অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেক্যুলারিস্ট পর্যবেক্ষকগণ এই ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ ছিলেন না। বিভিন্ন সমাজ এতখানি মেরুকৃত হয়ে পড়েছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদারপন্থীরা বা ইরানের মতো দেশগুলোর পাশ্চাত্যকৃত সেক্যুলারিস্টরা বছরের পর বছর বিকাশ লাভ করে চলা ধর্মীয় প্রতি-সংস্কৃতিকে খাট করে দেখতে প্ররোচিত হয়েছে। এই আগ্রসী ধার্মিকতাকে প্রাচীন বিশ্বের বিষয় ভেবে ভুল করেছে তারা; এগুলো ছিল ধর্মের আধুনিক ধরন, যেগুলো প্রায়শঃই শত শত বছরের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত দারুণভাবে উদ্ভাবনী ধরনের ছিল। তিনটি ধর্মের সকল মৌলবাদী আধুনিকতা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি একই সময়ে আধুনিক ধারণা ও উদ্দীপনায়ও প্রভাবিত হয়েছে। তবে অনেক কিছু শেখার ছিল তাদের। প্রথম দিকের আক্রমণগুলো মৌলবাদী কালের স্বর্ণ সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু, পরের অধ্যায়ে আমরা যেমন দেখব, আধুনিক রাজনীতির বহুত্ববাদী, যৌক্তিক ও বাস্তববাদী বিশ্বে যোগদানের পর ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত আন্দোলনের পক্ষে এর অখণ্ডতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিপ্লবই আরেক স্বৈরাচারে পরিণত হতে পারে; একটি সমন্বিত, হলিস্টিক রাষ্ট্র অর্জন করার লক্ষ্যে আধুনিকতার বিচ্ছিন্নতাকে বাতিল করার জন্যে পরিচালিত লড়াই সামগ্রিকতাবাদী হয়ে দাঁড়াতে পারে; মৌলবাদীদের অতীন্দ্রিয়বাদী, মেসিয়ানিক বা পৌরাণিক দর্শনকে রাজনৈতিক লোগোইতে পরিণত করা বিপজ্জনক। কিন্তু প্ৰথমে মৌলবাদীরা মনে করে, তাদের সহ্য করে আসা বহু দশকের অপমান ও নিপীড়নের পর তারা সত্যিই আবার ঈশ্বরের পক্ষে পৃথিবীকে পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছে।
ইরানি বিপ্লব ছিল মৌলবাদীদের সম্ভাবনা সম্পর্কে সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণকারী প্রথম ঘটনা, তবে এটাই বিশ্ব রাজনীতিতে সফল উদ্যোগ পরিচালনাকারী প্রথম আন্দোলন ছিল না। আমরা দেখেছি, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপ্পুরের যুদ্ধের পর কুকবাদীরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, ইহুদি জাতি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। যুদ্ধ ছিল একটা সতর্কবাণী; নিষ্কৃতি অত্যাসন্ন, কিন্তু সরকার মেসিয়ানিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার মতো কোনও নীতি অনুসরণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকলে তাদেরই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কিছুটা বিস্ময়ের সাথেই সেক্যুলারিস্ট মিত্র পেয়ে যায় তারা, কুকের আদর্শে বিশ্বাস না করলেও যারা অধিকৃত এলাকা দখলে রাখার ব্যাপারে সমানভাবে নাছোড় ছিল। কুকবাদী বা ধার্মিক ইহুদি নয় এমন সব লোকজনও, যেমন সেনাবাহিনী প্রধান রাফায়েল এইতান বা পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও উগ্রজাতীয়তাবাদী য়ুভাল নে’ইমান ইসরায়েলের পক্ষে অধিকৃত অঞ্চলসমূহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ধার্মিক যায়নিস্টদের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইডিএফ-এ কাজ করা ও ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধ অংশ নেওয়া র্যাবাই, যুদ্ধবাদী তরুণ সেক্যুলারিস্ট, কুকবাদী ও অন্যান্য ধার্মিক যায়নবাদী গোষ্ঠী একটা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম তারা রেখেছিল গাশ এমুনিম, ‘বিশ্বাসীদের দল’।
