কিন্তু ইহুদি ধর্মান্তরিত এইসব মারানো বাকি ইহুদি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ক্যাথলিক শিক্ষা লাভ করেছিল তারা, ফলে তাদের কল্পনার জগৎ ক্রিশ্চান প্রতীক ও মতবাদে পরিপূর্ণ ছিল। প্রায়শঃই তারা ক্রিশ্চান পরিভাষায় ইহুদি ধর্ম নিয়ে কথা বলত। উদাহরণ স্বরূপ, তারা বিশ্বাস করত, জেসাস নয় বরং মোজেসের আইনের কারণেই তারা রক্ষা পেয়েছে, ইহুদি ধর্মে এই ধারণার তেমন কোনও মূল্য নেই। ইহুদি বিধানের অনেক কিছুই তারা বিস্মৃত হয়েছিল। বছর পেরুনোর সাথে সাথে ইহুদিবাদ সম্পর্কে তাদের উপলব্ধিও ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। অনেক সময় অ্যান্টি- সেমিটিক ক্রিশ্চানদের বিভিন্ন যুক্তি সম্বলিত রচনাই ছিল তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা লাভের একমাত্র উৎস। শেষ পর্যন্ত তারা যার চর্চা শুরু করে সেটা হচ্ছে সঙ্কর ধর্মবিশ্বাস যা প্রকৃত ইহুদি বা ক্রিশ্চান ধর্মের কোনওটাই ছিল না।২৯ এদের এই টানাপোড়েন আজকের দিনে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক লোকের টানাপোড়েনের চেয়ে ভিন্ন নয়, যাদের কেবল পাশ্চাত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে ভাসা ভাসা ধারণা রয়েছে, কিন্তু আধুনিকতার আগ্রাসনে তাদের জীবন যাত্রার প্রথাগত ধারা অবদমিত হওয়ার ফলে তারা আর প্রাচীন পদ্ধতির সাথেও খাপ খাওয়াতে পারছে না। একই রকম বিচ্ছিন্নতার বোধে আক্রান্ত হয়েছিল পর্তুগালের মারানো ইহুদিরা। তাদের অন্তস্থঃ সত্তার সাথে অনুরণিত হয়নি এমন এক আধুনিকায়িত সংস্কৃতিতে নিজেদের মিলিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল তারা।
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে কিছু সংখ্যক ইহুদিকে ইবারিয় পেনিনসুলা ছেড়ে চলে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। স্প্যানিশ কলোনীগুলোর কোনও কোনওটায় এবং সেইসাথে দক্ষিণ ফ্রান্সে ইতিমধ্যে একটা মারানো ডায়াসপোরা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখানকার ইহুদিদের তখনও তাদের ধর্ম পালন করতে দেওয়া হচ্ছিল না। অবশ্য সপ্তদশ শতাব্দীতে ইহুদি ধর্মপ্রচারকারী মারানোরা ভেনিস, হামবুর্গ ও-পরে-লন্ডনের মতো বিভিন্ন জায়গায় অভিবাসন করে। এইসব জায়গায় তারা প্রকাশ্যে ইহুদি ধর্মে প্রত্যাবর্তন করতে পেরেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, ইনকুইজিশনের কবল থেকে পালিয়ে ইবারিয় শরণার্থীরা আমস্টার্ডামে হাজির হতে শুরু করেছিল, এটা তাদের নতুন জেরুজালেমে পরিণত হয়। নেদারল্যান্ডস ছিল ইউরোপের সহিষ্ণুতম দেশ। বিকাশমান বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের একটি প্রজাতন্ত্র দেশটি স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভের সংগ্রামের সময় ইবারিয় মূল্যবোধের বিপরীতে এক ধরনের উদার পরিচয় গড়ে তোলে। ১৬৩৭ সালে ইহুদিরা এই দেশের পূর্ণ নাগরিকত্ব লাভ করে। বেশির ভাগ ইউরোপিয় শহরের মতো এখানে তারা আর ঘেটো-বন্দি ছিল না। ওলন্দাজরা ইহুদিদের বাণিজ্যিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছে। ফলে ইহুদিরা বিশিষ্ট ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়ে জেন্টাইলদের সাথে মুক্তভাবে মেলামেশা শুরু করে। প্রাণবন্ত সামাজিক জীবন, অসাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা প্রকাশনা শিল্প ছিল তাদের।
