নিষ্কৃতি কেবল ইসরায়েলের নিষ্কৃতি নয়, বরং গোটা পৃথিবীর নিষ্কৃতি। কিন্তু ইসরায়েলের নিষ্কৃতির উপরই বিশ্বের নিষ্কৃতি নির্ভর করছে। এখান থেকেই সারা পৃথিবীর উপর আমাদের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব সৃষ্টি। ইসরায়েলের গোটা ভূমিতে বাসকারী জনগণের কাছ থেকে মানবজাতির কাছে আবির্ভূত হবে আশীর্বাদ।১৮
কিন্তু বাস্তববাদী, সেক্যুলার ধারায় পরিচালিত বিশ্বে এই অতীন্দ্রিয়বাদী আজ্ঞা বাস্ত বায়ন অসম্ভব প্রতীয়মান হয়েছে। বেগিনের বাগাড়ম্বর যতই যুদ্ধংদেহী বা বাইবেলিয় হোক না কেন, রাজনীতির বাস্তব লোগোসের ভেতর মিথোসের হস্তক্ষেপের সুযোগ দানের কোনও ইচ্ছা তাঁর ছিল না। একেবারে গোড়া থেকেই দক্ষতা ও কার্যকারিতা ছিল আধুনিক চেতনার মূলকথা। বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক বিবেচেনা ও নীতিমালায় চরম নীতিমালাকে আশ্রয় দিতে হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন ছিল বেগিনের, শান্তি প্রক্রিয়া চেয়েছিল দেশটি।
আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্বে ঈশ্বরের পক্ষে লড়তে চাওয়া মৌলবাদীদের জন্যে বরাবরই এটা বড় সমস্যা হয়ে থাকবে। এই বছরগুলোয় গাশ এমুনিম কিছু পরিমাণ সাফল্য লাভ করেছিল। ১৯৭৮ সালে সরবোন ও মারকায হারাভের ফরাসি স্নাতক শ্লোমো আবিনার পূর্ব জেরুজালেমের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় আতেরেত কোহানিম (‘ক্রাউন অভ প্রিস্ট’) ইয়েশিভা প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ইসলামি বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান ডোম অভ দ্য রকের অধিকৃত টেম্পল মাউন্টের কাছেই ছিল ইয়েশিভাটি। ইয়েশিভার লক্ষ্য ছিল মেসায়াহর আবির্ভাবের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ ও প্রাচীন স্থানে মন্দিরের পুনর্নির্মাণের লক্ষ্যে বাইবেলিয় মন্দিরের বিসর্জন ও প্রিস্টলি কাল্টের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন টেক্সট পাঠ করা। নতুন একটি মন্দির যেহেতু মুসলিম উপাসনালয়ের ধ্বংস বোঝাবে, খোদ ইয়েশিভার প্রতিষ্ঠাই ছিল উস্কানীমূলক, কিন্তু আতেরেত কোহানিম ১৯৬৭ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অগ্রাহ্য করে ইসরায়েলের অধিকার করে নেওয়া প্রাচীন জেরুজালেম শহরে একটি বসতি স্থাপন প্রক্রিয়ারও সূচনা করেছিল। ইয়েশিভা পুরোনো সিনাগগ নির্মাণ ও আরব জেরুজালেমে জোরাল ইহুদি উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করার জন্যে গোপনে মুসলিম মহল্লার আরব সম্পত্তি কিনতে শুরু করেছিল।১৯ ১৯৭৯ সালে গাশ এমুনিম নাবলুসের দক্ষিণ পুবের এলোন মোরেহর নতুন বসতি উচ্ছেদের জন্যে ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করলে এই বছরগুলোয় অর্জিত দ্বিতীয় সাফল্য দেখা দেয়। গাশ এমুনিম গৃহযুদ্ধ ও অনশন ধর্মঘটের হুমকি দেয়, শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালের জানুয়ারির শেষে কেবিনেট বর্তমান বসতিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় অনুসন্ধান ও সুপ্রিম কোর্টের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ভেতরে থেকেই নতুন বসতি স্থাপনের সুযোগ সন্ধানের জন্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। ১৫ই মে, সরকার পশ্চিম তীরে উনষাটটি নতুন বসতি স্থাপনের পাঁচ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা ঘোষণা করে।২০
