ইরানি বিপ্লব স্রেফ রাজনৈতিক ছিল না। নিশ্চিতভাবেই শাহ’র নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসন ও অর্থনৈতিক সংকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে: সেগুলো ছাড়া অভ্যুত্থান হত না। কেবল শাহ’র কবল থেকে উদ্ধার লাভ করতেই আধ্যাত্মিক অস্থিরতা বোধ করেনি এমন বহু ইরানি সেক্যুলারিস্টও শেষ পর্যন্ত উলেমাদের সাথে যোগ দেবে; তাদের সমর্থন ছাড়া হয়তো বিপ্লব সফল হত না। তবে ধর্মকে বাতিল করে দেওয়া সেক্যুলারিস্ট রীতির বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ছিল এটা, এবং সাধারণ ইরানিরা ভেবেছিল জোর করে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মহাশয়তান হিসাবে তুলে ধরার ভেতর দিয়েই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে এটা। সঠিক বা ভুলভাবে অনেকেই বিশ্বাস করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উষ্ণ সমর্থন ছাড়া শাহ কখনওই এমন আচরণ করতেন না। পরিকল্পিতভাবে ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নকারী সেক্যুলার রাজনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব বোধ করার কথা জানা ছিল তাদের; তারা জানতে পেরেছিল, বহু পশ্চিমা মনে করে কেবল যাহিরের প্রতি জোর দেওয়াই প্রশংসার্হ প্রয়োজন। এর পরিণাম, তারা যতদূর বুঝতে পেরেছিল, রাতের ফাঁকা সুখবাদী দক্ষিণ তেহরান। বহু আমেরিকানের ধার্মিক হওয়ার ব্যাপারে ইরানিরা সজাগ থাকলেও তাদের বিশ্বাস কোনও অর্থ প্রকাশ করে বলে মনে হয়নি। জিমি কার্টারের ‘ভেতর’ আর ‘বাহির’ ‘একরকম’ ছিল না। তারা বুঝতে পারেনি ১৯৭৮ সাল নাগাদ নিজ দেশের লোককে হত্যা করতে শুরু করেছেন এমন একজন শাসককে কীভাবে একজন প্রেসিডেন্ট সমর্থন করতে পারেন। ‘কার্টার শাহ’র সমর্থন করবেন এটা আমরা আশা করিনি, কারণ তিনি ধার্মিক মানুষ, মানবাধিকার রক্ষার দাবি তুলেছেন,’ বিপ্লবের পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন আয়াতোল্লাহ হুসেইন মন্তেজেরি। ‘কেমন করে একজন ধার্মিক ক্রিশ্চান কার্টার শাহ’র পক্ষাবলম্বন করতে পারলেন?৬১
পবিত্র মুহররম মাসে নববর্ষের আগে আগে কার্টার শাহ’র শাসনকে চাঙা করে তুলতে তাঁর সাথে দেখা করেন যখন, চেষ্টা করলেও এর চেয়ে নিখুঁতভাবে নিজেকে খলনায়কের ভূমিকায় স্থাপন করতে পারতেন না তিনি। পরবর্তী উত্তাল বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আধ্যাত্মিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার চরম কারণে পরিণত হয়েছিল। রাস্তার দেয়াল লিখন কার্টারকে ইয়াযিদের সাথে এক করে দেখেছে, শাহকে হুসেইন ও তাঁর ক্ষুদে সেনাদলকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে পাঠানো সেনাপতি সীমার। রাস্তার এক ড্রয়িংয়ে খোমেনিকে মোজেস, শাহকে ফারাও হিসাবে হিসাবে আঁকা হতে দেখা গেছে, আর কার্টার হলেন ফারাও/শাহ’র পূজিত মূর্তি।৬২ মনে করা হয়েছিল যে আমেরিকা শাহকে দূষিত করেছে, এখন ক্রমবর্ধমানহারে শিয়া আলোকে সিক্ত খোমেনি বর্তমান অপবিত্র স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ইসলামি বিকল্প হিসাবে উপস্থিত হচ্ছিলেন।
১৯৭৮ সালের মুহররমের শেষে শাহ আবারও নিজেকে শিয়াদের প্রতিপক্ষ হিসাবে তুলে ধরলেন। ৮ই জানুয়ারি আধা সরকারী পত্রিকা এত্তেলাত খোমেনির বিরুদ্ধে একটি অপমানকর নিবন্ধ প্রকাশ করে, সেখানে তাঁকে ‘অ্যাডভেঞ্চারার, বিশ্বাসবর্জিত ও উপনিবেশবাদের সাথে সম্পর্কিত’ বলে উল্লেখ করা হয়। নিবন্ধে জোরের সাথে বলা হয়, তিনি অসচ্চরিত্র জীবন যাপন করেন, ব্রিটিশদের গুপ্তচর ছিলেন, এমনকি এখনও শ্বেত বিপ্লবকে খাট করতে উদগ্রীব বিট্রিশদের কাছ থেকে মাসোহারা নেন।৬৩ শাহর পক্ষে এই বিদ্রূপাত্মক ও অবিশ্বাস্য আক্রমণ ছিল মারাত্মক ভুল। পর দিন কুমের পথে-ঘাটে চার হাজার ছাত্র নেমে আসে: ১৯০৬ সালের সংবিধান প্রত্যাবর্তন, বাক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, ফায়যিয়াহ মাদ্রাসা খুলে দেওয়া ও খোমেনিকে ইরানে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়ার দাবি তোলে তারা। কিন্তু ওরা পেয়েছিল গণহত্যা। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি বর্ষণ করে পুলিস, এবং উলেমাদের মতে, সত্তর জন ছাত্র নিহত হয় (যদিও সরকার মাত্র দশ জন মারা গেছে বলে দাবি করেছিল)।[৬৪] ১৯৬৩ সালের দাঙ্গার পর এটাই ছিল ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন, শাহ’র জন্যে এটা ছিল শেষের সূচনা। উইলিয়াম বীম্যান যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, ইরানিরা অনেক কিছু সহ্য করতে পারলেও অপবিশ্বাসের একটি মাত্র কাজ ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় ভাঙন ডেকে আনতে পারে। একবার এই সীমারেখা অতিক্রম করা হলে আর ফিরে যাবার উপায় থাকে না।৬৫ লক্ষ লক্ষ সাধারণ ইরানির কাছে কুমে সাভাককে মিছিলকারীদের উপর গুলি বর্ষণের নির্দেশ দিয়ে শাহ সেই রেখা অতিক্রম করে গিয়েছিলেন। প্রবল ক্রোধ নিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের জবাব দিয়েছিল তারা, শুরু হয়েছিল বিপ্লবের।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বুদ্ধিজীবী, লেখক, আইনবিদ ও ব্যবসায়ীরা শাহ শাসনের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। অবশ্য জানুয়ারি মাসে শিয়াহদের উপর এই প্রকাশ্য হামলার পর নেতৃত্ব উলেমাদের হাতে চলে যায়। হত্যাকাণ্ড এতটাই হতবুদ্ধিকর ছিল যে, এমনকি আয়াতোল্লাহ শরিয়তমাদারি পর্যন্ত তাঁর স্বভাবগত শান্তিবাদ ত্যাগ করেন, কঠোর ভাষায় এই গুলিবর্ষণের নিন্দা করেন তিনি। সারা দেশের উলেমাদের কাছে একটি সঙ্কেত পৌঁছে দেয় তা। কোনওকিছুই পরিকল্পিত বা আগে থেকে স্থির করা ছিল না। নাজাফ থেকে কোনও রকম কৌশলগত নির্দেশনা জারি করেননি খোমেনি। কিন্তু এত্তেলাতের নিবন্ধ প্রকাশের মুহূর্ত থেকেই অভ্যুত্থানের অদৃশ্য প্ররোচক ও অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছিল তিনি। সংগ্রাম কোনও মৃত্যুর চল্লিশ দিন পরে অনুষ্ঠিত প্রথাগত শোকের দিনে কেন্দ্রিভূত হয়েছিল। সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল এগুলো, এই সময় আরও হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হত; এবং চল্লিশ দিন পরে শেষের শহীদদের স্মরণে লাগাতার মিছিল অনুষ্ঠিত হত। বিপ্লব অদম্য গতিবেগ অর্জন করেছিল। প্রতিটি বিক্ষোভের মধ্যবর্তী চল্লিশ দিন সময় নেতাদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিত, বিস্তারিত পরিকল্পনা বা প্রচারণা ছাড়াই নির্ধারিত সময়ে জানতা বুঝে যেত ঠিক কখন সমবেত হতে হবে।
