ক্ষোভ ও রিকনকুয়েস্তার এই আধ্যাত্মিকতায় স্পষ্ট সমস্যা ছিল। ১৯৭৭ সালে ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো শ্রমিক দল সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়। ক্ষমতায় আসে মেনাচেম বেগিনের নেতৃত্বাধীন নতুন ডানপন্থী লিকুদ পার্টি। বেগিন বরাবরই জর্দান নদীর উভয় তীরে একটি ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলে এসেছেন, তো তাঁর নির্বাচিত হওয়াকে প্রথমে ঈশ্বরের আরেকটি কাজ মনে হয়েছিল। নির্বাচনের অল্পপরেই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সেটা, বেগিন অশীতিপর র্যাবাই কুকের সাথে মারকায হারাভে দেখা করতে গেলে তাঁর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নোয়ান তিনি। ‘মনে হচ্ছিল বুঝি শরীরের ভেতর আমার হৃৎপিণ্ড বিস্ফোরিত হচ্ছে,’ পরে স্মৃতিচারণ করেছেন এই ‘পরাবাস্তব দৃশ্যে উপস্থিত দানিয়েল বেন সিমন। ‘[কুকের] ফ্যান্টাসি ও কল্পনাগুলো আসলেই বাস্তব হওয়ার এরচেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে।’১৫ লেভিংগারের খোলামেলা ভক্ত ছিলেন বেগিন, গাশ এমুনিমকে ‘প্রিয় সন্তান’ বলতে ভালোবাসতেন, তাঁর যুদ্ধবাদী নীতি প্রচার করার সময় প্রায়শঃই বাইবেলিয় পরিভাষা ব্যবহার করতেন।
নির্বাচনের পর লিকুদ সরকার অধিকৃত এলাকাসমূহে এক ব্যাপক বসতি উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইসরায়েলের ভূমি কমিশনের নতুন প্রধান আরিয়েল শ্যারন বিশ বছরের মধ্যে পশ্চিম তীরে এক মিলিয়ন ইহুদির বসতি স্থাপনের ইচ্ছা ঘোষণা করেন। ১৯৮১ সালের মাঝামাঝি লিকুদ এইসব এলাকায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে বিশটি বসতি গড়ে তোলে, যেখানে প্রায় ১৮,৫০০ বসতি স্থাপনকারী বাস করে। ১৯৮৪ সালের আগস্ট নাগাদ সরকারীভাবে বসতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১১৩টি, এগুলোর ভেতর গোটা পশ্চিম তীর জুড়ে ছয়টি উল্লেখযোগ্য শহর ছিল। ৪৬,০০০ উগ্র বসতিস্থাপনকারীর হাতে ঘেরাও হয়ে আরবরা ভীত হয়ে ওঠে এবং কেউ কেউ সহিংসতার আশ্রয় নেয়।১৬ সরকারের সমর্থনপুষ্ট গাশ এমুনিমের পক্ষে এর চেয়ে জুৎসই রাজনৈতিক অবস্থা আর হতে পারে না। ১৯৭৮ সালে রাফায়েল এইতান পশ্চিম তীরের প্রতিটি বসতির নিরাপত্তার দায়িত্ব বসতিগুলোর হাতে তুলে দেন, সম্প্রদায়কে রক্ষা এবং রাস্তাঘাট ও ক্ষেত-খামার পাহারা দিতে শত শত বসতিস্থাপনকারীকে নিয়মিত সেনাবাহিনী থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল তাদের। ১৯৭৯ সালের মার্চে সরকার করারোপ, সরবরাহ সেবা ও শ্রমিক নিয়োগের ক্ষমতা দিয়ে পশ্চিম তীরে পাঁচটি আঞ্চলিক কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিম তীরের বসতিস্থাপনকারীদের মাত্র ২০ ভাগের যোগানদার থাকলেও গাশ সদস্যরাই সাধারণত মূল দায়িত্ব পেত।১৭ কার্যত সরকারী কর্মকর্তায় পরিণত হয়েছিল তারা, কিন্তু তা যতই বন্ধুসুলভ হোক না কেন, বহু বছরের সংঘাতের ফলে সরকারের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠেছিল গাশ, লিকুদ পার্টির বিজয়ের পর সদস্যরা তাদের নিজস্ব বসতি কর্মকাণ্ড সংগঠিত ও ঐকবদ্ধ করার লক্ষ্যে আরমানা (‘কোভেন্যান্ট’) এবং তাদের কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়ার জন্যে গাশ বসতির কাউন্সিল মোয়েতযেত ইয়েশা প্রতিষ্ঠা করে।