কিন্তু এইসব বিক্ষিপ্ত সাফল্য সত্ত্বেও গাশ এমুনিমের সোনালি দিনের অবসান ঘটেছিল। নতুন শান্তি ইসরায়েলি জনগণের কাছে জনপ্রিয় ছিল। ১৯৮২ সালে শোচণীয় পরাজয় বরণ করে গাশ। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি পালনের উদ্দেশ্যে ইসরায়েল সিনাইয়ের উপকূলে শ্রমিক দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত সমৃদ্ধিশীল সেক্যুলার শহর ইয়ামিত বসতি থেকে জনগণকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। যায়নবাদের ‘শান্তির ভাইরাসে’ আক্রান্ত হওয়ার ঘোষণা দেন মোশে লেভিংগার।২১ হাজার হাজার পশ্চিমতীরবাসীকে নেতৃত্ব দিয়ে ইয়ামিতে নিয়ে যান তিনি; পরিত্যক্ত বাড়িঘরে গিয়ে ওঠে তারা, তাদের উচ্ছেদ করার ব্যাপারে আইডিএফকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। বেপরোয়া পদক্ষেপ ছিল এটা। বসতি স্থাপনকারীদের রোমের (৬৬–৭২ সিই) বিরুদ্ধে ইহুদি বসতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন লেভিঙ্গার, এই সময় ৯৬০ নারী-পুরুষ ও শিশু রোমান সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের বদলে মাসাদা দুর্গে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। গাশ র্যাবাইগণ ইসরায়েলের দুজন প্রধান র্যাবাইয়ের সাথে পরামর্শ করেন, এঁরা অবশ্য শাহাদৎ বরণের বিরুদ্ধে রায় দেন, এবং আরও একবার শোকে পোশাক ছেঁড়েন র্যাবাই লেভিংগার।২২ বসতিস্থাপনকারীদের উচ্ছেদ করতে আইডিএফ উপস্থিত হলেও ইহুদিদের কারও প্রাণহানি ঘটেনি, তবে শোডাউনের জন্যে প্রস্তুত ছিল গাশ; মুহূর্তের জন্যে ধার্মিক ও সেক্যুলার ইসরায়েল যুদ্ধক্ষেত্রের বিপরীত পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হয়েছিল।
ইয়ামিতের শেষ অবস্থান হয়তো ভীষণ সত্যিকে অস্বীকার করার কৌশল হয়ে থাকতে পারে। কুকবাদীদের এত আস্থার সাথে প্রত্যাশিত মহাজাগরণ ঘটেনি; হতে পারে নিষ্কৃতি আদৌ আসন্ন নয়? এমন ভীরু ভূমি ছাড়দানকারী একটি দেশ কীভাবে পবিত্র হতে পারে? গাশের ধার্মিক সদস্যরা তাদের আরও বেপরোয়া পদক্ষেপের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার এক মেসিয়ানিক প্রত্যাশার ‘মহা হতাশা’ বোধ করছিল। সর্বাত্মক প্রয়াস সত্ত্বেও গাশ বাস্তব জগতে ঈশ্বরের রাজনীতিকে কার্যকর করে তুলতে পারেনি। সিনাই থেকে প্রত্যাহারের অল্প আগে মারা যান র্যাবাই কুক, তাতে পরিত্যাগের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কুকের উত্তরাধিকারী হিসাবে একক কোনও ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেনি, আন্দোলনে ফাটল ধরে। কেউ কেউ ইসরায়েলের প্রকৃত চেতনার পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে ধৈর্য, প্রার্থনা ও শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিদানের পক্ষে কথা বলে। অন্যরা যুদ্ধের জন্যে তৈরি ছিল।
