১৯৬৫ সালে নাসের সরকারের হাতে সোসায়েটি অভ মুসলিম ব্রাদার্সের লিফলেট বিলির দায়ে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হয়েছিলেন শুকরি, তখন তাঁর বয়স ছিল তেইশ বছর।৩২ এই সামান্য অপরাধের দায়ে ছয় বছর নাসেরের শিবিরে কাটিয়েছেন তিনি, এই সময় মাওদুদি ও কুতবের রচনা পাঠ করেছেন এবং আরও অনেক মুসলিম ব্রাদারের মতো নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। কারাগারে এইসব চরমপন্থী মুসলিমরা সায়ীদ কুতবের নির্দেশনা মোতাবেক কঠোর বিচ্ছিন্নতার অনুশীলন করেছে। অন্য কারাবন্দি ও প্রবীন, অধিকতর মডারেট ব্রাদারদের থেকে নিজেদের আলাদা কেরে নিয়েছে, জাহিলি ঘোষণা করেছে তাদের। অবশ্য কেউ কেউ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কুতব বিশ্বাস করতেন যে, জাহিলি সমাজের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করতে তাঁর ভ্যানগার্ডের আরও অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। প্রথমে অবশ্যই মুহাম্মদীয় কর্মসূচির প্রথম তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে তাদের, নিজেদের আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। কারাবন্দি কোনও কোনও চরমপন্থী তারা এখন ‘দুর্বলতা’র একটা পর্যায়ে রয়েছে বলে একমত হয়েছিল, অশুভ শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। উপযুক্ত সময় না আসা পর্যন্ত আপাতত জাহিলি সমাজেই স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে তারা। কিন্তু শুকরি ছিলেন ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা’র (মাফসালাহ কামিলিয়াহ) পক্ষের আরও চরমপন্থী দলের সদস্য: তাদের গোষ্ঠীতে যোগ দেয়নি এমন যে কেউ বিধর্মী, প্রকৃত বিশ্বাসীদের তাদের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই। সতীর্থ বন্দিদের সাথে কথা বলতে অস্বীকার যেত তারা, প্রায়শঃই লেগে থাকত হাতাহাতি মারপিট।
১৬ই অক্টোবর, ১৯৭১-এ শুকরিকে আবু যাবাল ক্যাম্প থেকে মুক্তি দেওয়া হলে একটি নতুন দল গঠন করেন তিনি; এর নাম দেন সোসায়েটি অভ মুসলিমস। এর সদস্যরা কুতবের ভ্যানগার্ড হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল, নিজেদের তাঁর কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজে নিবেদন করেছিল তারা। সেই অনুযায়ী জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণের লক্ষ্যে মূলধারার সমাজ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। গোটা মিশরিয় সমাজই দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মসজিদে উপাসনা করতে অস্বীকার করে তারা, ধর্মীয় ও সেক্যুলারিস্ট নির্বিশেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমাজচ্যুতির (তাকফির) ফতওয়া জারি করে। কেউ কেউ শুকরির নিজ আবাস আসিউতের আশপাশের মরুভূমি ও পাহাড়ী গুহায় অভিবাসন করে। বেশিরভাগই বড় বড় শহরের উপকণ্ঠে সবচেয়ে বঞ্চিত পাড়ার আসবাবপত্রে সাজানো ঘরে থাকত, এখানে সত্যিকারের ইসলামি ধারায় জীবন যাপনের চেষ্টা করত তারা। ১৯৭৬ সাল নাগাদ সোসায়েটি অভ মুসলিমসের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার। তারা বিশ্বাস করেছিল যে আল্লাহ বর্তমান জাহিলিয়াহর ধ্বংসাবশেষের উপর খাঁটি উম্মাহ গঠনের লক্ষ্যে তাদের মনোনীত করেছেন। আল্লাহ’র হাতে রয়েছে ওরা। এখন তারা উদ্যোগ গ্রহণ করায় আল্লাহই বাকি কাজ শেষ করবেন। সোসায়েটির উপর কড়া নজর রেখেছিল পুলিস, কিন্তু নিরীহ উন্মাদ ও ঝরে পড়াদের দল বলে নাকচ করে দিয়েছিল তাদের।৪ কিন্তু সাদাত ও তাঁর পরমর্শকরা এই তরুণ, মরিয়া মৌলবাদীদের জীবনযাত্রার দিকে একবার নজর দেওয়ার কথা ভাবলে হয়তো দেখতেন এই মুসলিম সম্প্রদায়গুলো খোলা দুয়ার নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিবিম্ব ও আধুনিক মিশরের অন্ধকার দিক তুলে ধরেছে।
