ইসলামি পোশাকের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী একজন নারীকে প্রাক আধুনিকতার প্রাচীন নারীসুলভ আত্মসমর্পণে ফিরে যেতে হবে, এমন কোনও কথা ছিল না। ১৯৮২ সালে মিশরে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পাশ্চাত্য পোশাক পছন্দকারী নারীদের চেয়ে বোরখা বেছে নেওয়া মেয়েরা বেশি রক্ষণশীল হলেও, বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামপন্থীর লিঙ্গ প্রশ্নে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বোরখা পরিহিত নারীদের অষ্টাশি শতাংশ বিশ্বাস করে, নারী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ (বোরখাবিহীন নারীদের ৯৩ শতাংশের বিপরীতে); বোরখা পরা মেয়েদের ৮৮ ভাগ বাড়ির বাইরে নারীদের কাজ করাকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেছে, এবং ৭৭ ভাগ গ্র্যাজুয়েশেনের পর কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে (৯৫ ও ৮৫ শতাংশ বোরখাবিহীন নারীদের তুলনায়)। অন্যান্য ক্ষেত্রে তফাৎ আরও ব্যাপক ছিল, তবে বোরখাধারী নারীদের একটা প্রধান অংশ এখনও মনে করে (৫৩ শতাংশ) নারী- পুরুষের সমান রাজনৈতিক ও অধিকার দায়িত্ব থাকা উচিত, এবং নারীদের রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে আসীন হওয়া উচিত (৬৩ শতাংশ)। বোরখাধারী নারীদের কেবল ৩৮ ভাগ মনে করে, নারী-পুরুষের সমান বৈবাহিক অধিকার থাকা উচিত, কিন্তু বোরখাবিহীন নারীদের মাত্র ৬৬ ভাগ বৈবাহিক সমতায় বিশ্বাস রাখে। এটাও কৌতূহলোদ্দীপক যে বোরখাধারী (৬৭ শতাংশ) ও বোরখাবিহীন নারীদের ৫২.৭ শতাংশ) সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বিশ্বাস করে যে, শরীয়াহরই দেশের আইন হওয়া উচিত।৪২
এটা ঠিক যে সকল প্রাক আধুনিক আইনের মতো শরীয়াহ নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর অধঃস্তন অবস্থায় নমিত করেছে। কিন্তু উওম্যান অ্যান্ড জেন্ডার ইন ইসলাম- এ লেয়লা আহমেদ যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, এই নারীরা আল আযহারের মধ্যযুগীয় ফিকহের চেয়ে অতীতের আরও অনেক সুন্নি মুসলিম সংস্কারকের মতো কোরান ও সুন্নাহর ‘প্রকৃত ইসলামে’ ফিরে যাবার প্রয়াস পাচ্ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, ‘প্রকৃত ইসলাম’ নারীসহ সকলের পক্ষে সাম্য ও ন্যায়বিচারের কথা বলেছে। তবে আহমেদ এটা স্বীকার করেছেন যে, তারা পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দলে টানার শিকার হতে পারে, এবং উল্লেখ করেছেন, কোনও ইসলামি শাসকদল ক্ষমতায় এলেই সাধারণভাবে নারীদের মর্যাদায় অবনতি ঘটানোর দিকে চালিত করে।৪৩ পরিস্থিতি খারাপ থাকলে পুরুষদের নারীদের চেয়ে বেশি অধিকার দিয়ে সুপ্ত অসন্তে াষ দূর করাটা সহজ। তাসত্ত্বেও এটা ঠিক, ইসলামি পোশাক সব সময় নারী হৃদয়ে সমর্পণের ইঙ্গিত দেয় না। তুর্কি পণ্ডিত নিলুফার গোলে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বোরখাধারী নারীরা প্রায়শঃই জঙ্গী, স্পষ্টভাষী ও উচ্চ শিক্ষিত হয়ে থাকে।৪৪ বহু বোরখাধারী নারী নতুন মৌলবাদী আক্রমণে সক্রিয় ও অনেক সময় বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আহমেদ এও বলেছেন যে, মিশরে ইসলামি পোশাক অতীতে প্রত্যাবর্তন ছিল না। ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে বহু নারীর পছন্দের পোশাকে ট্র্যাডিশনাল কিছু ছিল না। এক নতুন ফ্যাশন ছিল এটা, দাদী-নানীদের জোব্বার চেয়ে (লম্বা হাতা ও স্কার্ট বাদে) পশ্চিমা ফ্যাশনের সাথেই বেশি মিল ছিল। প্রকৃতপক্ষেই, একে ‘হাফওয়ে হাউস’ ও আধুনিক সমাজে উত্তোরণের পোশাক বলা যেতে পারে। এই বছরগুলোতে আগের চেয়ে অনেক অধিক সংখ্যায় নারীরা উচ্চ শিক্ষা লাভ করছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইসলামি পোশাক বেছে নেওয়া নারীদের একটা বিশাল অংশ ছিল প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে অগ্রসর হতে পারা তাদের পরিবারের প্রথম সদস্য, গ্রামীন পটভূমি থেকে এসেছিল তারা। সুতরাং, তাদের পোশাক ছিল পরিবারের পোশাকের ‘আধুনিক’ রূপ। বড় বড় শহরের বিপজ্জনক আধুনিকতার মুখোমুখি হওয়ার পর-এর কসমোপলিটানিজম, আগ্রাসী ভোগবাদ, বৈষম্য, সহিংসতা ও জনসংখ্যাধিক্য-অতি সহজে পরাস্ত হতে পারত তারা। পোশাক তাদের উপরে দিকে চলিষ্ণুতা দাবি করেছে, তবে এটা আবার তাদের অতীতের পোশাকের একটা ধারাবাহিকতারও যোগান দিয়েছে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ইসলামি পরিচয় ও সম্প্রদায় অনেক সহজে ও শান্তিতে বেদনাদায়ক হতে পারত এমন একটি পরিবর্তন সম্পন্ন করায় তাদের সক্ষম করে তুলেছিল। আমরা দেখেছি, অতীতে ধর্ম মানুষকে একটি প্রচলিত জীবন ধারা ও আদর্শ থেকে অধিকতর আধুনিক জীবনে উত্তরণে সক্ষম করে তুলেছিল। ইসলামি পোশাক নারী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই এমন কৌশলের অন্যতম হতে পারে। ৪৫
অবশ্য সকল পরিবর্তনই বেদনাদায়ক। ১৯৭০-র দশকে ক্যাম্পাসে ইসলামি জামাত তরুণদের আন্দোলন ছিল, তরুণ সমাজকে তাদের হতাশা ও বিভ্রান্তি প্রকাশে সাহায্য করেছে।। অনেক সময়ই সহিংসতায় উপচে পড়েছে। ১৯৭০-র দশকে জামাত মিশরের ইসলামি আন্দোলনসমূহের ভেতর সবচেয়ে কম আগ্রাসী ছিল, কিন্তু অধিকতর উগ্র নেতাদের কেউ কেউ বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ লাভে আরও কঠোর কৌশল গ্রহণ করবেন। আমেরিকান আরব বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক গাফনি আপার ঈজিপ্টের নতুন ইউনিভার্সিটি অভ মিনিয়ার জামাহ আল- ইসলামিয়াহর উপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন, এখানে ছাত্র সংগঠনটি তখনও অবিকশিত ছিল এবং ক্ষুদে ইসলামি ক্যাডারের প্রতিপক্ষ ছিল কম। ইসলামি যোন হিসাবে ছোট ছোট স্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু করেছিল তারা: বুলেটিন বোর্ড, কাফেটেরিয়ার একটা ছোট অংশ বা লনের স্টাডি স্পট। ১৯৭৭ সাল নাগাদ প্রতিপক্ষকে বিতাড়িত করার সুবাদে ইসলামিস্টরা ছাত্র ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। কলেজেস অভ আর্ট অ্যান্ড এডুকেশনের মিলিত মাঠে একটা মসজিদ স্থাপন করে তারা, ছাত্ররা এখানে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে মিলিত হত। ইসলামপন্থীরা জায়নামাজ বিছিয়ে, লাউডস্পিকারে প্রার্থনাকে উচ্চকিত করে জায়গাটা দখল করে নিয়েছিল; দাড়িঅলা ছাত্ররা সারাক্ষণ জায়গাটা দখলে রেখে কোরান পাঠ করত।৪৬
