ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের প্রায় বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে যে সেক্যুলার যায়নবাদের ‘মিথ্যা’ নীতিমালায় রুদ্ধ হয়ে যাওয়া নিস্তার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্যে অবিলম্বে কাজ শুরু করা জরুরি। সম্পূর্ণভাবে সংগঠিত হতে গাশ এমুনিমের এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সদস্যদের তা এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার যোগান দিতে সক্ষম হয়। গাশ কায়দার পোশাক, সঙ্গীত, সজ্জা, গ্রন্থ ও বাচ্চাদের নামের পছন্দ, এমনকি কথা বলার বিশেষ ধরনের কায়দা থাকবে। বছর পরিক্রমায় গাশ সদস্যদের সময় পরীক্ষিত মৌলবাদী কৌশলে সেক্যুলার ইসরায়েল থেকে প্রত্যাহৃত হতে সক্ষম করে তোলা একটি প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। অবশ্য গাশের ধার্মিক সদস্যদের ধার্মিকতা ও তোরাহ পালন জাহির করার কায়দায় কিছুটা আগ্রাসন ছিল। রাষ্ট্রের প্রথম দিকের বছরগুলোয় সেক্যুলার ইসরায়েলিরা প্রথাগত কিস্তি টুপি মাথায় দেওয়া ইহুদিদের নিয়ে পরিহাস করত; এখন এইসব ধার্মিক অ্যক্টিভিস্টরা রেডিক্যাল ধর্মীয় শৈলীতে পরিণত হওয়া হাতে বোনা কিপা পরতে শুরু করেছিল।’ গাশের ক্যাডাররা নিজেদের শ্রমিকবাদীদের তুলনায় ঢের বেশি ইহুদি ও যায়নবাদী মনে করেছে, নিজেদের তারা প্রাচীন কালের পবিত্র যোদ্ধা জোশুয়া, ডেভিড ও ম্যাকাবিদের সাথেই নয় বরং একই ধরনের অতীন্দ্রিয়বাদী দর্শনের অন্তর্ভুক্ত এবং নিজেদের কালে উন্মাদ বিবেচিত থিওদর হার্যেল, বেন গুরিয়নের মতো যায়নবাদী নায়ক ও গোড়ার দিকের অগ্রগামীদের সাথেও সম্পর্কিত করেছে।
গাশের সেক্যুলার ও ধার্মিক সদস্যরা তাদের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার কাজে ব্যস্ত থাকার সময়ই কুকবাদীদের একটা দল প্রবীন বসতি স্থাপনকারী মোশে লেভিংগারের সহায়তায় পশ্চিম তীরের আরব শহর নাবলুসের এক রেলওয়ে ডিপোয় একটি গারিন (ক্ষুদ্র বসতির জন্যে একটি ‘বীজ’ বা নিউক্লিয়াস) স্থাপনের প্রয়াস পায়। ইহুদিদের জন্যে পবিত্র এলাকা ছিল এটা: নাবলুস জ্যাকব ও জোশুয়া সাথে সম্পর্কিত বাইবেলিয় শহর শেচেমের স্থান দখল করে আছে। বসতি স্থাপনকারীরা তাদের দৃষ্টিতে প্যালেস্তাইনিদের হাতে অপবিত্র ভূমিকে আবার পবিত্র করার প্রয়াস পাচ্ছিল। এই বসতির নাম দিয়েছিল তারা এলোন মোরেহ, শহরের অন্যান্য বাইবেলিয় নামের একটা, এবং রেলওয়ে ডিপোটিকে পবিত্র টেক্সট পাঠের লক্ষ্যে ইয়েশিভা হিসাবে চালানোর চেষ্টা করেছে। গাশ এমুনিমে যোগ দিতেও রাজি হয় তারা। গারিন অবৈধ বলে সরকার বসতি উচ্ছেদের চেষ্টা করে, কিন্তু ইহুদিরা অন্য লোকদের আইন পালন করতে বাধ্য নয় বলে অধিকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহারের দাবি করে দেওয়া জাতি সংঘের ঘোষণা মেনে নেওয়ার কোনও প্রয়োজনই বোধ করেনি গাশ। ইসরায়েলে উল্লেখযোগ্য সমর্থন লাভ করে বসতি স্থাপনকারীরা, অন্যদিকে সরকারকে অক্ষম ও দ্বিধান্বিত দেখায়। ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে মোশে লেভিংগার পশ্চিম তীরে বিশ হাজার ইহুদির মিছিলে নেতৃত্ব দেন। এলোন মোরেহর নিজের তাঁবু থেকে, নিজের ‘ওয়ার সিচুয়েশন রুম’ বলতেন তিনি ওটাকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শিমন পেরেসের সাথে দরকষাকষি করেন। আইডিএফ সৈনিকদের সাথে একটা সংঘর্ষ ঘটে: কোনওরকম গুলি বর্ষিত হয়নি, তবে পাথর ছোঁড়া হয়েছে, বন্দুকের বাট ব্যবহার করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হেলিকপ্টারে চেপে হাজির হন পেরেস, তাঁবুতে লেভিংগারের সাথে আলাপ করেন, এই সভার পর ঝড়ের বেগে বের হয়ে আসেন র্যাবাই, শোকের প্রথাগত ভঙ্গিতে পরনের পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ধর্মীয় ভোট খোয়ানোর ভয় থেকে শেষ পর্যন্ত হার স্বীকার করে নেন পেরেস। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কাছের এক সেনা শিবিরে এলোন মোরেহ বসতি স্থাপনকারীদের তিরিশ জনকে স্থান দিতে সম্মত হন তিনি। লেভিংগারকে কাঁধে নিয়ে উল্লাসমুখর তরুণরা মিছিল করে। কৃশ, টোকো, ঝুলন্ত দাড়ি, পুরু চশমা ও স্থায়ীভাবে কাঁধে বন্দুক ঝোলানো ভদ্রলোক লেভিংগার এক নতুন ধরনের ইহুদি বীরে পরিণত হন। অনেকের চোখেই বসতি স্থাপনকারী তোরাহ বিশেষজ্ঞ যাদ্দিক ও হাসিদের পাশে স্থান করে নিতে যাচ্ছিলেন তিনি। সেক্যুলারিস্টদেরও সমর্থন লাভ করেন তিনি। ‘লেভিংগার যায়নবাদের প্রত্যাবর্তনকে প্রতীকায়িত করেছেন, ‘ বলেছে প্রবীন ও আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী গেউলা কোহেন। ‘জুদাহ আর সামারায় [পশ্চিম তীরের বাইবেলিয় নাম] মোমের শিখার মতো দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তিনিই যায়নবাদী বিপ্লবের নেতা।৯
শেষ পর্যন্ত ১৬৪ বিসিইতে সেলুসিয়দের হাত থেকে ম্যাকাবিদের জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের বার্ষিকী ও মন্দিরের পুনঃনিবেদন উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হানুক্কাহর উৎসবের সময় এলোন মোরেহ, এখন তার নতুন নাম কেদামিন, প্রতিষ্ঠিত হয়। গাশ এমুনিমের মিথলজিতে গারিন পরিণত হয় নতুন হানুক্কাহয়, এক ঐশী সাফল্য, ঈশ্বরের বিজয়। এক গঠনমূলক মুহূর্ত ছিল এটা: স্রোত ঘুরে গেছে বলে মনে হয়েছে; সেক্যুলার যায়নবাদ ঐশী ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে। ইতিহাসকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছেন লেভিংগার।
১৯৭৭-৭৮ সাল দুটি ছিল গাশ এমুনিমের স্বর্ণযুগ। সদস্যরা দেশময় ঘুরে বেড়িয়েছে, বক্তৃতা দিয়েছে, ওই অঞ্চলের বসতি করতে ইচ্ছুক সেক্যুলারিস্ট ও ধার্মিক দুরকম তরুণদেরই দলে টেনেছে। সারা দেশে গাশের শাখা খোলা হয়। গোটা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে ক্যাডাররা একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে: লক্ষ্য ছিল হাজার হাজার ইহুদিকে এলাকায় আনা ও সব কৌশলগত পাহাড়ী ঘাঁটিতে উপনিবেশ তৈরি। এলাকার ভৌগলিক অবস্থান, জনমিতি ও বসতি স্থাপন বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করা হয়। পরিকল্পনা ও প্রচারণার জন্যে প্রশাসনিক সংস্থা স্থাপন করা হয়। এরই একটা ছিল বসতি প্রক্রিয়া সংগঠনের দায়িত্বে নিয়োজিত মেতে মিরতযাই।” প্রায়শঃই লেভিংগারের নেতৃত্বে স্কোয়ার্টাররা তাদের পুরোনো লক্করমার্কা ট্রেইলার নিয়ে রাতের অন্ধকারে জনশূন্য পশ্চিম তীরের কোনও পাহাড়চূড়ায় হাজির হত। সেনাবাহিনী তাদের উচ্ছেদ করতে হাজির হলে নেসেটে ডানপন্থী দলগুলো শ্রমিক দলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ঠিক ব্রিটিশদের মতো আচরণের অভিযোগ তুলে বসত। চতুর কৌশল ছিল এটা। ইসরায়েলি সরকারকেই এবার নিপীড়কের ভূমিকায় স্থাপন করা হয়েছিল, গাশ বসতি স্থাপনকারীরাই যেন ইসরায়েলের বীরত্বব্যাঞ্জক অতীতকে ধারণ করেছিল।
