কিন্তু তারপরেও ফলওয়েলের আপাত কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর প্রতি সাড়া দানকারী মৌলাবাদীদের আশঙ্কায় ভরিয়ে তুলেছিল। সেক্যুলার মানবতাবাদী ষড়যন্ত্র বলে কিছুর অস্তিত্ব বোঝানোর আশায় ফলওয়েল, লাহাই বা রবার্টসনের সাথে তর্কে যাওয়া বৃথা। মুসলিম ও ইহুদি মৌলাবাদীদের মতো বিনাশ ও ধ্বংসের এই বৈকল্যময় ভীতি তাদের প্রচারণায় তাগিদ ও দৃঢ় বিশ্বাস যোগ করবে। আধুনিক সমাজ বস্তুগত ও নৈতিক দিক থেকে বিরাট অর্জনের অধিকারী হয়েছে। নিজের ন্যায়নিষ্ঠতায় বিশ্বাস রাখার কারণ ছিল এর। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অন্ততপক্ষে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা মুক্তিদায়ী ছিল। কিন্তু মৌলবাদীরা এটা বুঝতে পারেনি, সেটা তারা বিকৃত বলে নয়, বরং তার কারণ তারা আধুনিকতাকে তাদের পবিত্রতম মূল্যবোধকে হুমকীদানকারী ও তাদের খোদ অস্তিত্বকেই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে মনে হওয়া আক্রমণ হিসাবে দেখেছে। ১৯৭০ দশক নাগাদ ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিম ঐতিহ্যবাদীরা পাল্টা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হবে।
০৯. আক্রমণ (১৯৭৪-৭৯)
মৌলবাদী আক্রমণ বহু সেক্যুলারিস্টকে হতচকিত করে দিয়েছিল। তারা ধরে নিয়েছিল ধর্ম আর কোনও দিনই রাজনীতিতে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারবে না, কিন্তু ১৯৭০-র দশকের শেষের দিকে ধর্মবিশ্বাসের এক উগ্র বিস্ফোরণ ঘটে। ১৯৭৮-৭৯ সালে সারা বিশ্ব মহাবিস্ময়ের সাথে লক্ষ করে, এক অজ্ঞাত ইরানি আয়াতোল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রগতিশীল ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচিত শাহ মুহাম্মদ রেযা পাহলভীর রাজত্বের পতন ঘটিয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন সরকার যখন মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের শান্তি প্রয়াস, ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন ও পাশ্চাত্যের প্রতি শান্তি প্রস্তাবের তারিফ করছিল, তখন পর্যবেক্ষকরা তরুণ মিশরিয়দের ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়া লক্ষ করেছিলেন। আধুনিকতার স্বাধীনতাকে এক পাশে ছুঁড়ে ফেলে ইসলামি পোশাক পরছিল তারা, অনেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস আগ্রাসীভাবে অধিকার করে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেরি ফলওয়েল ১৯৭৯ সালে প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের রাজনীতিতে অংশ নিয়ে ‘সেক্যুলার মানবতাবাদী’ এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে আসা রাষ্ট্র ও ফেডারেল আইনের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মরাল মেজরিটি প্রতিষ্ঠা করেন।
ধর্মের এই আকস্মিক বিস্ফোরণ সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে হতবুদ্ধিকর ও বিকৃত মনে হয়েছে। দারুণ কার্যকর প্রমাণিত আধুনিকতার অন্যতম আদর্শকে আলিঙ্গন করার বদলে এই রেডিক্যাল ঐতিহ্যবাদীরা বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ডিসকোর্সে অচেনা ঐশীগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছে ও প্রাচীন বিধান ও নীতির উল্লেখ করেছে। ওদের প্রাথমিক সাফল্য ব্যাখ্যার অতীত মনে হয়েছে; আধুনিক রাষ্ট্রকে এই নীতিমালার আলোকে পরিচালনা করা (নিশ্চিতভাবেই?) অসম্ভব ছিল? মৌলবাদীদের অতীতে অ্যাটাভিস্টিক প্রত্যাবর্তনকারী মনে হয়েছে। তাছাড়া, এইসব নীতিমালার অনুপ্রাণিত উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সমর্থন ছিল রীতিমতো আক্রমণের শামিল। যেসব আমেরিকান ও ইউরোপিয় ধর্মের দিন ফুরিয়ে গেছে ভেবেছিল, এবার তারা কেবল এটাই লক্ষ করতে বাধ্য হলো না যে প্রাচীন ধর্ম এখনও আবেগঘন আনুগত্যই অনুপ্রাণিত করছে না, বরং লক্ষ লক্ষ নিবেদিত ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিম তাদের এত গর্বের ধন সেক্যুলার, উদার সংস্কৃতিকে ঘৃণা করছে।
আসলে, আমরা যেমন দেখেছি, মৌলবাদী পুনর্জাগরণ আকস্মিক বা বিস্ময়কর কোনওটাই ছিল না। দশকের পর দশক বিভিন্ন কারণে অবহেলিত, নিপীড়িত এবং এমনকি সেক্যুলার সরকারের হাতে অত্যাচরিত অধিকতর রক্ষণশীল ধার্মিক লোকজন অসন্তোষে জ্বলছিল। অনেকেই নিজস্ব খাঁটি ধর্মের একটা পবিত্র সংরক্ষিত অঞ্চল নির্মাণের জন্যে আধুনিক সমাজ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। ওদের ধ্বংস করার লক্ষ্যে অঙ্গীকারাবদ্ধ সরকারের হাতে নিশ্চিহ্ন হওয়ার নিশ্চয়তা থেকে নিজেদের তারা যুদ্ধে লিপ্ত ও আত্মরক্ষায় নিয়োজিত ভেবেছে। বেঁচে থাকার সংগ্রামে বিশ্বাসীদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ গড়ে তুলেছে। ধর্মের প্রতি নিস্পৃহ বা বৈরী বিভিন্ন সামাজিক শক্তিতে ঘেরাও হয়ে এক ধরনের অবরোধের মানসিকতা গড়ে তুলেছিল তারা যা অনায়াসেই আগ্রাসনের দিকে বাঁক নিতে পারে। ১৯৭০-র দশকের মাঝামাঝি সময় উপযুক্ত হয়ে উঠেছিল। ওদের শক্তি সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছিল সবাই, বিশ্বাস করেছিল যে সংকট অত্যাসন্ন, ইতিহাসের এক অনন্য মুহূর্তের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তারা। পৃথিবী তাদের বদলে দেওয়ার আগেই উল্টে পৃথিবীটাকেই পাল্টে দিতে প্রস্তুত ছিল সবাই। তাদের চোখে ইতিহাস এক মারাত্মক বাঁক নিয়েছিল; সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখন এমন সমাজে বাস করছে তারা যেখানে ঈশ্বরকে হয় প্রান্তিকায়িত বা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীকে ফের পবিত্র করে তুলতে তৈরি ছিল তারা। সেক্যুলারিস্টদের অবশ্যই মানুষকে সবকিছুর পরিমাপকে পরিণত করা গর্বিত স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিসর্জন দিতে হবে, এবং ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নিতে হবে।
