১৯৭০-র দশকের গোড়ার দিকে ইরান যেন সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে শুরু করে। আমেরিকান বিনিয়োগকারীরা ও ইরানি অভিজাত গোষ্ঠী শ্বেত বিপ্লবের কারণে সৃষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবাদে সমানভাবে বিপুল অর্থের অধিকারী হয়ে উঠেছিল। তেহরানে আমেরিকান দূতাবাস, এসপিওনাজের কেন্দ্রের চেয়ে (বিপ্লবীরা যেমন দাবি করেছিল) বরং ধনী আমেরিকানদের ধনী ইরানিদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জায়গা ছিল।৪৯ তবে-আবার-কেবল অভিজাতগোষ্ঠীই লাভবান হয়েছিল। রাষ্ট্র সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে বটে, কিন্তু সাধারণ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। সমাজের উচ্চ মহলে অনিয়ন্ত্রিত ভোগবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, পাতি বুর্জোয়া ও শহুরে দরিদ্রদের মাঝে দেখা দিয়েছিল বঞ্চনা ও দুর্নীতি। ১৯৭৩-৭৪ সালের তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর অত্যন্ত ধনী ব্যক্তি ছাড়া আর কারও বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় ব্যাপক সৃষ্টি হয়েছিল মূদ্রাস্ফীতির। এক মিলিয়ন লোক হয়ে পড়েছিল বেকার, বিদেশি পণ্যের অবাধ আগমনে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছে; ১৯৭৭ সাল নাগাদ মূদ্রাস্ফীতি এমনকি ধনীদেরও প্রভাবিত করতে শুরু করেছিল। এমনি অসন্তোষ ও হতাশার পরিবেশে দুটি প্রধান গেরিলা সংগঠন সক্রিয় হয়ে ওঠে, আমেরিকান সামরিক ব্যক্তি ও পরামর্শকদের হত্যা করতে থাকে। বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে মুনাফা লুটছিল বলে মনে হওয়ায় ইরানে আমেরিকান অভিবাসীদের ব্যাপারেও যথেষ্ট অসন্তোষ কাজ করছিল। এই বছরগুলোতেই শাহ’র সরকার আগের চেয়ে ঢের বেশি স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিল।৫°
বহু বিরূপ ইরানি ভিন্নভাবে সংকটের প্রতি সাড়াদানকারী উলেমাদের শরণাপন্ন হয়েছে। কুমে সবচেয়ে প্রবীন মুজতাহিদ আয়াতোল্লাহ শরিয়তমাদারি শাসকগোষ্ঠীর সাথে যেকোনও ধরনের সংঘাতের বিরোধিতা করেন, যদিও ১৯০৬ সালের সংবিধানের পুনরুজ্জীবন দেখতে উদগ্রীব ছিলেন তিনি। সংবিধানের কঠোর প্রয়োগ ও শাসকগোষ্ঠীর বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বহুবার কারাবরণকারী আয়াতোল্লাহ তালেকানি মেহেদি বাযারগান ও আবোলহাসান বানি সদরের মতো সাধারণ সংস্কারকদের সাথে কাজ করেছেন, এঁরা ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র চাইলেও যাজকীয় শাসন দেখতে চাননি। তালেকানি যাজকগোষ্ঠীকে সরকারে সুবিধাজনক ভূমিকা দেওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না; তিনি নিশ্চিতভাবেই খোমেনির ক্যারিশম্যাটিক জুরিস্টের সরকার বেলায়েত-ই ফাকিহর দর্শনের সাথে একমত হননি।৫১ কিন্তু খোমেনি তখনও শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অটল ও আপোসহীন প্রতিরোধের প্রতীক ছিলেন। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ফায়যিয়াহ মাদ্রাসার ছাত্ররা ১৯৬৩ সালে খোমেনির গ্রেপ্তারের বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে এক বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। ভবনে আক্রমণ চালিয়ে পুলিস একজন ছাত্রকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে। সরকার মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়, এর নীরব শূন্য ক্যাম্পাস যেকোনও রকম অস্পষ্ট প্রতিবাদের প্রতি শাহ’র মৌলিক বিরোধিতা ও ধর্মের প্রতি তাঁর বৈরিতার প্রতীকী স্মারক হয়ে ছিল।৫২ জনপ্রিয় কল্পনায় ক্রমবর্ধমানহারে তিনি ধর্মের শত্রু, শহীদ হুসেইনের ঘাতক, এবং লোকে যাঁকে ইমাম সম্বোধন করে সেই খোমেনির শত্রু ইয়াযিদের মতো হয়ে উঠছিলেন।
১৯৭৭ সালের সূচনায় অবশ্য সরকার খানিকটা নরম হয়, এবং জনতার চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নিয়েছে বলে মনে হয়। জিমি কার্টার এর আগের বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁর মানবাধিকারের প্রচারণা ও ইরানের আদালত ও কারাগারের উপর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিরূপ প্রতিবেদন হয়তো শাহকে চলমান অসন্তোষের প্রতি কিছুটা ছাড় দিতে বাধ্য করে থাকতে পারে। তবে সত্যিকার অর্থে তেমন পরিবর্তন হয়নি, তবে সেন্সরশিপ বিধি শিথিল করায় সাহিত্যের এক প্রবল ধারা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রের হতাশা তুলে ধরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ ছিল; কৃষকগণ কৃষিপণ্যের আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে, পল্লী অঞ্চলে তা দারিদ্র্য বাড়িয়ে দিয়েছিল; ব্যবসায়ীরা মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্নীতি নিয়ে ভাবিত ছিল; আইনবিদগণ সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদা হ্রাসকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু তারপরও বিপ্লবের কোনও আহ্বান ছিল না। ইরানের অধিকাংশ উলেমা শরিয়াতমাদারির নেতৃত্ব অনুসরণ করছিলেন, প্রথাগত নীরবতার পথ অবলম্বন করে গেছেন তাঁরা। যাজক গোষ্ঠী নয়, বরং ইরানের লেখকগণই ১৯৭৭ সালে সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বাঙ্ময় প্রতিবাদ উচ্চারণ করেছিলেন। ১০ থেকে ১৯শে অক্টোবর তেহরানের গ্যতে ইন্সটিটিউটে আনুমানিক ষাটজন নেতৃস্থানীয় ইরানি কবি ও লেখক হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের সামনে তাঁদের রচনা পাঠ করেন। সরকারের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা সত্ত্বেও সাভাক এই কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানে বাধা দিতে যায়নি। ৫৪ মনে হচ্ছিল যেন সরকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মেনে নিতে শিখছে।
কিন্তু নতুন এই কাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কবিতা সমাবেশের খুব বেশি দিন পরে নয়, শাহ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। ৩রা নভেম্বর, ১৯৭৭, বেশ কয়েকজন পরিচিত ভিন্নমতাবলম্বীকে গ্রেপ্তার করা হয়, ইরাকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই সাভাকের এজেন্টদের হাতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু বরণ করেন খোমেনির ছেলে মুস্তাফা।৫৫ আরও একবার নিজেকে ইয়াযিদের ভুমিকায় স্থাপন করেছিলেন শাহ। খোমেনি ইতিমধ্যেই শিয়া আভা আবৃত হয়েছিলেন, নির্বাসিত গোপন ইমামের মতো লাগতে শুরু করেছিল তাঁকে; এবার ইমাম হুসেইনের মতো স্বৈরাচারী শাসকের হাতে তাঁর সন্তান মৃত্যু বরণ করেছেন। সারা ইরান জুড়ে জনতা প্রথাগত ঢঙে মুস্তাফা খোমেনির মৃত্যুতে শোক করার জন্যে কাঁদতে কাঁদতে বুক চাপড়ে সমবেত হয়েছিল। তেহরানে শোকপালনকরীদের উপর আক্রমণ চালায় পুলিস; ১৫, ১৬ ও ১৭ নভেম্বর তেহরানে কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানে আরও ধরপাকড় ও মারধরের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের আলামত চোখে পড়েনি। নাজাফে খোমেনি, মুস্তাফাকে যিনি ‘চোখের মণি’ ডাকতেন, নীরব ছিলেন।
