সেক্যুলার জায়গার এমনি আগ্রাসী অধিকারকে ইসলামকে নতুন করে গড়ে তোলার ও পাশ্চাত্যকৃত বিশ্বে তাকে স্থাপনের আনাড়ী প্রয়াস হিসাবে দেখা যেতে পারে। মিনিয়ার ইসলামপন্থীরা পাশ্চাত্য সভ্যতার সর্বজনীন সম্প্রসারণ মেনে নিতে অস্বীকার করেছে, মানচিত্র পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছিল তারা। ইসলামি পোশাক বেছে নেওয়ার মতো পার্থিব জায়গাকে মসজিদে পরিণত করা পূর্ণ সেক্যুলারকৃত জীবন যাত্রার বিরুদ্ধে বিদ্রোহেরই শামিল বলা যেতে পারে। প্রায় শত বছর ধরে উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যান্য জাতির মতো মিশরিয়দের নিজস্ব ধারায় আধুনিক সভ্যতা গড়ে তোলার অযোগ্য ও ইতিহাস সৃষ্টির অনুপযুক্ত বলে মনে করে আসা হয়েছে। এখন যত ছোট মাত্রায়ই হোক না কেন, ইসলামপন্থীরা একটা কিছু ঘটাতে যাচ্ছিল। পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল তারা, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রান্ত থেকে আরও একবার লাইমলাইটে নিয়ে আসছিল। সিভিল রাইটস বা এথনিক মুভমেন্ট, নারীবাদ বা পরিবেশবাদের মতো মুসলিম সংগঠনগুলো তাদের কাছে শিল্পায়িত আধুনিকতার হাতে চাপা পড়া মূল্যবোধ ও বিভিন্ন ইস্যুকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল ও পাশ্চাত্যের চাপিয়ে দেওয়া বৈশ্বিক সমাজের সমরূপতার বিরুদ্ধে স্থানীয় ও নির্দিষ্টতার সজীবতার উপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছিল। অন্য প্রাক আধুনিক আন্দোলনের মতো এটা ছিল প্রতীকী বিউপনিবেশীকরণের প্রয়াস, পশ্চিমকে কেন্দ্র থেকে অপসারিত করার চেষ্টা ও মানবজাতির জন্যে আরও ভিন্ন সম্ভাবনা থাকার সত্য তুলে ধরা। সাদাত যতই পশ্চিমের কাছাকাছি হচ্ছিলেন ও ইসরায়েলের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করছিলেন (ইসলামিস্টদের কাছে যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অল্টারইগো বলে বিবেচিত ছিল), শাসকগোষ্ঠীর সাথে বিচ্ছিন্নতা প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। মিনিয়ায় ছাত্ররা আরও বেশি করে সহিংস হয়ে ওঠে। তারা চার্চে আক্রমণ চালায়, ইসলামি পোশাক পরতে অস্বীকৃতি জানানো ছাত্রদের হামলা করে এবং ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক সপ্তাহের জন্যে মিনিউসিপ্যাল গভর্নমেন্ট অফিস দখল করে রাখে। পুলিস তাদের একটি মসজিদ বন্ধ করে দিলে ছাত্ররা এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুর উপর মাঝরাস্তায় শুক্রবারের প্রার্থনা আয়োজন করে, গাড়িঘোড়া চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এরপর ইউনিভার্সিটি সিটি ও ছাত্রদের আবাসিক এলাকা দখল করে বসে এবং ক্রিশ্চান ছাত্রদের জিম্মি হিসাবে আটক করে। দুইদিন পরে বিদ্রোহ দমন করতে উপস্থিত হয় এক হাজার সৈনিক
