অবশ্য, এই বছরগুলোতে গাশ মাত্র তিনটি বসতি স্থাপন করতে পেরেছিল। প্রধানমন্ত্রী ইত্যহাক রাবিন যুদ্ধোত্তর এই সময়ে মিশর ও সিরিয়ার সাথে বোঝাপড়ায় উদগ্রীব ছিলেন, ছোটখাট আঞ্চলিক ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। গাশ ও ডানপন্থীদের অব্যাহত চাপ প্রতিহত করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রপাগান্ডা প্রয়াস অব্যাহত রাখে গাশ, গোটা পশ্চিম তীর জুড়ে বিশাল সব মিছিল ও পদযাত্রা আয়োজন করে। ১৯৭৫ সালে জনতা তোরাহ স্ক্রোল হাতে অধিকৃত এলাকায় গান গেয়ে, নেচে, হাত তালি দিয়ে মিছিল করে; সেক্যুলারিস্টদের সাথে যোগ দেয় ধার্মিক যায়নবাদীর। ১৯৭৬ সালের স্বাধীনতা দিবসে প্রায় বিশ হাজার সশস্ত্র ইহুদি পশ্চিম তীরে এক বনভোজনে যোগ দেয়, সামারিয়ার এক অংশ থেকে আরেক অংশে মিছিল করে।১১ প্রায়শঃই এমনভাবে এইসব জঙ্গী গণমিছিল ও বিক্ষোভগুলো আয়োজন করা হত যেন কোনও নতুন বসতি স্থাপন বা আরেকটি অবৈধ স্কেয়াটের সাথে মিলে যায়। এইসব কর্মকাণ্ড কোনও কোনও ইসরায়েলির মনে এই ধারণা জাগিয়ে দিয়েছিল যে, এইসব এলাকা আবিশ্যিকভাবেই ইহুদিদের, অধিকৃত এলাকায় বস্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রচলিত সংস্কার ভেঙে ফেলতে সাহায্য করেছে।
গাশ ছিল বাস্তববাদী, চতুর ও বুদ্ধিমান। নাস্তিক ও সেকুলারিস্টদের প্রতি আবেদন সৃষ্টি করেছে, কিন্তু এর অর্থডক্স সদস্যদের জন্যে আবিশ্যিকভাবেই ধর্মীয় আন্দোলন ছিল এটা। র্যাবাই কুক হতে কাব্বালিস্টিক ধার্মিকতা লাভ করেছিল তারা। গাশের বিশ্বাস মতে ইহুদি ভূমিতে বসতি স্থাপন ছিল পবিত্রের আওতা বৃদ্ধি ও ‘অন্যপক্ষে’র সীমান্তকে দূরে ঠেলে দেওয়া। একটি বসতি ছিল ক্রিশ্চানদের ভাষায় অন্সুদীক্ষার মতো, অপবিত্র পৃথিবীতে নতুন ও আরও কার্যকরভাবে স্বর্গীয়কে উপস্থিতকারী সুপ্ত করুণার প্রতীক। ইসাক লুরিয়া যাকে বলেছেন তিক্কুন, পুনঃস্থাপনের একটি প্রক্রিয়া একদিন যা বিশ্ব ও মহাবিশ্বকে বদলে দেবে। গণমিছিল, মিছিল, সেনাবহিনীর সাথে যুদ্ধ ও অবৈধ বসতি স্থাপন ছিল পরমান্দ ও মুক্তির বোধ নিয়ে আসা এক ধরনের আচার। সেক্যুলার অগ্রগামী ও পণ্ডিতসুলভ হেরেদিমদের কাছে বহু বছরের হীনবোধের পর কুকবাদীরা সহসা নিজেদের সমস্ত ঘটনার কেন্দ্রে চলে এসে বলে মনে করেছে, এক মহাজাগতিক সংঘাতের সামনের কাতারে স্থান করে নিয়েছে। নিষ্কৃতির আগমন ত্বরান্বিত করে মহাবিশ্বের মৌল ছন্দের সাথে একাত্ম মনে করেছে নিজেদের। পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, প্রার্থনার সময় সামনে-পেছনে দোল খেত তারা, শক্ত করে চোখ বুজে বিকৃত ও বেদনার্ত চেহারায় চিৎকার করে কাঁদত। এসবই কাব্বালিস্টের ভাষায় কাওয়ানাহ’রই চিহ্ন, বিশেষ কোনও নির্দেশনা পালনের সময় ইহুদিদের প্রতীকী ধরন ভেদ করে আচারের আবিশ্যিক তাৎপর্য অবলোকনে সক্ষম করে তোলা নিবিড় মনোসংযোগের প্রয়াস।