এর অল্প পরেই নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করে একটি পজিশন পেপার উপস্থাপিত করে তারা। গাশ রাজনৈতিক দল হবে না, নেসেটে আসন লাভের জন্যে প্রতিযোগিতা করবে না তারা, বরং এটা হবে একটা প্রেশার গ্রুপ, ‘যায়নবাদী লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইহুদি জাতির মাঝে মহাজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাবে, তাদের উপলব্ধি ছিল এই দর্শনের উৎস ইসায়েলের ইহুদি ঐতিহ্যে, এবং ইসরায়েল ও গোটা বিশ্বের নিষ্কৃতিই এর উদ্দেশ্য। প্রথমদিকের যায়নবাদীরা যেখানে ধর্মকে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, গাশ সেখানে তাদের আন্দোলনকে ইহুদিবাদে প্রোথিত করছিল। গাশের সেক্যুলার সদস্যরা যেখানে ‘নিষ্কৃতি’ শব্দটিকে অধিকতর শিথিল, অনেক বেশি রাজনৈতিক অর্থে ব্যাখ্যা করতে পারত, র্যাবাই কুকের হলিস্টিক দর্শন মেনে নেওয়া ধার্মিক অ্যাক্টিভিস্টদের বিশ্বাস ছিল যে মেসিয়ানিক নিষ্কৃতি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, ইহুদি জাতি গোটা এরেত্য ইসরায়েলে বসবাস না করা পর্যন্ত বাকি বিশ্বে শান্তির কোনও অবকাশ নেই।
শুরু থেকেই গাশ এমুনিম সেক্যুলার ইসরায়েলের প্রতি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। পজিশন পেপারে প্রাচীন যায়নবাদের ব্যর্থতার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ইহুদিরা তাদের ভূমি রক্ষার লক্ষ্যে এক ভয়ঙ্কর সংঘাতে জড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও,
আমরা পতন ও যায়নবাদী আদর্শ বাস্তবায়নের পথ থেকে কাজে ও কর্মে পশ্চাদপসরণের একটি প্রক্রিয়া লক্ষ করছি। এই সংকটের জন্যে চারটি সম্পর্কিত উপাদান দায়ী: প্রলম্বিত সংঘাতের ফলে সৃষ্ট মানসিক ক্লান্তি ও হতাশা; চ্যালেঞ্জের অভাব; স্বার্থপর উদ্দেশ্যের প্রতি অগ্রাধিকার ও ইহুদি বিশ্বাসের ক্ষয়।২
শেষের কারণটিই—ধর্মের দুর্বলতা-গাশের ধার্মিক সদস্যদের চোখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইহুদিবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন যায়নবাদের কোনও অর্থ থাকতে পারে না বলে বিশ্বাস ছিল তাদের। একই সময়ে কুকবাদীরা আরবদের কাছ থেকে দখলিকৃত এলাকা জয় করে নিতে চেয়েছিল, সেক্যুলার ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও যুদ্ধে লিপ্ত ছিল তারা। বাইবেলের ভাষায় তারা প্রাচীন সমাজতন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স প্রতিস্থাপনও করতে চেয়েছিল। শ্রমিক যায়নবাদীরা যেখানে ইহুদি জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক ও ইহুদিদের ‘অন্যসব জাতির মতো’ করতে চেয়েছে, গাশ এমুনি ইসরায়েল জাতির ‘অনন্যতার’ উপর জোর দিয়েছে;৺ ইহুদিদের যেহেতু ঈশ্বর মনোনীত করেছেন, সুতরাং তারা অন্য জাতি থেকে আবিশ্যিকভাবেই ভিন্ন, একই নিয়মের অধীন নয়। বাইবেল এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে ‘পবিত্র’ জাতি হিসাবে ইসরায়েলকে এর নিজস্ব ধরনে আলাদা করা হয়েছে। শ্রমিক যায়নবাদ যেখানে আধুনিক পশ্চিমের উদার মানবতাবাদকে আত্মস্থ করতে চেয়েছে, গাশ এমুনিম সেখানে বিশ্বাস করেছে ইহুদিবাদ ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি পরস্পর বিরোধী। সুতরাং, কুকবাদীদের ক্ষেত্রে সেক্যুলার যায়নবাদের সফল হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না।৫ তাদের কাজ ছিল ধর্মের পক্ষে যায়নবাদকে অধিকার করে নেওয়া, অতীতের ভুল-ভ্রান্তিগুলোকে সংশোধন করা ও ইতিহাসকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।
