহরানে আরও বড় আকারের মিছিল অনুষ্ঠিত হয়, আট ঘণ্টা স্থায়ী হয়ে সেটি, প্রায় দুই মিলিয়ন লোক তাতে অংশ নিয়েছিল। মিছিলকারীরা সবুজ, লাল ও কালো পতাকা (যথাক্রমে ইসলাম, শাহাদৎ ও শিয়ার প্রতীক) বহন করে; বিক্ষিপ্তভাবে ‘ইরানের স্বৈরাচারকে আমরা খুন করব!’ ও ‘ইরানে ইয়াঙ্কি শক্তির নাশ ঘটাব!’ লেখা ব্যানারও ছিল সেখানে। আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় ঢের বেশি ঐক্যবদ্ধ ইরানি জনগণ পাহলভী রাষ্ট্র থেকে নিজেদের উদ্ধার করতে পারবে, এমন একটা আস্থা ক্রমশঃ বেড়ে উঠছিল।৮ অনেকেরই মনে হয়েছে যেন ইমাম হুসেইন স্বয়ং সেই আশুরায় তাদের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গোপন ইমামের মতো খোমেনি দূর থেকে নির্দেশনা দিচ্ছেন তাদের।” বিক্ষোভ শেষে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়: খোমেনির প্রতি ইরানের নতুন নেতা হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়, শাহ’র পতন না ঘটা পর্যন্ত ইরানিদের প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়।৮০
তিন দিন পর সেনাবাহিনী শাহপন্থী মিছিল আয়োজনের চেষ্টা চালায়, বিপ্লবী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘাত আরও সহিংস রূপ নেয়। সাংবিধানিক সরকার গঠনের লক্ষ্যে সুপরিচিত উদারপন্থী শাহপুর বখতিয়ারকে নিয়োগ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শেষ চেষ্টা করেন শাহ। সাভাক ভেঙে দেওয়ার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দান এবং তাঁর অর্থনৈতিক ও বিদেশ নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এসব হয়েছিল এক বছর দেরিতে। চাপের মুখে জনগণ এত অসংখ্য প্রতিশ্রুতির কথা শুনেছিল যে, এইসব আর বিশ্বাস করতে পারেনি। ৩০শে ডিসেম্বরকে (ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কুম হত্যাকাণ্ডের প্রথম বার্ষিকী ছিল) শোক দিবস ঘোষণা করেন খোমেনি। মাশাদ, তেহরান ও কাযরিনে আরও হত্যার ঘটনা ঘটে; শেষের এই শহীদদের ছবি খোমেনির পাশপাশি প্রদর্শিত হচ্ছিল। ২৩শে ডিসেম্বর মাশাদে সৈনিকরা খোমেনির ছবি ছিঁড়ে ফেললে সংঘর্ষ বাধে, নিহত হয় বারজন সাধারণ নাগরিক। সঙ্গে সঙ্গে অকুস্থলে সমবেত হয় জনগণ, সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে তারা, জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত তরুণরা ছিল তাদের নেতৃত্বে। সেনাবাহিনী পিছু হটতে শুরু করে, জনতাকে দূরে সরিয়ে রাখতে মাটি লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে তারা। পরের দিন এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে লক্ষ লক্ষ লোক রাস্তায় নেমে আসে।
