এভাবে ১৮ই ফেব্রুয়ারি, কুম হত্যাকাণ্ডের চল্লিশ দিন পরে উলেমা ও বাজারিদের নেতৃত্বে শোকার্তদের মিছিল মৃতদের জন্যে শোক পালনের জন্যে রাস্তাঘাটে ভিড় করে নেমে আসে ইরানিরা। ছাত্রী, যাদের অনেকেই শাসকগোষ্ঠী থেকে নিজেদের পৃথক করার জন্যে বোরখা পরেছিল, আর বাজার থেকে আগত চাদরে ঢাকা নারীরা প্রায়ই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে, পুলিসকে যেন সরাসরি তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার চ্যলেঞ্জ করেছে। পুলিস গুলি করেছেও, ফলে আরও শহীদ হয়েছে। বিশেষ করে তাব্রিযের সংঘাত ছিল সহিংস। এখানে অন্তত একশো শহীদ প্রাণ হারিয়ে থাকতে পারে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ছয়শো জনকে। মিছিল থেকে বের হয়ে সিনেমা হল, ব্যাংক ও মদের দোকানে আক্রমণ করেছে (মহাশয়তানের প্রতীক) তরুণরা, কিন্তু কোনও মানুষের উপর হামলা চালানো হয়নি।৬৬ চল্লিশ দিন পর, ৩০শে মার্চ, আরও একবার তাব্রিযের শহীদদের জন্যে শোক পালন করতে রাস্তায় নেমে আসে শোকপালনকারীরা। এইবার ইয়াযদ-এ মসজিদ থেকে বের হয়ে আসামাত্র আনুমানিক এক শো বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়। ৮ই মে, ইয়াযদের শহীদদের সম্মানে নতুন করে আবার মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।৬৭ রাজনৈতিক বন্দিতে ঠাসাঠাসি অবস্থা হয়েছিল জেলখানাগুলোর। মৃত্যুর সংখ্যা নিজ জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শাসকগোষ্ঠীর নগ্ন আগ্রাসন তুলে ধরেছে।
এটা ছিল চূড়ান্ত আবেগের নাটক। বিক্ষোভকারীরা ‘চারদিকে কারবালা, প্রত্যেক দিনই আশুরা’৮ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করত। শাহাদৎ বরণকারীদের জন্যে প্রযুক্ত শব্দ শহীদ-এর মানে ক্রিশ্চান ধর্মের ‘সাক্ষী’র মতো। মৃত্যুবরণকারী বিক্ষোভকারীরা অদৃশ্য আধ্যাত্মিক জগতের মূল্যবোধকে রক্ষা করতে ইমাম হুসেইনের মতো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্বের সাক্ষ্য বহন করছে, শাসকগোষ্ঠী যাকে লঙ্ঘন করার জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হচ্ছে। লোকে বিপ্লব প্রসঙ্গে পরিবর্তনকারী ও পরিশুদ্ধকারী অভিজ্ঞতা হিসাবে কথা বলত; তাদের মনে হয়েছে ‘নিজেদের ও তাদের সমাজকে দুর্বল করে তোলা বিষ থেকে বিশুদ্ধ করে তুলছে তারা এবং সংগ্রামে আবার নিজেদের মাঝে ফিরে যাচ্ছে। এটা স্রেফ রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহারকারী কোনও বিপ্লব ছিল না। বিশেষ করে দরিদ্র ও অশিক্ষিতদের মাঝে শিয়া পুরাণই একে অর্থ ও পথনির্দেশ দিয়েছে, আরও কঠোর সেক্যুলারিস্ট আদর্শের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অটল থাকত তারা।৬৯
জুন ও জুলাই মাসে অবাধ নির্বাচন ও বহুদলীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে শাহ কিছু ছাড় দেন। এই মাসগুলোয় বিক্ষোভকারীরা অপেক্ষাকৃত শান্ত ছিল। একটা বিরতি চলছে বলে মনে হচ্ছিল, এপর্যন্ত শোক মিছিলে যোগ না দিলেও শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কেবল মৌখিক প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়ে আসা পাশ্চাত্য শিক্ষিত সেক্যুলারিস্ট ও বুদ্ধিজীবীরা ধরে নিয়েছিল যে যুদ্ধে জেতা গেছে। কিন্তু ১৯শে আগস্ট, ১৯৫৩ সালের পাহলবী বংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পঁচিশতম বার্ষিকীতে আবাদানের রেক্স সিনেমায় এক অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারশো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ঘটনার জন্যে সাথে সাথে সাভাককে দায়ী করা হয়। দশ হাজার শোককারী নিমেষে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেয়, ‘শাহর মৃত্যু চাই! তাকে পুড়িয়ে মারো!’ শ্লোগান দিতে থাকে তারা। ওয়াশিংটন, লস অ্যাঞ্জেলিস ও দ্য হেগে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভের আয়োজন করে ইরানি ছাত্ররা। শাহ আরও ছাড় দেন: মজলিসের বিতর্ক আরও মুক্ত হয়, শৃঙ্খলাপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়, কিছু সংখ্যক ক্যাসিনো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আবার ইসলামি ক্যালেন্ডার চালু করা হয়।৭১
কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। রমযানের শেষ সপ্তাহে মুসলিমদের সাধারণত মসজিদের রাত্রি জাগরণে ব্যস্ত থাকার সময় চৌদ্দটি ইরানি শহরে বিক্ষোভ চলে, এইসময় পঞ্চাশ থেকে একশো জন লোকের প্রাণহানি ঘটে। ৪ঠা সেপ্টেম্বর, রমযানের শেষ দিনে তেহরানে এক বিশাল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। জনতা রাস্তায় নামাজের ভঙ্গিতে নত হয়, সৈনিকদের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেয় তারা। এই প্রথমবারের মতো গুলিবর্ষণ থেকে বিরত থাকে পুলিস। এই পর্যায়ে-খুবই তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী যোগ দিতে শুরু করে। মিছিলকারীদের একটা ছোট দল কিছু আবাসিক এলাকায় মিছিল করে এগোনোর সময় চিৎকার করে বলতে থাকে: ‘স্বাধীনতা! মুক্তি! এবং ইসলামি সরকার!’ ৭ই সেপ্টেম্বর, উত্তর তেহরান থেকে পার্লামেন্ট ভবনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যায় এক বিশাল মিছিল, খোমেনি ও শরিয়তির ছবিঅলা প্ল্যাকার্ড ছিল তাদের হাতে, পাহলভী বংশের অবসান ও ইসলামি সরকারের দাবি করছিল তারা।এই শরিয়তি, বাযারগান ও বানি সদরের মতো সাধারণ চিন্তকগণ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত অভিজাতগোষ্ঠীকে আধুনিক ইসলামি শাসনের সম্ভবনা সম্পর্কে প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি খোমেনি থেকে ভিন্ন হলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদারপন্থীরা বুঝতে পারছিল যে তৃণমূল পর্যায়ে সমর্থন রয়েছে তাঁর তাদের পক্ষে যা কোনওদিনই অর্জন করা সম্ভব নয়, শাহ থেকে নিস্তার পেতে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে প্রস্তুত ছিল তারা। সেক্যুলারিস্ট শাসন ইরানে মহা বিপর্যয়কর ছিল, ভিন্ন কিছুর জন্যে তৈরি ছিল তারা।
