ঠিক একই রকম উন্মোচক, কিন্তু অধিকতর সফল ও স্থায়ী ছিল সাদাতের প্রেসিডেন্সির সময় বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আধিপত্য বজায় রাখা ইসলামি ছাত্র সংস্থা জামাত আল-ইসলামিয়াহ। শুকরির সোসায়েটির মতো জামাত নিজেদের কুতবের ভ্যানগার্ড মনে করত; তবে মূলধারা থেকে রেডিক্যাল প্রত্যাহারের চর্চা করেনি তারা, বরং তাদের চাহিদার প্রতি অন্ধ মনে হওয়া এক সমাজে নিজেদের জন্যে স্থান তৈরি করতে চেয়েছে। মিশরিয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড বা সরবোনের মতো ছিল না। এগুলো ছিল বিশাল, হৃদয়হীন করুণ সুবিধা সম্পন্ন গণশিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ সালের ভেতর ছাত্র সংখ্যা ২০০,০০০ থেকে অর্ধ মিলিয়নে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে ভীতিকর জটলা সৃষ্টি হয়েছিল। দুই বা তিনজন ছাত্রকে একই আসনে বসতে হত, লেকচার হল ও ল্যাবরেটরিগুলোয় এমন ভীড় লেগে থাকত যে বিশেষত মাইক্রোফোনগুলো প্রায়ই ভাঙা থাকায় শিক্ষকের কণ্ঠস্বর শোনা ছিল কার্যত অসম্ভব। অতিরিক্ত ভিড় মেয়েদের জন্যে বিশেষ কষ্টকর ছিল, তাদের অনেকেই ঐহিত্যবাহী পটভূমি থেকে আগত ছিল বলে বেঞ্চে বা বাসে করে সমান ঠাসাঠাসি আবাসিক হলে নিয়ে যাওয়ার সময় তরুণদের সাথে ঠেলাঠেলি করা সমানভাবে অসহনীয় মনে করেছে। শিক্ষা ছিল মুখস্ত করার বিষয় এবং পরীক্ষায় সাফল্য নির্ভর করত লেকচার নোট ও প্রফেসরদের দেওয়া ম্যানুয়ালের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তির উপর। হিউম্যানিটিজ, আইন, সমাজ বিজ্ঞান ‘গারবেজ ফ্যাকাল্টি’ হিসাবে পরিচিত ছিল, কার্যত বাতিল। ব্যক্তিগত প্রবণতা যাই হোক না কেন, ছাত্ররা চিকিৎসা বিজ্ঞান, ফার্মাকোলজি, ওডোন্টোলজি, এঞ্জিনিয়ারিং বা অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হত, নয়তো সবচেয়ে বাজে প্রফেসরদের কাছে শিক্ষা লাভের জন্যে নিজেদের ছেড়ে দিতে হত; ফলে গ্র্যাজুয়েশনের পর ভালো একটা কাজ পাওয়ার সুযোগ আরও কমে যেত। এমনি পটভূমিতে ছাত্ররা মানবতা বা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে ভাববার প্রশিক্ষণ পেত না। বরং নিস্পৃহ ও প্রাণহীনভাবে বিভিন্ন তথ্য হজম করতে হত তাদের। তো আধুনিক সংস্কৃতির সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল পৌনঃপুনিকভাবে উপরিগত, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার থেকে গেছে সম্পূর্ণ স্পর্শের বাইরে।৩৭