শুকরির গোটা মিশরিয় সমাজকেই অস্পৃশ্য ঘোষণা করা হয়তো বাড়াবাড়ি হয়ে থাকতে পারে, তবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল না। সাদাতের মিশরে যতবেশি মসজিদই নির্মিত হয়ে থাকুক না কেন, যে সমাজে একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠীর দখলে সব সম্পদ থাকে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নৈরাশ্যজনক দারিদ্র্যে বাস করে সেই সমাজে ইসলামি বলে কিছু থাকে না। সোসায়েটির সদস্যদের শহরের সবচেয়ে করুণ মহল্লায় হিজরা বা ‘অভিভাসন’ বহু তরুণ মিশরিয়র দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থাও তুলে ধরেছে, তাদের মনে হয়েছে মিশরে তাদের জন্যে কোনও জায়গা নেই, নিজ দেশ থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে তাদের। সোসায়েটির কমিউনগুলো তরুণদের হাতে পরিচালিত হত, আরও অনেক মিশরিয় তরুণের মতো তাদের উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহে পাঠিয়েছিলেন শুকরি। সোসায়েটির অনেক সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা লাভ করেছিল, কিন্তু শুকরি ঘোষণা করেছিলেন যে, সেক্যুলার শিক্ষা সময়ের অপচয়; মুসলিমের প্রয়োজন কেবল কোরান। এটা আরেকটা চরম অবস্থান, তবে এতে সত্যির খানিকটা অংশ আছে। ১৯৭০ দশকে বহু মিশরিয়র প্রাপ্ত শিক্ষা তাদের কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন ছিল। শিক্ষা ও তার পদ্ধতিই কেবল ব্যাপকভাবে অপর্যাপ্ত ছিল না, বরং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া ডিগ্রি এমনকি একজন গ্র্যাজুয়েটের ভালো চাকরি লাভের নিশ্চয়তা দিত না: বিদেশের কোনও বাড়িতে আয়ার কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের চেয়ে বেশি বেতন পাওয়ার সুযোগ ছিল।৩৫
সোসায়েটি যতদিন লো-প্রোফাইল বজায় রেখেছে, শাসকগোষ্ঠী তাদের নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু ১৯৭৭ সালে আড়াল ছেড়ে বের হয়ে আসেন শুকরি। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি গ্রুপগুলো সোসায়েটির কিছু সদস্যকে প্রলুব্ধ করে নিজেদের দলে নিয়ে গিয়েছিল। এই দলত্যাগীরা শুকরির চোখে মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত ধর্মদ্রোহীতে পরিণত হয়েছিল। তাঁর শিষ্যরা তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার হামলা চালাতে শুরু করে, ফলে হত্যা প্রচেষ্টার দায়ে সোসায়েটির চৌদ্দজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাথে সাথে আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে যান শুকরি। ১৯৭৭ সালের পরবর্তী ছয় মাসে সতীর্থদের মুক্তির দাবিতে প্রচারণা চালিয়ে যান তিনি, খবর কাগজে নিবন্ধ পাঠান, এবং রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারণার প্রয়াস পান। এই শান্তিপূর্ণ উপায় ব্যর্থ হলে সহিংসতার আশ্রয় নেন শুকরি। সোসায়েটিকে ধর্মদ্রোহী হিসাবে নিন্দা করে একটি প্রবন্ধ লেখায় ৭ই জুলাই মুহাম্মদ আল- দাহাবিকে অপহরণ করেন। অপহরণের এক দিন পর, তিনটি মিশরিয় পত্রিকা এবং সেই সাথে অন্য কয়েকটি মুসলিম দেশ, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস ও লন্ডনেও একটি বার্তা প্রকাশ করেন শুকরি। শিস্যদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি করেন, প্রচারমাধ্যমে সোসায়েটির পাওয়া নেতিবাচক প্রচরণার জন্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার উপর জোর দেন এবং শাসকগোষ্ঠীর আইনি ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা সেবা সম্পর্কে তদন্ত করার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। সাদাত তাঁর গোপন পুলিসের কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে দেবেন, এমন সম্ভাবনাই ছিল না: স্পষ্টতই কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গেছেন তার প্রকৃতি বুঝে উঠতে পারেননি শুকরি। কয়েক দিন পরে দাহাবির লাশ আবিষ্কৃত হলে, শুকরি ও তাঁর শত শত শিষ্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। দ্রুত বিচার অনুষ্ঠানের পর স্বয়ং শুকরি ও সেসায়েটির পাঁচজন নেতৃস্থানীয় সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। সংবাদমাধ্যম প্রত্যাখ্যানবাদী ও নিন্দাবাদী আদর্শের জন্যে এই গোষ্ঠীটির নাম দিয়েছিল তাকফির আল হিজরা (‘সমাজচ্যুতি ও অভিবাসন’)।৩৬ অনেক মৌলবাদী ধর্মতত্ত্বের মতো ক্রোধ ও প্রান্তিকীকরণের অভিজ্ঞতা থেকে এর উদ্ভব হয়েছিল, কিন্তু শুকরির কাহিনী আমাদের এ কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, এই ধরনের সমাজকে সব সময় উন্মাদ ভাবা ঠিক নয়। ভারসাম্যহীন ও করুণভাবে ভুল বোঝা শুকরি এমন এক প্রতি- সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন যা পশ্চিমে দারুণ উৎসাহের সাথে তারিফ করা তাদের নতুন মিশরের অন্ধকার দিক তুলে ধরেছে। আসলে কী ঘটছে তার এক বিকৃত, অতিরঞ্জিত রূপ এবং যাকে আর নিজেদের ভাবতে পারছিল না এমন এক দেশে অসংখ্য তরুণের বিচ্ছিন্নতা তুলে ধরেছে।