সন্দিহান থাকা গাশের পক্ষে ঠিকই ছিল, কারণ লিকুদের সাথে মধুচন্দ্রমা ছিল সংক্ষিপ্ত। ২০শে নভেম্বর, ১৯৭৭, শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক জেরুজালেম সফর শুরু করেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত; পরের বছর ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষর করেন বেগিন ও সাদাত। ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে দখল করে নেওয়া সিনাই পেনিনসুলা মিশরকে ফিরিয়ে দেবে, বিনিময়ে মিশর ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে ও সাধারণ সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। চুক্তি শান্তির জন্যে একটা ফ্রেমওয়ার্ক’, ইসরায়েল, মিশর, জর্দান ও ‘ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধিদের’ মধ্যে পশ্চিম তীর ও গাযা স্ট্রিপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার আশা প্রকাশ করেছে। উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই ক্যাম্প ডেভিড বাস্তব চুক্তি ছিল। মিশর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ফিরে পেয়েছে, শান্তি পেয়েছে ইসরায়েল। সিনাই পবিত্র ভূমি ছিল না; বাইবেলে বর্ণিত প্রতিশ্রুত ভূমির সীমানার অন্তর্ভুক্ত নয়। পশ্চিম তীর আরবদের কাছে ফিরিয়ে না দেওয়ার ব্যাপারে সব সময়ই অটল ছিলেন বেগিন; শান্তির ফ্রেমওয়ার্ক আলোচনা কোনওদিনই হবে না, নিশ্চিত ছিলেন তিনি, কারণ অন্য কোনও আরব রাষ্ট্র সেগুলো সমর্থন করবে না। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরের দিন পশ্চিম তীরে বিশটি নতুন বসতি স্থাপন করার সরকারী সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন বেগিন।
এটা ধার্মিক যায়নবাদী, গাশ এমুনিম বা সাধারণভাবে ইসরায়েলি ডানপন্থীদের সন্তুষ্ট করেনি। ৮ই অক্টোবর, ১৯৭৯ র্যাবাই কুকের আশীর্বাদ নিয়ে ক্যাম্প ডেভিডের বিরুদ্ধে লড়াই ও আরও কোনও আঞ্চলিক ছাড় প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে নতুন তেহিয়া (‘রেনেইসাঁ) পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এযাত্রা ধার্মিক ও সেক্যুলার রেডিক্যালরা একই রাজনৈতিক দলে একসাথে কাজ করছিল। ১৯৮১ সালে কুকবাদী ও সাবেক গাহেলেত সদস্য হাইম দ্রুকমান পশ্চিম তীরে আরও বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে চাপ সৃষ্টি করতে নিজস্ব মোরাশা (‘ঐতিহ্য’) পার্টি গঠন করেন। গাশের চোখে ক্যাম্প ডেভিড মোটেই শান্তি ছিল না। তারা শালোম (‘শান্তি’) ও শ্লেমুত (‘সামগ্রিকতা’) শব্দ দুটির উৎপত্তিগত সম্পর্কের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে: সত্যিকারের শান্তির মানে আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের পূর্ণ ভুমির সংরক্ষণ। এখানে কোনও আপোস হতে পারে না। গাশ র্যাবাই এলিয়েযার ওয়াল্ডমান যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ইসরায়েল, যার উপর গোটা পৃথিবীর নিয়তি নির্ভর করা অশুভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লিপ্ত রয়েছে:
