কিন্তু মোজেসের আইন তোরাহর নিজস্ব একটা মিথোস ছিল। এটি ছিল লুরিয় কাব্বালাহর মতোই নির্বাসনের স্থানচ্যুতির প্রতি সাড়া। বিসিই ষষ্ঠ শতাব্দীতে মন্দির ধ্বংস করে, ওদের ধর্মীয় জীবনকে পর্যুদস্ত করে ইসারয়েলের জনগণকে বাবিলনে নির্বাসনে পাঠানো হলে আইনের টেক্সট এক নতুন ‘মন্দিরে’ পরিণত হয়েছিল। স্থানচ্যুত জনগণ এখানে ঐশী সত্তার একটা বোধকে লালন করেছে। বিশ্বকে পরিচ্ছন্ন ও নোংরা, পবিত্র ও অপবিত্র হিসাবে গ্রন্থিত করা ছিল বিধ্বস্ত জীবনকে আবার সুশৃঙ্খলিত করার কাল্পনিক পুনঃস্থাপন। নির্বাসনে থাকার সময় ইহুদিরা আবিষ্কার করেছিল যে, আইনের পাঠ তাদের এক ধরনের গভীর ধর্মীয় অভিজ্ঞতার যোগান দেয়। আধুনিক মানুষের মতো ইহুদিরা স্রেফ তথ্যের জন্যে টেক্সট পাঠ করত না: এটা ছিল পাঠের প্রক্রিয়া-প্রশ্ন-উত্তর, উত্তপ্ত বিতর্ক ও সূক্ষ্ম বিষয়ে মগ্ন হওয়া—যা তাদের ঐশী সত্তার বোধ যোগাত। তোরাহ ছিল ঈশ্বরের বাণী, এতে গভীরভাবে মগ্ন হয়ে, মোজেসের কাছে স্বয়ং ঈশ্বরের উচ্চারিত বাণী অন্তর দিয়ে স্মৃতিতে গেঁথে নিয়ে সেগুলোকে জোরে উচ্চারণ করে নিজেদের সত্তার ভেতর ঐশী সত্তাকে টেনে আনছিল ওরা, প্রবেশ করছিল পবিত্র বলয়ে। আইন একটা প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, এখানেই ওরা শেখিনাহর দেখা পেয়েছিল। ওদের জীবনের সূক্ষ্মতম ক্ষেত্রে আইনের পালন স্বর্গীয় স্বজ্ঞা নিয়ে আসত: যখন তারা খেত, হাতমুখ ধুতো, প্রার্থনা করত বা স্রেফ সাব্বাথের সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিশ্রাম করত।
মারানোদের বাধ্য হয়ে জীবনভর যার উপর নির্ভর করতে হয়েছিল এর কোনওটাই হুট করে সেই যৌক্তিক চিন্তাভাবনা দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল না। এই ধরনের পৌরাণিক ও কাল্টসুলভ অনুশীলন ছিল অজানা। নব্য ইহুদিদের কেউ কেউ, অভিযোগ করেছেন ওরোবিও, ‘বর্ণনার অতীত নাস্তিকে’ পরিণত হয়েছিল। ওরা, এটা নিশ্চিত যে, আমাদের বিংশ শতাব্দীর ধারণা মোতাবেক নাস্তিক ছিল না, কারণ তখনও তারা দুয়ে উপাস্যে বিশ্বাস করছিল। কিন্তু বাইবেলের ঈশ্বর ছিলেন না তিনি। মারানোরা পরবর্তীকালের আলোকন ফিলোসফদের” উদ্ভাবিত ডেইজমের মতো একটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক বিশ্বাস গড়ে তুলেছিল। এই ঈশ্বর ছিলেন সমস্ত কিছুর প্রথম কারণ, অ্যারিস্টটল যাঁর অস্তিত্ব যৌক্তিকভাবে তুলে ধরেছিলেন। সব সময়ই ইনি যৌক্তিকভাবে আচরণ করে এসেছেন। তিনি মানুষের ইতিহাসে ভ্রান্তিপূর্ণভাবে হস্তক্ষেপ করেন না, বিচিত্র অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়ে প্রকৃতির বিধিবিধানকে লঙ্ঘন করেন না বা পর্বতশীর্ষে অস্পষ্ট বিধান অবতীর্ণ করেন না। তাঁর বিশেষ ধরনের আইনি বিধান প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়েনি, কারণ প্রকৃতির নিয়মকানুন সবারই বোধগম্য ছিল। মানুষের যুক্তি স্বাভাবিকভাবে এই ধরনের ঈশ্বরের ধারণাই কল্পনা করতে চেয়ে এসেছে। অতীতে ইহুদি ও মুসলিম দার্শনিকগণ বলতে গেলে ঠিক এমনই একজন উপাস্যকে হাজির করেছিলেন। কিন্তু সাধারণভাবে বিশ্বাসীদের কাছে তা কখনওই খুব ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ধর্মের দিকে থেকে তা ব্যবহারযোগ্য ছিল না, কেননা প্রথম কারণ মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন কিনা তাতেই সন্দেহের অবকাশ ছিল, কারণ তাঁর পক্ষে পূর্ণাঙ্গ নয় এমন কোনও কিছুর কথা ভাবাও সম্ভব ছিল না। এমন একজন ঈশ্বরের পক্ষে মানুষের দুঃখদুর্দশার বেলায় কোনও কিছু বলার ছিল না। সেজন্যে আপনার প্রয়োজন পৌরাণিক ও কাল্টিক আধ্যাত্মিকতা, মারানোদের সেটা অজানা ছিল।
আমস্টারডামে ধর্মবিশ্বাসে ফিরে যাওয়া বেশির ভাগ মারানো কোনও কোনও মাত্রায় হালাখিয় আধ্যাত্মিকতা শিখতে সক্ষম হয়। কিন্তু কারও কারও বেলায় পরিবর্তন অসম্ভব ঠেকেছে। করুণতম ঘটনাগুলোর অন্যতম ছিল, উরিয়েল দা কোস্তার ঘটনা। কনভার্সো পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন তিনি, শিক্ষা লাভ করেছিলেন জেস্যুইটদের কাছে, কিন্তু ক্রিশ্চান ধর্মকে তিনি নির্যাতনমূলক, নিষ্ঠুর ও গস্পেলের সাথে সম্পর্ক বিবর্জিত সম্পূর্ণ মানব রচিত নিয়ম ও মতবাদে নির্মিত বলে আবিষ্কার করেছিলেন। দা কোস্তা ইহুদি ঐশীগ্রন্থের শরণাপন্ন হন ও নিজের জন্যে ইহুদি ধর্মের খুবই আদর্শগত যৌক্তিক ধারণা গড়ে তোলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমস্টারডামে পৌঁছানোর পর সমসাময়িক ইহুদিধর্মমত ঠিক ক্যাথলিক মতবাদের মতোই মানব রচিত আবিষ্কার করে হতবাক হয়ে যান, কিংবা তাই দাবি করেছিলেন তিনি।
সম্প্রতি পণ্ডিতগণ দা কোস্তার বক্তব্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, প্রায় নিশ্চিতভাবেই যতটা আবছাই হোক না কেন ইহুদিবাদের হালাখিয় ধরনের সাথে আগেও তার সাক্ষাৎ ঘটেছিল, যদিও সম্ভবত হালাখাহ কতটা গভীরভাবে স্বাভাবিক ইহুদি জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করেছিল সেটা তিনি উপলব্ধি করে উঠতে পারেননি। তবে আমস্টারডামের ইহুদি জীবনধারার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে দা কোস্তার অক্ষমতার বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। পরকালের জীবন সংক্রান্ত মতবাদ ও ইহুদি বিধানের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন তিনি। এখানে তিনি ঘোষণা করেন, তিনি কেবল মানবীয় যুক্তি ও প্রকৃতিক বিধানেই বিশ্বাস করেন। অনেক বছর র্যাবাইরা একঘরে করে রেখেছিলেন তাঁকে। সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত করুণ বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করেছিলেন দা কোস্তা, পরে তাঁকে আবার গ্রহণ করা হয়, আবার সমাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু আসলে দা কোস্তা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাননি। কোনও রকম যৌক্তিক অর্থ সৃষ্টি করে না এমন সব আচার মেনে চলা অসম্ভব ঠেকেছিল তাঁর পক্ষে। আরও দুবার সমাজচ্যুত হয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ১৬৪০ সালে হতাশায় পরাস্ত, ভগ্ন অবস্থায় নিজেই নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন।
