তারপরেও উপরে উপরে সাদাত ধর্মের জন্যে ভালো ছিলেন। নিজ শাসনের পক্ষে নাসের থেকে ভিন্ন পরিচয় গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল তাঁর। মুহাম্মদ আলির আমল থেকেই মিশরিয়রা বারবার আধুনিক বিশ্বে পা রাখার প্রয়াস পেয়েছে এবং সেখানে নিজেদের একটা অবস্থান পেতে চেয়েছে। পশ্চিমকে অনুকরণ করেছে তারা, পশ্চিমা নীতিমালা ও আদর্শ গ্রহণ করেছে, স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করেছে আর আধুনিক ইউরোপিয় ধারায় সংস্কৃতিকে সংস্কারের প্রয়াস পেয়েছে। এর কোনওটাই সফল হয়নি। ইরানিদের মতো অনেক মিশরিয় মনে করেছে এবার ‘নিজেদের মাঝে প্রত্যাবর্তন’ ও একটি আধুনিক অথচ স্পষ্টভাবে ইসলামি পরিচয় গড়ে তোলার সময় হয়েছে। সাদাত খুশি মনে এটিকে কাজে লাগিয়েছেন। পাশ্চাত্য কায়দায় ইসলামকে রাষ্ট্রের অধীন সরকারী ধর্মে পরিণত করতে চেয়েছিলেন তিনি। নাসের যেখানে ইসলামি গ্রুপগুলোর উপর নির্যাতন চালিয়েছেন, সাদাত সেখানে নিজেকে তাদের মুক্তিদাতা হিসাবে তুলে ধরেছেন। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের ভেতর বিভিন্ন কারাগার ও শ্রম-শিবিরে ভুগতে থাকা মুসলিম ব্রাদারদের মুক্তি দিয়েছেন। ধর্মীয় বিভিন্ন গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণকারী নাসেরের বিভিন্ন কঠোর আইন শিথিল করেছেন, তাদের সভা-সমাবেশ, প্রচারণা ও প্রকাশনার অনুমতি দিয়েছেন। মুসলিম ব্রাদারহুডকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সোসায়েটি হিসাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া না হলেও ব্রাদাররা প্রচারণা চালাতে এবং নিজেদের পত্রিকা আল-দাওয়াহ (‘আহ্বান’) প্রকাশ করতে পারছিল। মসজিদ নির্মাণের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল, ইসলামের জন্যে রেডিওতে সময় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ইসলামি ছাত্র গ্রুপগুলোকেও প্রশ্রয় দিয়েছেন সাদাত, সমাজতন্ত্রী ও নাসেরবাদীদের কাছ থেকে ক্যাম্পাসের দখল ছিনিয়ে নিতে উৎসাহ দিয়েছেন তাদের। নাসের ধর্মকে দমন করতে চেয়েছিলেন এবং এই নির্যাতনমূলক কৌশল উল্টোফলদায়ী আবিষ্কার করেছেন। এর ফলে সায়ীদ কুতব প্রচারিত অধিকতর চরম ধার্মিকতার উত্থান ঘটেছিল। সাদাত এবার ধর্মকে নিজের মতলব হাসিলের কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। এটাও করুণ ভ্রান্তি হিসাব প্রমাণিত হবে।
প্রথম দিকে অবশ্য সাদাতের নীতি সফল মনে হয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ, মুসলিম ব্রাদারহুড যেন যথার্থ শিক্ষা পেয়েছে বলে মনে হয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তি প্রাপ্ত প্রবীন রাজনীতিবিদগণকে সায়ীদ কুতব ও সিক্রেট অ্যাপারেটাসের দায়িত্ব গ্রহণে অনিচ্ছুক মনে হয়েছে, হাসান আল-বান্নার অহিংস, সংস্কারমূলক নীতিমালায় ফিরে যেতে চেয়েছেন তাঁরা। ব্রাদাররা মুসলিম আইনে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র দেখতে চাইলেও একে কেবল শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত পথেই অর্জন সম্ভব একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হিসাবে বিবেচনা করেছে।