অনেক ইহুদিই সন্দেহাতীতভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ লাভের জন্যেই আমস্টারডামে পাড়ি জমিয়েছিল, কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইহুদি ইহুদিবাদের পূর্ণাঙ্গ চর্চা বজায় রাখতে উদগ্রীব ছিল। সেটা অবশ্য সহজ ছিল না। ইবারিয়া থেকে আগত ‘নব্য ইহুদিদের’ ব্যাপকভাবে অজ্ঞ হয়ে থাকা ধর্ম সম্পর্কে নতুন করে শিক্ষা নিতে হচ্ছিল। ওদের ফিরিয়ে আনার এক চ্যালেঞ্জিং কাজ পেয়েছিলেন র্যাবাইরা, ঐতিহ্যের সাথে আপোস না করেই বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার জন্যে ওদের রেয়াত দিচ্ছিলেন তাঁরা। তাঁদের কল্যাণেই কিছু প্রাথমিক উদ্বেগ সত্ত্বেও বেশির ভাগ ইহুদিই ফিরে আসতে পেরেছিল। পূর্বপুরুষের ধর্মে প্রত্যাবর্তন উপভোগ করছে বলে আবিষ্কার করেছিল তারা। উল্লেখযোগ্য নজীর ছিলেন মেটাফিজিক্সের প্রফেসর ওরোবিও দে কাস্ত্রো, বছরের পর বছর স্পেনে গোপন ইহুদি ধর্ম প্রচারক রয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ইনকুইজিশনের হাতে আটক ও অত্যাচারিত হয়েছেন, তিনি বিশ্বাস প্রত্যাহার করেছেন ও ভুয়া ক্রিশ্চান হিসাবে তুলুজে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। শেষে প্রতারণা ও দ্বৈত জীবন কাটাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ১৬৩০ সালে ইহুদিবাদের শক্তিশালী অ্যাপোলজিস্ট ও অন্য প্রত্যাবর্তনকারী মারানোদের শিক্ষক হতে আমস্টারডামে চলে আসেন তিনি।৩১
ওরোবিও অবশ্য একটা পূর্ণ জনগোষ্ঠীর বর্ণনা দিয়েছেন যারা প্রথাগত ইহুদিবাদের আইনকানুন ও রীতিনীতির সাথে মানিয়ে ওঠা কঠিন আবিষ্কার করেছে, ওদের কাছে তা অর্থহীন ও অযথা ভার মনে হয়েছে। ওরোবিওর মতোই ইবারিয়ায় যুক্তিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, গণিত ও ওষুধবিজ্ঞানের মতো আধুনিক বিজ্ঞান পাঠ করেছে তারা। কিন্তু, অধৈর্যভাবে জানাচ্ছেন ওরোবিও, ‘ওদের ছিল অনেক অহঙ্কার, গর্ব ও ঔদ্ধত্য, দারুণভাবে সব বিদ্যা অর্জন করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।’
ওরা মনে করে পবিত্র আইনে প্রকৃত শিক্ষিতদের কাছ থেকে শিখতে রাজি হলে ওরা শিক্ষিত মানুষের পরিচয় হারিয়ে ফেলবে, তাই তারা যেসব বিষয় বোঝে না সেগুলোকে অস্বীকার করে বিরাট জ্ঞানীর ভাব ধরে।৩২
দশকের পর দশক ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতায় বাসকারী এইসব ইহুদি তাদের নিজস্ব যৌক্তিক ক্ষমতার উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের কোনও লিটার্জি, সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় জীবন ও তোরাহর ‘পবিত্র আইন’ পালনের আচরিক অভিজ্ঞতা ছিল না। অবশেষে আমস্টারডামে পৌঁছানোর পর প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ কার্যকর ইহুদি সম্প্রদায়ের মাঝে নিজেদের আবিষ্কার করে স্বাভাবিকভাবেই বিস্মিত বোধ করেছে। বহিরাগত কারও চোখে পেন্টাটিউকের ৬১৩টি নির্দেশনাকে খামখেয়ালি ও প্রাচীন ঠেকেছে। কোনও কোনও নির্দেশনা অচল হয়ে গিয়েছিল, কারণ সেগুলো পবিত্র ভুমির চাষাবাদ বা মন্দিরের লিটার্জির সাথে সম্পর্কিত ছিল, ডায়াসপোরায় যা আর প্রয়োগযোগ্য ছিল না। দুর্বোধ্য খাদ্য বিধি ও পবিত্রতা অর্জনের নিয়মের মতো অন্যান্য বিধিবিধানও নিশ্চয়ই আধুনিক পর্তুগিজ মারানোদের চোখে বর্বরোচিত ও অর্থহীন মনে হয়েছে; যৌক্তিকভাবে চিন্তাভাবনা করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল বলে র্যাবাইদের ব্যাখ্যা মেনে নেওয়া কঠিন ঠেকেছে তাদের কাছে। কমন এরার প্রথম শতাব্দীতে সংকলিত মৌখিক সাঙ্কেতিক আইন হালাখাহ আরও বেশি অযৌক্তিক ও খামখেয়ালি বলে মনে হয়েছে, তার কারণ এর এমনকি বাইবেলিয় অনুমোদন পর্যন্ত ছিল না।