১২ কাওয়ানাহর সাথে পরিচালিত কোনও কাজ উপাসককে কেবল ঈশ্বরের কাছাকাছিই নিয়ে যায় না, সেই সাথে স্বর্গ ও পার্থিব জগৎকে বিচ্ছিন্নকারী ভারসাম্যহীনতা সংশোধনেও সাহায্য করে। প্রার্থনার সময় গাশ অ্যক্টিভিস্টরা কেবল এই পরমানন্দই অনুভব করেনি; রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও তারা একইভাবে দেখেছে। নতুন বসতি স্থাপনের অনুষ্ঠানে র্যাবাই কুকের বয়ান ও কান্নার দৃশ্য ছিল ‘প্রত্যাদেশ’। ঠিক একইভাবে রামাল্লার কাছের পাহাড় থেকে সেনাবহিনী তাদের বিতাড়নের চেষ্টা করার সময় আর্তনাদ ছেড়ে প্রার্থনার চাদরে স্কোয়ার্টারদের নিজেদের ঢেকে পবিত্র ভূমি রক্তাক্ত নখে আঁকড়ে থাকার দৃশ্যও তাই।১৩ স্রেফ রাজনৈতিক মুহূর্ত ছিল না এগুলো। অ্যাক্টিভিস্টরা এইসব ঘটনাপ্রবাহের পার্থিব খোলস ভেদ করে বাস্তবতার উৎসমূলের স্বর্গীয় বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করার কথা বিশ্বাস করেছে।
এভাবে রাজনীতি পরিণত হয়েছিল উপাসনার (আভোদ) একটা কায়দায়। সিনাগগের উপাসনায় যোগ দেওয়ার আগে ইহুদি মিকভেহ-তে স্নান করে। ঠিক একইভাবে গাশ র্যাবাইরা ঘোষণা করেছিলেন: ‘যেন তা তোরাহর গোপন বিষয় অনুসন্ধানের মতো হওয়ায় রাজনীতির আবর্জনায় ডুব দেওয়ার আগে নিজেদের মিকভেহ-তে পবিত্র করে নিতে হবে।’১৪ উন্মোচক মন্তব্য ছিল এটা, কারণ তা গাশ ধার্মিকতার কেন্দ্রে দ্ব্যার্থবোধকতা প্রকাশ করেছে। রাজনীতি তোরাহর মতোই পবিত্র, কিন্তু-বহুদিন আগে প্রবীন কুক যেমন যুক্তি দেখিয়ে গেছেন—এটা আবর্জনাও। ১৯৬৭ সাল থেকে কুকবাদীরা প্রায়শঃই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের ধাক্কাকে প্রবীন কুকের প্রিয় ইমেজ, ‘আলোর বিস্ফোরণ’ হিসাবে অনুভব করে এসেছে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যর্থতা, বিপর্যয় ও প্রতিবন্ধকতার অন্ধকারের ব্যাপারেও প্রবলভাবে সচেতন ছিল তারা। ইসরায়েলি বিজয়গুলোকে অলৌকিক ঘটনা বলে তারিফ করা হলেও সেগুলোকে আবার আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক দক্ষতার হাতে আবির্ভূত বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
সুতরাং কুকবাদীরা আসলে সমানভাবে জাগতিক ও পবিত্রের ব্যাপারে সজাগ ছিল। ঈশ্বরের জন্যে তাদের আকাঙ্ক্ষা পার্থিব বাস্তবতার অস্বচ্ছতা ও অবাধ্য আপোসহীনতা দিয়ে ভারসাম্য পেয়েছিল। একারণেই তাদের প্রার্থনা ও অ্যক্টিভিজমের বাড়াবাড়ি ও যন্ত্রণা। জীবনের সামগ্রিকতাকে—এমনকি একেবারে অশুচি, গতানুগতিক ও বিকৃত অংশগুলোও-পবিত্রের আচ্ছাদনের নিচে নিয়ে আসাই ছিল তাদের মিশন। কিন্তু হাসিদিমরা যেখানে একাজে আনন্দ ও নতুন হালকা ভাব বোধ করেছে, গাশের পরমানন্দ প্রায়শঃই ক্রোধ ও অসন্তোষে পরিপূর্ণ ছিল। আধুনিক কালের নারী-পুরুষ ছিল তারা। ঈশ্বর ছিলেন আগের চেয়ে ঢের দূরে, লৌকিকতার চাপ সৃষ্টিকারী ও নাছোড় বাস্তবতাকে অতিক্রম করে যাওয়া ঢের বেশি কষ্টকর ছিল, এখন অনেকেই যাকে সবকিছু মনে করে। গাশ অ্যাক্টিভিস্টরা সেক্যুলার ইসরায়েল রাষ্ট্রে আরবদের কাছ থেকে ভুমি কেড়ে নেওয়ার প্রয়াসে ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতাকে জয় করেছিল। ইসরায়েলের সীমান্ত অতিক্রম করে বহুদিন আগে খোয়ানো ভুমিতে উপনিবেশ গড়ে নিজেদের উন্মুল করে মন স্থির করেছে তারা। এরেত্য ইসরায়েলে ‘প্রত্যাবর্তন’ বিভ্রান্তিকর বর্তমানের চেয়ে ঢের বেশি মৌলিক মূল্যবোধ ও মনের অবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রয়াস ছিল।
