এদিকে ১৩ই নভেম্বর, ১৯৭৭ প্রেসিডেন্ট কার্টারের সাথে আলোচনার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান শাহ। প্রতিদিন আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা ইরানি ছাত্ররা ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের সামনে শাহ’র উদ্দেশে শ্লোগান দেওয়ার জন্যে সমবেত হতে শুরু করে। এক আনুষ্ঠানিক ভোজ সভায় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিশেষ সম্পর্কের গুরুত্বের উপর আবেগময় ভাষণ দেন কার্টার, ইরানকে ‘বিশ্বের উত্তাল এক কোণে স্থিতিশীলতার দ্বীপ’৫৬ আখ্যায়িত করেন তিনি। ৩১শে ডিসেম্বর ভারত সফর বিরতি দিয়ে ইরানে ঝটিকা সফরে তেহরানে যান কার্টার, এখানেও সরকারের প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কার্টার শাহ’র প্রতি তাঁর আস্থার কথা প্রকাশ করে গেছেন। তাঁর তেহরান সফর পবিত্র মহররম মাসের সাথে মিলে গিয়েছিল, যখন কারবালার ট্র্যাজিডি সবার মনে জ্বলজ্বল করতে থাকে; এই বছর খোমেনির কথা ভাবছিল সবাই: শাহ সবে মুস্তাফা খোমেনির প্রথাগত শোকের অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষাণা করেছিলেন, সাধারণত মৃত্যুর চল্লিশ দিন পরে এটা অনুষ্ঠিত হত। এমনি ক্রান্তিকালে শাহ’র শাসনকে সমর্থন করার জন্যে বিশেষ সফর করে নিজেকে নিখুঁতভাবে মহাশয়তানের ভুমিকায় স্থাপন করে বসেন কার্টার।
বিপ্লব চলাকালে ও এর পরবর্তী সময়ে তাদের দেশকে শয়তানসুলভ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে শুনে আমেরিকানরা ধাক্কা খেয়েছিল। এমনকি যারা ১৯৫৩ সালের সিআইএ অভ্যুত্থানের পর থেকেই ইরানি জনগণের অনেকের মনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভের কথা জানত তারাও এই দানবীয় ইমেজারিতে বিতৃষ্ণা বোধ করেছে। আমেরিকার নীতি যত ভুলই হয়ে থাকুক, এভাবে নিন্দিত হওয়ার মতো সে নয়। এতে করে ইরানি বিপ্লবীদের সম্পর্কে ধর্মান্ধ, বিকারগ্রস্ত ও ভারসাম্যহীন বলে প্রচলিত ধারণাকেই যেন নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ পাশ্চাত্য জনগণ মহাশয়তানের ইমেজকে ভুল বুঝেছে। খৃস্টধর্মে স্যাটান এক মহাপরাক্রমশালী অশুভ চরিত্র, কিন্তু ইসলামে সে অনেক বেশি সামালযোগ্য। কোরান এমনকি এমনও আভাস দিয়েছে যে শেষ বিচারের দিনে শয়তানকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, আল্লাহ’র সর্ববিজয়ী মহত্মের উপর এমননি তার আস্থা। যেসব ইরানি আমেরিকাকে ‘মহাশয়তান’ বলেছে, তারা আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দানবীয়ভাবে খারাপ বলছিল না, বরং আরও স্পষ্ট কিছু। জনপ্রিয় শিয়ামতবাদে প্রলুব্ধকারী শয়তান বরং চিরন্তনভাবে অদৃশ্য জগতের আধ্যাত্মিক মূল্য উপলব্ধিতে অক্ষম হাস্যকর এক চরিত্র। এক কাহিনীতে বলা হয়েছে মানবজাতির অধিকার নিয়ে আল্লাহ’র কাছে অভিযোগ করেছে সে, কিন্তু সহজেই তুচ্ছ উপহারে সামাল দেওয়া গেছে তাকে। পয়গম্বরদের বদলে বরং গণকদের নিয়েই বেশি সুখে থাকে শয়তান, বাজারই তার মসজিদ, গণস্নানাগারে সে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে, আল্লাহকে কামনা করার বদলে নারী ও মদ তালাশ করে।৫৮ প্রকৃতপক্ষেই নিরাময় অযোগ্যভাবে তুচ্ছ সে, বাহ্যিক (যাহির) বিশ্বের বলয়ে চিরকালের মতো বন্দি হয়ে গেছে, অস্তিত্বের আরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রার অস্তিত্ব দেখতে অপারগ। বহু ইরানির চোখে মহাশয়তান আমেরিকা ছিল ‘মহাগুরুত্বহীনকারী।’ পশ্চিমের বার, ক্যাসিনো ও সেক্যুলারিস্ট রেওয়াজ উত্তর তেহরানের আমেরিকান রীতিকে মূর্ত করে যা স্বেচ্ছায় জীবনকে অর্থ প্রদানকারী একমাত্র বাস্তবতা গোপনকে (বাতিন) উপেক্ষা করে বলে মনে হয়। এছাড়াও, শয়তান আমেরিকা শাহকে প্রলুব্ধ করে ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ থেকে সরিয়ে এক উপরিগত সেক্যুলারিজমের জীবনে টেনে নিয়ে গেছে।৫৯
ইরানি শিয়াবাদ সবসময়ই দুটি আবেগে অনুপ্রাণিত ছিল: সামাজিক ন্যায়বিচার ও অদৃশ্য (আল-গায়িব)। শত শত বছর ধরে পাশ্চাত্যবাসী যেখানে যত্নের সাথে ইন্দ্রিয়জ অনুভূতিতে অনুভূত পার্থিব জগতের যৌক্তিক রীতির উপর সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে এসেছে, সেখানে অন্যান্য প্রাক আধুনিক জাতির মতো ইরানি শিয়ারা কাল্ট ও মিথ অনুপ্রাণিত এক গোপন (বাতিন) জগতের বোধ লালন করেছে। শ্বেত বিপ্লবের সময় ইরানিরা বিদ্যুৎ, টেলিভিশন ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা লাভ করেছিল; কিন্তু দেশের ধর্মীয় পুনর্জাগরণ দেখিয়েছে যে, বহু লোকের কাছে এইসব বাহ্যিক (যাহিরি) সাফল্য স্রেফ যথেষ্ট ছিল না। আধুনিকায়ন অত্যন্ত দ্রুতগতির ও অনিবার্যভাবে উপরিগত ছিল। বহু ইরানি তখনও বাতিনের তৃষ্ণা বোধ করেছে, মনে করেছে এটা ছাড়া তাদের জীবনের কোনও মূল্য বা তাৎপর্য নেই। আমেরিকান নৃতত্ত্ববিদ উইলিয়াম বীম্যান যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, জীবনের বাস্তুগত তলে আটকা পড়ার অনুভূতি সম্পন্ন একজন ইরানি মনে করেছে তার আত্মা খোয়া গেছে। একটি খাঁটি অন্তস্থঃ জীবনের জন্যে প্রয়াস এখনও ইরানি সমাজের পরমমূল্য ধারণ করে, এত বেশি যে অন্য একজনকে সবচেয়ে সেরা প্রশংসা করতে গিয়ে বলতে পারে ‘তার অন্তর (বাতিন) ও বাহির (যাহির) একই রকম। ১৬০ আধ্যাত্মিকতার জোরাল অনুভূতি ছাড়া বহু ইরানি নিজেদের দিশাহারা মনে করেছে। শ্বেত বিপ্লবের সময় কারও কারও মনে বিশ্বাস জন্মেছিল যে বস্তুবাদ, ভোগ্যপণ্য, বিনোদনের বিদেশী কেতা ও বিদেশী মূল্যবোধ আরোপের ফলে তারা পাশ্চাত্য-আসক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সোৎসাহ সমর্থন পুষ্ট শাহকে যেন জাতির আধ্যাত্মিকতার উৎস ইসলাম ধ্বংসের জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হয়েছে। খোমেনিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন তিনি, ফায়যিয়াহ মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়েছেন, যাজকদের অপমান করেছেন, তাঁদের আয় হ্রাস করেছেন এবং ধর্মতত্ত্বের ছাত্রদের হত্যা করেছেন।
