*
বেগিন একাই ক্যাম্প ডেভিড প্রশ্নে ধর্মীয় বিরোধিতার মোকাবিলা করছিলেন না। তাঁর মিশরিয় প্রতিপক্ষ আনোয়ার সাদাত নিজ দেশে মুসলিম বিরোধী পক্ষের সাথে আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। সাদাতের শান্তি উদ্যোগ তাঁকে পশ্চিমে প্রিয়ভাজন ও জনপ্রিয় করে তুলেছিল, কিন্তু সমাজের বহু ক্ষেত্রেই শান্তি জনপ্রিয় হলেও মিশরিয়রা তাদের প্রেসিডেন্টের ব্যাপারে অনেক বেশি দোলাচলে ভুগছিল। ছয় দিনের যুদ্ধের বিপর্যয় সত্ত্বেও নাসেরকে জনগণ দারুণভাবে ভালোবাসত। সাদাত কখনওই সেই ধরনের ভক্তি অনুপ্রাণিত করতে পারেননি। তিনি সব সময়ই রাজনৈতিকভাবে তুচ্ছ বিবেচিত হয়েছেন, ১৯৭১ সালে প্রথমবারের ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি অভ্যুত্থান প্রয়াসকে ভণ্ডুল করতে হয়। ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের তুলনামূলক সাফল্য অবশ্য সেভাবে সাদাতের বৈধতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়নি।২৩ যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ করে এবং আরব আস্থা ফিরিয়ে এনে জনগণকে শান্তি প্রক্রিয়ার পথে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন তিনি, এই শন্তি মিশরকে সাহায্য করবে ও পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক মেরামত করবে বলে বিশ্বাস ছিল তাঁর।
১৯৬৭ সালের পরাজয়ের পর নাসের সমাজতন্ত্র থেকে কিছুটা পিছু হটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ধর্মীয় আবহও টের পেয়েছিলেন তিনি। মুসলিম ব্রাদাররা কারাগারে থাকলেও নাসের আবারও তাঁর ভাষণ ইসলামি বুলি দিয়ে সাজাতে শুরু করেছিলেন। সাদাতের অধীনে এই দুটো প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালে নাসের নিয়োজিত ১৫০০ সোভিয়েত উপদেষ্টাকে বরখাস্ত করেন তিনি এবং ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের পর মিশরকে পুঁজিবাদী বিশ্ব বাজারে নিয়ে আসার লক্ষ্যে একটি নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেন। এই নতুন অর্থনৈতিক উদ্যোগের নাম দিয়েছিলেন তিনি ইনফিতাহ (খোলা দুয়ার’)।২৪ অবশ্য অর্থনীতিক ছিলেন না সাদাত, আর মিশরের অর্থনৈতিক সমস্যা সব সময়ই অ্যাচিলিসের গোড়ালি ছিল, ইনফিতাহর কারণে এর আরও অবনতি ঘটে। মিশরকে নিশ্চিতভাবেই উন্মুক্ত করে দিয়েছিল: বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক আমদানি পণ্য দেশে প্রবেশ করে। সুবিধাজনক কর ব্যবস্থার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিনিয়োগকারীদের তোষামোদ করা হয়। ফলে মিশর সত্যিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। খোলা দুয়ার উদীয়মান স্বল্পসংখ্যক বুর্জোয়ার পক্ষেও লাভজনক ছিল, বিপুল অর্থের মালিক বনে গিয়েছিল মুষ্টিমেয় মিশরিয়। কিন্তু দুর্ভোগের শিকার হয়েছিল বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। অনিবার্যভাবে বিদেশী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি মিশরিয় ব্যবসা; দুর্নীতি ছিল, অভিজাত গোষ্ঠেীর বাড়াবাড়ি রকমের ভোগবাদ দারুণ বিতৃষ্ণা ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে তরুণ সমাজ নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেছে। এদের মাত্র চার শতাংশ শোভন কাজের প্রত্যাশা করতে পারত; বাকি অংশকে সামান্য সরকারী খাতের বেতনে বেঁচে থাকতে হচ্ছিল, বাড়তি সময়ে রাতে কাজ করে পুষিয়ে নিতে হত-প্রায়শঃই ট্যাক্সি ড্রাইভার, প্লাম্বার ও ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করতে হত তাদের। ভদ্র আবাস ছিল সাধ্যাতীত ব্যয়বহুল, এর মানে, তরুণ-তরুণীদের প্রায়শঃই বিয়ে করে সংসার পাতার জন্যে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে হত। একমাত্র আশা ছিল অভিবাসন। হাজার হাজার মিশরিয় বাড়ি ছেড়ে লম্বা সময়ের জন্যে তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে বাস করতে বাধ্য হয়েছে, এখানে তারা ভালো বেতন পেত, পরিবারের কাছে টাকাকড়ি পাঠাতে পারত ও ভবিষ্যতের জন্যে সঞ্চয় করতে পারত। কৃষকরাও উপসাগরীয় এই যাত্রায় যোগ দিয়েছিল, কেবল বাড়ি নির্মাণ বা ট্র্যাক্টর কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা জমানোর পরেই ফিরে আসত তারা।২৫ ইনফিতাহ সাদাতকে পশ্চিমের কাছে প্রিয় করে তুললেও এর মানে ছিল অধিকাংশ মিশরিয় স্রেফ নিজ দেশে বাস করতে পারছিল না, বাধ্য হচ্ছিল অভিবাসনে।
আমেরিকান ব্যবসা ও সংস্কৃতি শেকড় গেড়ে বসার সাথে সাথে বহু মিশরিয়র কাছে মিশর যেন অচেনা ও পাশ্চাত্য ঠেকছিল। জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন সাদাত। তিনি ও তাঁর স্ত্রী বিলাসী পশ্চিমা জীবনযাত্রা অনুসরণ করতেন, বেশ ঘন ঘন তাদের বিদেশী সেলিব্রিটি ও চিত্রতারকাদের আপ্যায়ন করতে দেখা যেত, তাঁরা অ্যালকোহল পান করতেন বলে সুবিদিত ছিল, অধিকাংশ জনগণের দুর্ভোগ থেকে দূরে কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সাজ্জিত অসংখ্য জাঁকাল রেস্ট হাউসে বিলাস বহুল জীবন যাপন করতেন। সাদাতের সযত্নে গড়ে তোলা ধর্মীয় ইমেজের সাথে এর কোনও মিল ছিল না। সুন্নি ঐতিহ্যে একজন ভালো মুসলিম শাসককে জনগণের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বরং সহজ সরল জীবন যাপন ও যত দূর সম্ভব সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।২৬ দেশের নতুন ধর্মীয় জোয়ারের সাথে সম্পর্কিত হতে নিজেকে ‘ধার্মিক প্রেসিডেন্ট’ আখ্যায়িত করে ও দিনে পাঁচবার প্রার্থনায় নত হন বোঝাতে সংবাদ মাধ্যমকে কপালে স্পষ্ট ‘ছাইচিহ্ন’সহ মসজিদে প্রার্থনারত অবস্থায় তাঁর ছবি প্রকাশে উৎসাহিত করে অনিবার্যভাবে মুসলিমদের তাঁর অসল আচরণ ও আদর্শের ভেতর তুলনা করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন সাদাত।