জামাত অল্প কিছু বই-পুস্তক বা প্যামফ্লেট বের করেছিল, কিন্তু ১৯৮০ সালে আল-দাওয়াহর জন্যে ইসলাম আল-দিন আল-আরিয়ার রচিত একটি নিবন্ধ তাদের মূল ধারণাকে তুলে ধরে। স্পষ্টতই সায়ীদ কুতবই ছিলেন অনুপ্রেরণা; জামাত বিশ্বাস করেছে মিশরিয়দের সময় এসেছে বহুদিন ধরে দেশের উপর প্রাধ্যান্য বিস্তার করে থাকা পাশ্চাত্য ও সোভিয়েত আদর্শ ঝেড়ে ফেলে ইসলামে ফেরার। মিশর এখনও কার্যত বিধর্মীদের হাতে শাসিত হচ্ছে, মহান ধর্মীয় জাগরণ ছাড়া প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবার নয়।৮ জামাত বিভিন্ন ধারণা নিয়ে আলোচনায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং নিজস্ব পরিস্থিতিতে সৃজনশীল ও বাস্তবভিত্তিকভাবে সেগুলো প্রয়োগ করেছে। ১৯৭৩ সালে ছাত্ররা প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে সামার ক্যাম্প স্থাপন করতে শুরু করে। ৩৯ এখানে কোরান পাঠ করত তারা, রাতে একসাথে প্রার্থনা করত ও ইসলামের সোনালি অতীত, পয়গম্বরের জীবন ও ব্রত এবং চার রাশিদুনদের জীবন কথা শুনত। দিনের বেলায় আত্মরক্ষার জন্যে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও ক্লাস করত। কয়েক সপ্তাহর জন্যে ছাত্ররা সম্পূর্ণ ইসলামি কায়দায় জীবন যাপন করত। এক অর্থে এটা ছিল সাময়িক হিজরা, মূলধারার সমাজ থেকে এমন জগতে অভিবাসন যেখানে কোরান অনুযায়ী জীবন যাপন করে জীবনে এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারত। সত্যিকার অর্থে ঐশীগ্রন্থের শিক্ষাকে সমর্থনকারী পরিবেশে বাস করার অভিজ্ঞতা লাভ করত। এই শিবিরগুলো শাসকগোষ্ঠীর অনৈসলামিক মুসলিম জীবনাচারের বিপরীতে ইসলামি ইউটোপিয়ার এক ধরনের স্বাদ যোগাত তাদের। যাজক ও বক্তাগণ আধুনিক অভিজ্ঞতার তিক্ত হতাশার কথা তুলে ধরতেন, ইউরোপ বা আমেরিকায় যা হয়তো চমৎকার ফল দিয়েছে, কিন্তু মিশরে কেবল ধনীদেরই কাজে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে ফিরে ক্যাম্পাসে তাদের অভিজ্ঞতার খানিকটা রূপায়িত করার প্রয়াস পেত ছাত্ররা। সরকারী পরিবহনে নিয়মিত হয়রানির শিকার থেকে নিস্তার দিতে নারী ছাত্রদের জন্যে মিনিবাস সেবা চালু করেছিল তারা। লেকচার হলে একই কারণে লিঙ্গের বিচ্ছিন্নতার উপর জোর দিয়েছে; নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যেই ইসলামি পোশাক পরার কথা বলেছে। দীর্ঘ আবৃতকারী জোব্বা পাশ্চাত্য কায়দার ডেটিং-এর প্রতি অনুকূল নয় এমন প্রথাগত সমাজে, যেখানে (অর্থনৈতিক কারণে বিয়ে কোনও পছন্দ ছিল না) যৌন হতাশা ছিল মিশরিয় তরুণ সমাজের একটি প্রধান সমস্যা, অনেক বেশি বাস্তবভিত্তিক ছিল। মসজিদে মসজিদে পুনরালোচনার অধিবেশনেরও আয়োজন করে জামাত, ছাত্ররা এখানে শোরগোলময়, জনাকীর্ণ আবাসিক হলে সম্ভব নয় এমন নিরিবিলি পরিবেশে পাঠ করার সুযোগ পেত। এইসব কৌশল কার্যকর ছিল। প্রথম নজীরে স্রেফ বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচতে একজন ছাত্র ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতে পারত বা লেকচার হলে বিচ্ছিন্ন সারিতে যোগ দিত, কিন্তু একই সময়ে সেই মেয়েটি সচেতন হয়ে উঠত যে তার মঙ্গলের ক্ষেত্রে জামাতের চেয়ে শাসকগোষ্ঠী কম উদ্বিগ্ন। মসজিদে পড়াশোনা করতে উত্তাল ডরমিটরি