২৭ কিন্তু তারপরেও সোসায়েটির আদি আদর্শে ফিরে যাবার দাবি করলেও বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংগঠনে পরিণত হয়েছিল ব্রাদারহুড। বান্না যেখানে বিশেষভাবে মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকশ্রেণীর কাছে আবেদন রেখেছিলেন, পণ্ডিতদের ভাষায় ‘নব্য ব্রাদারহুড’ সেখানে সাদাতের খোলা দুয়ার নীতি থেকে লাভবান হয়েছিল, বুর্জোয়াদের আকর্ষণ করেছিল। এরা ছিল সমৃদ্ধশালী, আরামপ্রিয় ও শাসকগোষ্ঠীর সাথে সহযোগিতায় প্রস্তুত। এই নতুন ব্রাদারহুড সাদাতের মিশর থেকে ক্রমবর্ধমানহারে বিচ্ছিন্ন বোধকারী ক্লান্তিকর বঞ্চনার শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারেনি। শাসকের বিরোধিতা করার মতো ভিন্ন কোনও অনুমোদিত ধরন না থাকায় অসন্তুষ্টদের অনেকেই আরও চরম ইসলামি পন্থার খোঁজ করেছে।২৮
কিন্তু অচিরেই সাদাতের নীতিমালা এমকি নব্য ব্রাদাহুডকেও ক্ষিপ্ত করে তোলে। এর প্রায় ৭৮,০০০ প্রচার সংখ্যার জার্নাল আল-দাওয়াহ প্রতি মাসে ইসলামের চার ‘শত্রু’র সংবাদ প্রকাশ করছিল: পাশ্চাত্য ক্রিশ্চান ধর্ম (এর অন্তস্থঃ সাম্রাজ্যবাদকে তুলে ধরার জন্যে সাধারণভাবে আল-সালিবিয়াহ, দ্য ক্রুসেড), কমিউনিজম, সমাজতন্ত্র (আতাতুর্ক কর্তৃক রূপায়িত) ও যায়নবাদ। বিশেষ করে ‘ইহুদিগোষ্ঠী’কে অন্য তিনশত্রুর সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত চূড়ান্ত অশ্লীলতা মনে করা হত। আল-দাওয়াহর নিবন্ধগুলো মদীনায় পয়গম্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী ইহুদিদের নিয়ে কোরানের অনুচ্ছেদসমূহ উদ্ধৃত করত, এবং ইহুদি বিশ্বাস সম্পর্কে ইতিবাচক বক্তব্য ধারণকারী অনুচ্ছেদগুলো বাদ দিয়ে যেত।২৯ আল-দাওয়াহ’র অ্যান্টি-সেমিটিজম পয়গম্বরের আমল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে দাবি করা হয়, কিন্তু আসলে তা সাম্প্রতিককালে ইসলামি উদ্ভাবন, ইসলামি উৎসের চেয়ে বরং দ্য প্রটোকল অভ দ্য এল্ডারস অভ যায়ন-এর উপর বেশি নির্ভর করেছে। সুতরাং, ক্যাম্প ডেভিডের পর নব্য ব্রাদারদের পক্ষে সাদাতের অনুগত থাকা আর সম্ভব ছিল না। গোটা ১৯৭৮ সাল জুড়ে আল-দাওয়াহ শাসক গোষ্ঠীর ইসলামি বৈধতাকে প্রশ্ন করে গেছে। ১৯৮১ সালের মে সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী ডোম অভ দ্য রককে শেকলে জড়ানো ও স্টার অভ ডেভিডের ছবিঅলা তালা দিয়ে আটকানো অবস্থায় তুলে ধরে।
কিন্তু সাদাতের ঐতিহাসিক জেরুজালেম সফরের সময় অধিকতর চরমপন্থী মুসলিম গোষ্ঠী আলোয় বের হয়ে এসেছিল। এর নেতৃবৃন্দ বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা ও সাবেক সরকারের মন্ত্রী মুহাম্মদ আল-দাহাবির হত্যার অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন। মিশরিয়রা এই মুসলিম যুবকদের কাছে প্রথম চার জন ‘সঠিক পথে পরিচালিত’ (রাশিদুন) খলিফার আমল থেকেই ইসলাম পতনের মুখে রয়েছে, সেই সময়ের পর অর্জিত সমস্ত ইসলামি বিকাশ বহুঈশ্বরবাদীতা ছাড়া আর কিছু না, গোটা মিশর প্রেসিডেন্ট ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জাহিলিয়াহ যুগের জেনে ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিল। গোষ্ঠীটি ঘোষণা করেছিল যে এই জাহিলিকে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে এবং এর ধ্বংসস্তূপের উপর কোরান ও সুন্নাহ ভিত্তিক সত্যিকারের মুসলিম সমাজ গড়ে তুলতে হবে। গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা শুকরি মুস্তাফাকে আল্লাহ নতুন বিধান সৃষ্টি এবং মুসলিমদের ইতিহাসকে ফের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে মনোনীত করেছেন।৩১