১৯৭৭ সাল পর্যন্ত জামাত আল-ইসলামিয়াহকে সমর্থন দিয়ে গেছেন সাদাত, কিন্তু মিনিয়ার ঘটনাপ্রবাহ তাঁর মত পাল্টে দেয়। ১৪ই এপ্রিল, ১৯৭৯, আপার ইজিপ্ট সফর করে মিনিয়া ও আসিউতের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি: সরকার ধর্মের এমনি অপব্যবহার আর বরদাশত করবে না। জুন মাসে জেনারেল ইউনিয়ন অভ ইজিপশিয়ান স্টুডেন্টস নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, বাজেয়াপ্ত করা হয় তাদের সকল সম্পত্তি। কিন্তু জামাত অদৃশ্য হয়ে যাবার মতো এত দুর্বল ছিল না। রমযানের উপবাসের শেষে মিশরের প্রধান প্রধান শহরে সভার আয়োজন করে তারা। কায়রোয় পঞ্চাশ হাজার মুসলিম প্রেসিডেনশল আবিদিন প্যালেসের বাইরে প্রার্থনায় মিলিত হয়ে আভাসে সাদাতকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে তাঁকে অবশ্যই আল্লাহ’র বিধান অনুযায়ী শাসন করতে হবে। গণ্যমান্য মুসলিম ব্রাদার ইউসুফ আল-কারাদাওয়ি সভার উদ্দেশে ভাষণ দিতে উপসাগর থেকে উড়ে আসেন। এখন দ্বিতীয় রামসেসের মামি সংরক্ষণের দিকেই বেশি মনোযোগি সাদাতকে মনে করিয়ে দেন:
মিশর মুসলিম দেশ, ফারাওর নয়…জামাত ইসলামিয়াহর তরুণরা মিশরের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী, অ্যাভিনিউ অভ দ্য পিরামিডস, থিয়েটার অভিনয়, চলচিত্র নয়…মিশর নগ্ন নারী নয়, বরং বোরখাধারী নারী যে স্বর্গীয় আইনের বিধিবিধান মেনে চলে। দাড়ি বেড়ে উঠতে দেওয়া মিশরিয় তরুণ…এটা আল-আযহারের দেশ!৪৮
দমন ও নির্যাতনের নিজস্ব পরিণতি রয়েছে। ইসলামপন্থী ছাত্ররা এবার ক্যাম্পাসগুলোকে ইসলামি ঘাঁটিতে পরিণত করার প্রয়াস দ্বিগুন করে দিয়েছিল; সিনেমা, থিয়েটার ও বোরখাবিহীন নারীদের উপর আক্রমণের সংখ্যা বেড়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও সংবাদ প্রচার শুরু করে তারা। শাসকগোষ্ঠী ও এর সেক্যুলারাইজড রীতিনীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। জামাতকে সংগঠিত হতে দেওয়া হচ্ছিল না, তাদের অনেক সদস্য সহিংস জিহাদে নিবেদিত গোপন সেলে যোগ দিয়েছিল।
ইরানি বিপ্লবের পটভূমিতে এইসব ঘটনা ঘটেছিল। সাদাত পশ্চিমের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রয়াসে গর্বের সাথে শাহকে বন্ধু ঘোষণা করার সময় মিশরে ইসলামি উগ্রপন্থীরা শাহর পতন ত্বরান্বিতকারী ইরানি বিপ্লবীদের বিভিন্ন সংবাদে উল্লসিত হত। ১৯৭৮-৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব ছিল সন্ধিক্ষণ। ধর্মকে আক্রমণের মুখে বলে মনে করা সারা বিশ্বের মুসলিমদের পক্ষে অনুপ্রেরণা। খোমেনির বিজয় দেখিয়েছিল, ধ্বংস ইসলামের নিয়তি নয়; শক্তিশালী সেক্যুলার শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে জিততে পারে। কিন্তু বিপ্লব বহু পশ্চিমাকে ত্রাস ও হতাশায় ভরিয়ে তুলেছিল। যেন বর্বরতা আলোকনের বিরুদ্ধে জয় লাভ করেছে। বহু অপাদমস্তক সেক্যুলারের চোখে খোমেনি ও ইরান যেন ধর্মের সমস্ত ভ্রান্তি এবং এমনকি অশুভকেই—মূর্ত করে তুলেছিল—কারণ বিপ্লব সাধারণভাবে পশ্চিম ও বিশেষ করে আমেরিকার প্রতি বহু ইরানির অনুভূত ঘৃণা তুলে ধরেছিল।