ছেড়ে ছাত্র ছোট প্রতীকী হিজরা পালন করত এবং ইসলামি পটভূমি তার পক্ষে বেশি কার্যকর বলে জানতে পারত। অনেক ছাত্রই গ্রামের পটভূমি ও ঐতিহ্যবাহী প্রাক আধুনিক সমাজ থেকে এসেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আধুনিকার অভিজ্ঞতা তাদের কাছে কেবল অচেনা, নৈর্ব্যক্তিক ও হতবুদ্ধিকরই ঠেকেনি, বরং মাঝারি মাপের শিক্ষা লাভের সময় শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনায় তাদের সক্ষম করে তুলতে অন্য কোনও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ও দেওয়া হয়নি। এমনি এক বিশ্বে অনেকেই কেবল ইসলামই অর্থ প্রকাশ করে বলে আবিষ্কার করবে। পাশ্চাত্য পর্যবেক্ষকগণ বিশেষ করে নারীদের বোরখায় ফিরে যাবার দৃশ্যে হতাশ বোধ করেছেন, একে লর্ড ক্রোমারের আমল থেকে ইসলামি পশ্চাদপদতা ও পুরুষতান্ত্রিকার প্রতীক ভেবে এসেছেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তব কারণে স্বেচ্ছায় ও পাশ্চাত্য পরিচয় প্রত্যাখ্যানের উপায় হিসাবে ইসলামি পোশাক বেছে নেওয়া মুসলিম নারীদের কাছে ব্যাপারটা সেভাবে অনুভূত হয়নি। বোরখা, স্কার্ফ ও দীর্ঘ পোশাক উত্তর উপনিবেশিক আমলে ইসলামিস্টদের দারুণ কষ্টের সাথে প্ৰয়াস পেয়ে আসা ‘সেই সত্তায় প্রত্যাবর্তনের’ প্রতীক হতে পারে। শত হোক পাশ্চাত্য পোশাকআশাকে পবিত্রতার কোনও ব্যাপার নেই। সব মহিলাকে এই পোশাক পরতে দেখার ইচ্ছা ইসলামিস্টদের কাছে ‘পশ্চিম’কে ‘বাকি’ বিশ্বের মেনে নেওয়ার মতো রীতি হিসাবে দেখার প্রবণতা মনে হয়েছে। বছর পরিক্রমায় বোরখা পরা নারী ইসলামি আত্ম-নির্ভরতা ও পাশ্চাত্য সাংস্কৃতির আধিপত্যের প্রত্যাখ্যানের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। আড়াল বেছে নিয়ে নারীটি ‘সবকিছু উন্মুক্ত করার’ বাধ্যবাধকতাসহ পশ্চিমের যৌন আচারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পশ্চিমা নারী-পুরুষ যেখানে দেহকে জিম ও শরীরচর্চার ক্ষেত্রে মানবীয় ইচ্ছার অধীনে নিয়ে আসার প্রয়াস পেয়েছে এবং সময় ও বয়সের প্রক্রিয়ার কাছে দেহকে দুর্গম করে জীবনকে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছে, সেখানে আবৃত ইসলামি দেহ আভাসে ঘোষণা করছে যে এটা স্বর্গীয় নির্দেশের অধীন, এই বিশ্ব নয় বরং দুর্ভেয়মুখী। পশ্চিমে নারী-পুরুষ প্রায়শঃই তাদের অনেক ব্যয়ে অর্জিত তামাটে ও শানানো গায়ের রঙ প্রদর্শন করে বা অনেক সময় অধিকারের প্রতীক হিসাবে জাহির করে। একই রকম পোশাকের স্তরে আবৃত মুসলিম দেহও ইসলামি দর্শনের মানের উপর গুরুত্ব আরোপ করে। একইভাবে সেগুলো পাশ্চাত্য আধুনিকতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের উপর সম্প্রদায়ের কোরানের আদর্শকে তুলে ধরে। অনেকটা একইভাবে শুকরির মুস্তাফা’স কমিউনসের মতোই আবৃত ইসলামি নারীরা আধুনিক চেতনার অন্ধকার দিকের ইঙ্গিতময় সমালোচনা।৪১
